দেশজুড়ে ভয়াবহ হামের প্রাদুর্ভাবের মধ্যে শিশু মৃত্যুর ঘটনায় মায়েদের ‘ফিটনেস সচেতনতা’ নিয়ে সাম্প্রতিক কিছু বক্তব্য নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে। দাবি করা হচ্ছে, অনেক মা শারীরিক গঠন ঠিক রাখার চিন্তায় সন্তানকে বুকের দুধ খাওয়ান না, ফলে শিশুদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমে যাচ্ছে। তবে হাসপাতাল ঘুরে দেখা বাস্তবতা, সরকারি জরিপ ও বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ বলছে—এই সংকটের পেছনে মূল কারণ ভিন্ন, আর দায় এককভাবে মায়েদের ওপর চাপানো পরিস্থিতিকে আরও বিভ্রান্ত করছে।
রাজধানীর মহাখালী সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল, বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হামে আক্রান্ত শিশুদের নিয়ে আসা অসংখ্য পরিবারের সঙ্গে কথা বলে দেখা গেছে, অধিকাংশ মা–ই দরিদ্র ও প্রান্তিক পরিবারের। অনেকের নিজের চিকিৎসা, পুষ্টিকর খাবার বা শিশুর জন্য প্রয়োজনীয় দুধ কেনার সামর্থ্যও সীমিত। পরিবারে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাও তাঁদের হাতে নেই। অনেক ক্ষেত্রে স্বামী বা পরিবারের আপত্তির কারণে শিশুরা নিয়মিত টিকাও পায়নি।
সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে ইনকিলাব মঞ্চের সদস্যসচিব আবদুল্লাহ আল জাবের দাবি করেন, “ফিটনেস হারানোর ভয়ে” ৫৫ শতাংশ মা সন্তানকে বুকের দুধ খাওয়ান না। পরে তিনি বক্তব্যে সংশোধনী এনে বলেন, অনেক মা বিভিন্ন সমস্যার কারণেও বুকের দুধ খাওয়াতে পারেন না। তবে তাঁর বক্তব্য ঘিরে সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়। পরে স্বাস্থ্যমন্ত্রীও শিশুদের অপুষ্টি ও মায়েদের স্বাস্থ্য সংকট নিয়ে বক্তব্য দিতে গিয়ে বুকের দুধ খাওয়ানোর বিষয়টি সামনে আনেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বুকের দুধ খাওয়ানোর হার কমে যাওয়া একটি বাস্তব সমস্যা হলেও এর পেছনে ফিটনেস সচেতনতা প্রধান কারণ—এমন কোনো প্রমাণ এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। বরং সরকারি জরিপে উঠে এসেছে, নির্দিষ্ট সময়ের আগে শিশুকে পানি, ফর্মুলা দুধ বা পরিপূরক খাবার দেওয়া, অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সন্তান জন্মের উচ্চহার, কর্মজীবী মায়েদের ছুটি ও সহায়তার অভাব, পরিবারের অসহযোগিতা এবং ফর্মুলা দুধের আগ্রাসী বিপণনই বড় কারণ হিসেবে কাজ করছে।
‘বাংলাদেশ জনমিতি ও স্বাস্থ্য জরিপ ২০২২’-এর তথ্য অনুযায়ী, ০ থেকে ৫ মাস বয়সী শিশুদের শুধু বুকের দুধ খাওয়ানোর হার ৬৫ শতাংশ থেকে কমে ৫৫ শতাংশে নেমেছে। একই সঙ্গে জন্মের এক ঘণ্টার মধ্যে নবজাতককে বুকের দুধ খাওয়ানোর হারও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। তবে এই প্রতিবেদনে কোথাও মায়েদের ফিটনেস সচেতনতার কারণে বুকের দুধ না খাওয়ানোর তথ্য উল্লেখ নেই।
বাংলাদেশ ব্রেস্টফিডিং ফাউন্ডেশনের পরিচালক খুরশীদ জাহান বলছেন, অনেক নতুন মা সন্তান জন্মের পর মানসিক চাপ ও আত্মবিশ্বাসের সংকটে ভোগেন। শুরুতে বুকে পর্যাপ্ত দুধ না আসা, পরিবার থেকে সহযোগিতা না পাওয়া এবং সঠিক পরামর্শের অভাব বড় সমস্যা। তাঁর মতে, ফিটনেস নিয়ে উদ্বেগ উচ্চবিত্তের একটি ছোট অংশে থাকতে পারে, কিন্তু সেটি মোট চিত্রের খুব সামান্য অংশ।
এদিকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফের বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের অধিকাংশ মা সন্তানকে বুকের দুধ খাওয়ানোর ইচ্ছা পোষণ করেন। কিন্তু বাস্তবে নানা সামাজিক, অর্থনৈতিক ও স্বাস্থ্যগত বাধা সেই ইচ্ছা বাস্তবায়নে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, বর্তমান হাম পরিস্থিতির মূল কারণ হলো টিকাদানে বড় ধরনের ঘাটতি। গত দুই বছরে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে ব্যাঘাত সৃষ্টি হওয়ায় লাখো শিশুর মধ্যে রোগ প্রতিরোধক্ষমতার ঘাটতি তৈরি হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফ আগেই এ বিষয়ে সরকারকে সতর্ক করেছিল।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে ২১ মে পর্যন্ত দেশে হাম ও এর উপসর্গে মারা গেছে ৪৮৮ শিশু। আক্রান্ত ও উপসর্গযুক্ত রোগীর সংখ্যা ৫৯ হাজার ছাড়িয়েছে। হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসা সংকট, আইসিইউ স্বল্পতা এবং ব্যয়বহুল চিকিৎসার কারণে অনেক পরিবার চরম দুর্ভোগে পড়ছে।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ফওজিয়া মোসলেম মনে করেন, শিশু মৃত্যুর মতো বড় জনস্বাস্থ্য সংকটে মায়েদের এককভাবে দায়ী করা বাস্তব সমস্যাগুলোকে আড়াল করার কৌশল। তাঁর ভাষায়, “যেসব মা নিজেরাই অপুষ্টি, দারিদ্র্য ও সামাজিক বৈষম্যের মধ্যে জীবন কাটান, তাঁদের ওপর সব দায় চাপানো অন্যায়।”
জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষকদের মতে, হামের ভয়াবহতা ঠেকাতে এখন সবচেয়ে জরুরি হচ্ছে নিয়মিত টিকাদান জোরদার করা, শিশু ও মায়েদের পুষ্টি নিশ্চিত করা, সরকারি হাসপাতালের সক্ষমতা বাড়ানো এবং পরিবারগুলোকে সঠিক স্বাস্থ্যসেবা ও সচেতনতার আওতায় আনা। শুধু মায়েদের দায়ী করলে সংকটের প্রকৃত কারণগুলো আড়ালেই থেকে যাবে।

