দেশের ভোগ্যপণ্যের বাজার ধীরে ধীরে গুটিকয়েক বড় শিল্পগোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে চলে যাচ্ছে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন মৌলভীবাজার ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক গোলাম মাওলা। তার মতে, প্রায় ১৮ থেকে ২০ কোটি মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ যদি মাত্র কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তাহলে তা দেশের বাজারব্যবস্থা ও অর্থনীতির জন্য বড় ধরনের ঝুঁকির সংকেত।
বৃহস্পতিবার রাজধানীতে অনুষ্ঠিত ‘সংকটকালের বাজেট ও জনপ্রত্যাশা’ শীর্ষক এক গোলটেবিল আলোচনায় তিনি এসব কথা বলেন। জাতীয় দৈনিক প্রথম আলোর আয়োজনে রাজধানীর একটি হোটেলে এই আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।
গোলাম মাওলা বলেন, দেশের সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান—সবাই এখন কয়েকটি বড় শিল্পগোষ্ঠীর পণ্য ও সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। তার ভাষায়, এই নির্ভরতা দীর্ঘমেয়াদে বাজারে ভারসাম্যহীনতা তৈরি করতে পারে।
তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, কোনো বড় শিল্পগোষ্ঠী হঠাৎ আর্থিক সংকটে পড়লে বা সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে গেলে বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। এজন্য সরকারের নিজস্ব বিকল্প সরবরাহব্যবস্থা বা ‘রিজার্ভ ডিফেন্স’ থাকা প্রয়োজন বলে মত দেন তিনি।
আলোচনায় জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের শুল্ক কাঠামোরও কঠোর সমালোচনা করেন গোলাম মাওলা। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারদরের সঙ্গে দেশের ট্যারিফমূল্যের বড় অসামঞ্জস্য রয়েছে। এতে ব্যবসায়ীরা নানা জটিলতায় পড়ছেন।
উদাহরণ হিসেবে তিনি জানান, আন্তর্জাতিক বাজারে এলাচের দাম যেখানে প্রতি টনে প্রায় ২২ হাজার ডলার, সেখানে শুল্ক নির্ধারণে সরকারের হিসাব অনেক কম ধরা হয়েছে। ফলে আমদানিকারকদের অনেকে বাধ্য হয়ে আন্ডার ইনভয়েসিং বা ওভার ইনভয়েসিংয়ের মতো পদ্ধতির দিকে ঝুঁকছেন।
তার মতে, ব্যবসায়ীরা স্বচ্ছভাবে ব্যবসা করতে চান। কিন্তু বাস্তবতার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ শুল্ক কাঠামো অনেক সময় তাদের বিতর্কিত অবস্থায় ঠেলে দেয়।
নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। গোলাম মাওলা বলেন, জিরা বা এলাচের মতো প্রতিদিনের ব্যবহৃত মসলাপণ্যকে বিলাসপণ্যসদৃশ শুল্ক কাঠামোর আওতায় রাখা হয়েছে। এতে আমদানি ব্যয় বাড়ছে এবং শেষ পর্যন্ত এর চাপ ভোক্তার ওপরই পড়ছে।
তিনি শতাংশভিত্তিক শুল্ক ব্যবস্থার পরিবর্তে নির্দিষ্ট ওজন বা টনপ্রতি নির্ধারিত শুল্ক আরোপের প্রস্তাব দেন। তার দাবি, এতে রাজস্ব আদায়ে স্বচ্ছতা বাড়বে এবং আমদানিতে কারসাজির সুযোগ কমে আসবে।
ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে প্রায়ই ওঠা অর্থ পাচারের অভিযোগ প্রসঙ্গেও কথা বলেন গোলাম মাওলা। তিনি দাবি করেন, বিদেশি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের লেনদেন ও পাওনা সমন্বয়কে অনেক সময় ভুলভাবে অর্থ পাচার হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।
সরকারি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ধীরগতির সমালোচনা করে তিনি বলেন, দীর্ঘ বৈঠক ও আলোচনা শেষে যদি বাস্তব কোনো পরিবর্তন না আসে, তাহলে ব্যবসায়ীদের আস্থা কমে যায়। অর্থনীতি সচল রাখতে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর জোর দেন তিনি।
বিশ্লেষকদের মতে, দেশের নিত্যপণ্যের বাজারে সীমিত সংখ্যক বড় প্রতিষ্ঠানের আধিপত্য বাড়তে থাকলে প্রতিযোগিতা কমে যেতে পারে। এতে মূল্যনিয়ন্ত্রণ, সরবরাহ এবং ভোক্তা স্বার্থ—সব ক্ষেত্রেই দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

