ঢাকার আদ্-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্বল্প সময়ের ব্যবধানে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় তদন্ত কার্যক্রম এখন গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে পৌঁছেছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের গঠিত অভ্যন্তরীণ তদন্ত কমিটি তাদের প্রতিবেদন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে জমা দিয়েছে। তবে প্রতিবেদনের বিষয়বস্তু এখনো জনসমক্ষে আনা হয়নি। একই সঙ্গে সরকারের গঠিত তদন্ত কমিটিও আজ তাদের চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা রয়েছে, যা এ বহুল আলোচিত ঘটনার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ঘটনার পর প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে পাঁচ সদস্যের একটি অনুসন্ধান কমিটি গঠন করা হয়েছিল। ওই কমিটি বিভিন্ন নথি, চিকিৎসা-সংক্রান্ত তথ্য, দায়িত্বে থাকা কর্মীদের বক্তব্য এবং হাসপাতালের সংশ্লিষ্ট ইউনিটের কার্যক্রম পর্যালোচনা করে তাদের প্রতিবেদন প্রস্তুত করে। মঙ্গলবার সেই প্রতিবেদন সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরে জমা দেওয়া হয়।
তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এখনই নিজেদের তদন্তের ফলাফল প্রকাশ করতে আগ্রহী নয়। তাদের অবস্থান হলো, সরকারের তদন্ত প্রতিবেদনের আগে কোনো তথ্য প্রকাশ করা হলে তা বিভ্রান্তির সৃষ্টি করতে পারে। এজন্য সরকারি প্রতিবেদন প্রকাশের পরই তারা নিজেদের অনুসন্ধানের বিস্তারিত তুলে ধরবে।
ঘটনাটিকে ঘিরে শুরু থেকেই জনমনে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে একই হাসপাতালে অল্প কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ছয় নবজাতকের মৃত্যু চিকিৎসাসেবা, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং হাসপাতালের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনা নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। এ কারণে তদন্ত প্রতিবেদনকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
উল্লেখ্য, গত ২৭ মে ভোররাতে প্রায় তিন ঘণ্টার মধ্যে হাসপাতালটিতে ছয় নবজাতকের মৃত্যু হয়। ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর তা ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। এক পর্যায়ে নিহত শিশুদের একজনের স্বজন রাজধানীর রমনা থানায় মামলা দায়ের করেন। এর ফলে ঘটনাটি শুধু প্রশাসনিক তদন্তেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং আইনগত অনুসন্ধানের আওতাতেও এসেছে।
মৃত্যুর ঘটনার পরপরই স্বাস্থ্য খাতের বিভিন্ন সংস্থা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং স্থানীয় প্রশাসনের প্রতিনিধিরা হাসপাতালটি পরিদর্শন করেন। হাসপাতালের বিভিন্ন বিভাগ, বিশেষ করে নবজাতক পরিচর্যা ইউনিটের পরিবেশ ও ব্যবস্থাপনা খতিয়ে দেখা হয়। এ সময় বেশ কিছু অনিয়ম ও ত্রুটির অভিযোগও সামনে আসে।
পরে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় একটি তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে। কমিটিকে দ্রুত মৃত্যুর কারণ অনুসন্ধান, সম্ভাব্য দায় নির্ধারণ এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় সুপারিশ দেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া হয়। প্রাথমিকভাবে তিন দিনের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশনা থাকলেও তদন্তের পরিধি বিস্তৃত হওয়ায় কমিটি অতিরিক্ত সময় চায়। সেই সময়সীমা শেষ হচ্ছে আজ।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তদন্ত কমিটি স্বাধীনভাবে কাজ করেছে এবং তাদের ওপর কোনো ধরনের প্রভাব বা হস্তক্ষেপ করা হয়নি। ফলে প্রতিবেদনে উঠে আসা তথ্যকে গুরুত্বের সঙ্গে মূল্যায়ন করা হবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন।
ঘটনার পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ একবার সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করার প্রস্তুতি নিয়েছিল। কিন্তু শেষ মুহূর্তে সেই উদ্যোগ স্থগিত করা হয়। একই দিনে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের যৌথ অভিযানে হাসপাতালটিকে আর্থিক জরিমানাও করা হয়। এতে প্রতিষ্ঠানটির সেবা ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়।
স্বাস্থ্য খাতের বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, নবজাতক মৃত্যুর মতো সংবেদনশীল ঘটনায় শুধু দায় নির্ধারণই যথেষ্ট নয়; বরং হাসপাতালের অবকাঠামো, যন্ত্রপাতির কার্যকারিতা, অক্সিজেন ও বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি এবং জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার সক্ষমতাও গভীরভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। কারণ তদন্তে যে কারণই উঠে আসুক না কেন, ভবিষ্যতে এমন ঘটনা প্রতিরোধে একটি শক্তিশালী তদারকি কাঠামো গড়ে তোলা জরুরি।
এখন সবার নজর সরকারি তদন্ত প্রতিবেদনের দিকে। সেখানে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ, কোনো অবহেলা বা গাফিলতির প্রমাণ পাওয়া গেছে কি না এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে—এসব বিষয় স্পষ্ট হতে পারে। তদন্তে অনিয়ম বা দায়িত্বহীনতার প্রমাণ মিললে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে আগেই সরকারের পক্ষ থেকে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
স্বাস্থ্যসেবার মান, রোগীর নিরাপত্তা এবং হাসপাতাল ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহি নিশ্চিত করার প্রশ্নে এই তদন্তের ফলাফল গুরুত্বপূর্ণ নজির হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট পর্যবেক্ষকরা।

