দুর্নীতি দমন কমিশনের দায়ের করা বহুল আলোচিত ঋণ কেলেঙ্কারি মামলায় গ্রেফতার অর্থনীতিবিদ ও জনতা ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবুল বারকাতের জামিন বহাল রেখেছেন দেশের সর্বোচ্চ আদালত। তবে আদালত স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, তাকে অধস্তন আদালতে পাসপোর্ট জমা রাখতে হবে এবং আদালতের অনুমতি ছাড়া বিদেশ যেতে পারবেন না।
বৃহস্পতিবার প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগ এ আদেশ দেন। একই সঙ্গে হাইকোর্টের দেওয়া জামিন আদেশ বাতিল চেয়ে করা আবেদন খারিজ করে দেন আদালত। ফলে আপাতত কারামুক্ত থাকায় আর কোনো আইনি বাধা থাকছে না অধ্যাপক আবুল বারকাতের জন্য।
আদালত সূত্র জানায়, হাইকোর্টের জামিন আদেশের বিরুদ্ধে ঢাকা জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আপিল বিভাগে আবেদন করা হয়েছিল। শুনানিতে আবুল বারকাতের পক্ষে অংশ নেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মুস্তাফিজুর রহমান খান। শুনানি শেষে আপিল বিভাগ হাইকোর্টের সিদ্ধান্ত বহাল রাখেন, তবে পাসপোর্ট জমা দেওয়ার শর্ত আরোপ করেন।
মামলাটি দেশের ব্যাংক খাতের আলোচিত ঋণ অনিয়মগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। দুর্নীতি দমন কমিশনের অভিযোগ অনুযায়ী, এননটেক্স গ্রুপের নামে প্রায় ২৯৭ কোটি টাকার ঋণ অনুমোদনে অনিয়ম ও জালিয়াতি করা হয়েছিল। এই ঘটনায় গত বছরের ২০ ফেব্রুয়ারি আবুল বারকাতসহ মোট ২৩ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়।
দুদকের তদন্তে দাবি করা হয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর আতিউর রহমান, আবুল বারকাত এবং সংশ্লিষ্ট আরও কয়েকজন ব্যক্তি পারস্পরিক যোগসাজশে এননটেক্স গ্রুপের ২২টি প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণ অনুমোদন দেন। পরে বিভিন্ন কৌশলে সেই অর্থ আত্মসাত করা হয় বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
মামলার তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য, ঋণ অনুমোদনের সময় প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই যথাযথভাবে করা হয়নি। আর্থিক সক্ষমতা ও ঝুঁকি মূল্যায়নের ঘাটতি থাকলেও বিপুল অঙ্কের অর্থ ছাড় দেওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, প্রভাব খাটিয়ে এবং ব্যাংকিং নিয়মের ব্যত্যয় ঘটিয়ে এসব ঋণ অনুমোদন করা হয়েছিল।
গত বছরের ১১ জুলাই গভীর রাতে আবুল বারকাতকে গ্রেফতার করা হয়। এরপর তিনি নিম্ন আদালতে জামিন আবেদন করলেও তা নামঞ্জুর হয়। পরে হাইকোর্টে আবেদন করলে আদালত তাকে জামিন দেন। সেই জামিন আদেশ চ্যালেঞ্জ করে আপিল বিভাগে আবেদন করে রাষ্ট্রপক্ষ।
আপিল বিভাগের সর্বশেষ সিদ্ধান্তে স্পষ্ট হয়েছে, তদন্ত চলমান থাকলেও আদালত এই পর্যায়ে তাকে কারাগারে রাখার প্রয়োজন দেখেননি। তবে পাসপোর্ট জমা রাখার শর্ত আরোপের মাধ্যমে আদালত নিশ্চিত করতে চেয়েছেন, মামলার বিচারিক কার্যক্রমে তিনি যেন উপস্থিত থাকেন এবং তদন্ত প্রক্রিয়া ব্যাহত না হয়।
অধ্যাপক আবুল বারকাত দেশের অর্থনীতি অঙ্গনের সুপরিচিত ব্যক্তিত্ব। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। পাশাপাশি বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সভাপতির দায়িত্বেও ছিলেন দীর্ঘ সময়। ব্যাংকিং, দারিদ্র্য, উন্নয়ন অর্থনীতি এবং রাজনৈতিক অর্থনীতি নিয়ে তার বিভিন্ন গবেষণা দেশে-বিদেশে আলোচিত হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, দেশের আর্থিক খাতে অতীতে সংঘটিত বড় ঋণ কেলেঙ্কারিগুলোর বিচার ও তদন্ত নিয়ে সাধারণ মানুষের আগ্রহ অনেক বেশি। ফলে এ ধরনের মামলায় আদালতের প্রতিটি সিদ্ধান্তই জনমনে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে। একই সঙ্গে এসব মামলার মাধ্যমে ব্যাংকিং খাতে জবাবদিহি ও সুশাসনের প্রশ্নও আবার সামনে চলে আসে।

