রাজধানীর মিরপুরে বাসার একটি কক্ষ থেকে ৭৫ বছর বয়সী এক বৃদ্ধার মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় নতুন আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ঘটনাটি ঘিরে মানবাধিকার লঙ্ঘনের কোনো উপাদান রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে আদালতের হস্তক্ষেপ চেয়ে হাইকোর্টে জনস্বার্থে একটি রিট আবেদন দায়ের করা হয়েছে।
বুধবার সুপ্রিম কোর্টের এক আইনজীবী এ রিট দায়ের করেন। আবেদনে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্তের নির্দেশ দেওয়ার পাশাপাশি বৃদ্ধা নুরজাহান বেগমের জীবনযাপন, পরিচর্যা এবং মৃত্যুর আগে তার অবস্থার বিষয়ে বিস্তারিত অনুসন্ধানের আবেদন জানানো হয়েছে।
রিট আবেদনে বলা হয়েছে, একজন বয়স্ক নাগরিক হিসেবে নুরজাহান বেগম ন্যূনতম মানবিক সেবা ও যত্ন পেয়েছিলেন কি না, সেটি খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। যদি অবহেলা, অমানবিক আচরণ বা দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে তার জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনায় আনা উচিত।
গত ৩১ মে রাজধানীর মিরপুর-১১ এলাকার একটি বাসা থেকে নুরজাহান বেগমের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। জরুরি সেবা নম্বরে ফোন পাওয়ার পর ঘটনাস্থলে গিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা মরদেহটি উদ্ধার করেন।
পুলিশের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, তিনি মেয়ের বাসায় বসবাস করলেও আলাদা একটি কক্ষে থাকতেন। কয়েকদিন ধরে কোনো সাড়া না পাওয়ায় পরিবারের পক্ষ থেকে একজন নার্সকে ডাকা হয়। পরে ওই কক্ষে প্রবেশ করে তাকে মৃত অবস্থায় দেখতে পাওয়া যায়। এরপর বিষয়টি পুলিশকে জানানো হয়।
তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, মরদেহ উদ্ধারের সময় সেটিতে পচন ধরার লক্ষণ দেখা যায়, যা থেকে ধারণা করা হচ্ছে মৃত্যুর পর বেশ কিছু সময় কেটে গিয়েছিল। এছাড়া যে কক্ষে তিনি অবস্থান করতেন, সেটির পরিবেশও ছিল অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর। ঘরজুড়ে আবর্জনা, অগোছালো অবস্থা এবং দুর্গন্ধের উপস্থিতি তদন্তকারীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।
ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন মহলে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, একজন প্রবীণ নারী কীভাবে এমন পরিস্থিতিতে দীর্ঘদিন বসবাস করছিলেন এবং তার দেখভাল ও পরিচর্যার দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করা হয়েছিল কি না।
মানবাধিকার কর্মীদের মতে, প্রবীণ নাগরিকদের প্রতি অবহেলা কেবল পারিবারিক সমস্যা নয়; অনেক ক্ষেত্রে এটি মানবাধিকার ও সামাজিক দায়িত্ববোধের প্রশ্নও হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে অসুস্থ, একাকী বা নির্ভরশীল বয়স্ক ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি সমাজ ও রাষ্ট্রেরও কিছু দায়িত্ব রয়েছে।
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আদালত যদি রিটটি শুনানির জন্য গ্রহণ করেন, তাহলে ঘটনাটির বিভিন্ন দিক নিয়ে তদন্তের নির্দেশ আসতে পারে। সেক্ষেত্রে মৃত্যুর কারণের পাশাপাশি বৃদ্ধার জীবনযাপনের পরিবেশ, পারিবারিক পরিস্থিতি এবং তার প্রতি যথাযথ যত্ন নেওয়া হয়েছিল কি না—এসব বিষয়ও গুরুত্ব পেতে পারে।
ঘটনাটি দেশে প্রবীণ নাগরিকদের নিরাপত্তা, পারিবারিক দায়িত্ববোধ এবং মানবিক আচরণ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু করেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, আদালতের নির্দেশনা ও তদন্তের ফলাফল শুধু এই ঘটনার প্রকৃত চিত্রই সামনে আনবে না, বরং ভবিষ্যতে প্রবীণদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

