জাতীয় নাগরিক পার্টির সিনিয়র যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক ও নোয়াখালী-৬ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল হান্নান মাসউদকে ঘিরে নতুন রাজনৈতিক বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। বিএনপির নেতা রাশেদ খাঁন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তার বিরুদ্ধে একাধিক গুরুতর অভিযোগ উত্থাপন করেছেন। অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে আওয়ামী লীগের নেতাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ, অর্থ লেনদেনের আলোচনা এবং রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা।
বুধবার নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া দীর্ঘ এক পোস্টে রাশেদ খাঁন দাবি করেন, গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে হান্নান মাসউদের রাজনৈতিক অবস্থান ও কর্মকাণ্ডে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা যায়। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ওই সময় আওয়ামী লীগের বিভিন্ন নেতার সঙ্গে একাধিক বৈঠকে অংশ নেন হান্নান মাসউদ এবং এসব বৈঠকের কিছু অংশ অর্থনৈতিক সমঝোতা ও রাজনৈতিক দরকষাকষিকে কেন্দ্র করে অনুষ্ঠিত হয়েছিল।
রাশেদ খাঁনের পোস্টে সবচেয়ে আলোচিত অভিযোগটি হলো, আওয়ামী লীগের একজন নেতাকে নিরাপদে বিমানবন্দর পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়ার বিনিময়ে বিপুল অঙ্কের অর্থ দাবি করা হয়েছিল। তিনি দাবি করেন, এ বিষয়ে কয়েক কোটি টাকার একটি সমঝোতার আলোচনা হয়েছিল এবং ওই আলোচনায় অর্থের পরিমাণ বাড়ানোর কথাও বলা হয়েছিল। তবে তিনি তার বক্তব্যের পক্ষে কোনো নথি, অডিও, ভিডিও বা অন্য কোনো প্রত্যক্ষ প্রমাণ প্রকাশ করেননি।
পোস্টে আরও উল্লেখ করা হয়, গণঅভ্যুত্থানের সময় সমন্বয়কদের ঘনিষ্ঠ একজন সহযোগী হিসেবে পরিচিত আবদুল গাফফার জিসান এসব ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী বা অবগত ব্যক্তি হতে পারেন। রাশেদ খাঁনের দাবি, জিসান দীর্ঘ সময় ধরে আন্দোলনের বিভিন্ন কার্যক্রমে যুক্ত ছিলেন এবং সমন্বয়কদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছেন। ফলে আন্দোলন-পরবর্তী সময়ের নানা ঘটনার বিষয়ে তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য থাকতে পারে।
বিএনপি নেতার বক্তব্য অনুযায়ী, জিসান একসময় হান্নান মাসউদের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে কাজ করলেও পরবর্তীতে তাদের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়। তিনি অভিযোগ করেন, অর্থ ও ক্ষমতাকেন্দ্রিক কিছু কর্মকাণ্ডে অসন্তুষ্ট হয়েই জিসান সরে যান। তবে এসব দাবির স্বাধীন কোনো যাচাই এখনো সম্ভব হয়নি।
পোস্টে নোয়াখালীর রাজনীতির প্রসঙ্গও উঠে আসে। রাশেদ খাঁন অভিযোগ করেন, স্থানীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং সংসদীয় রাজনীতিতে অবস্থান শক্তিশালী করার লক্ষ্য থেকে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। তার দাবি, এক সাবেক সংসদ সদস্যকে রাজনৈতিক বাধা হিসেবে বিবেচনা করা হতো এবং তাকে ঘিরে বিভিন্ন কৌশলগত পদক্ষেপ গ্রহণের চেষ্টা হয়েছিল।
তবে অভিযোগগুলো প্রকাশের পরপরই রাজনৈতিক অঙ্গনে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। একদিকে কেউ কেউ এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি তুলেছেন, অন্যদিকে অনেকে মনে করছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উত্থাপিত অভিযোগকে সত্য বলে ধরে নেওয়ার আগে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ও তথ্য যাচাই করা জরুরি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে দেশের রাজনীতিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে, যেখানে বিভিন্ন পক্ষ নিজেদের অবস্থান তুলে ধরছে এবং প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনছে। কিন্তু এসব অভিযোগের বিশ্বাসযোগ্যতা নির্ভর করে তথ্য-প্রমাণ, তদন্ত এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষের জবাবের ওপর। তাই কেবল ফেসবুক পোস্টের ভিত্তিতে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সমীচীন নয়।
এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত আব্দুল হান্নান মাসউদের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। অভিযোগগুলোর বিষয়ে তার বক্তব্য সামনে এলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হতে পারে। একই সঙ্গে অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাইয়ে কোনো তদন্ত বা আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয় কি না, সেটিও রাজনৈতিক মহলে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যেহেতু অভিযোগগুলো অর্থ লেনদেন, রাজনৈতিক প্রভাব এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের মতো সংবেদনশীল বিষয়কে ঘিরে, তাই এ ধরনের দাবির ক্ষেত্রে স্বচ্ছ তদন্তই হতে পারে জনমনে তৈরি হওয়া প্রশ্নের গ্রহণযোগ্য উত্তর। অন্যথায় অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগের মধ্যেই বিষয়টি সীমাবদ্ধ থেকে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

