কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতি যেমন নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিচ্ছে, তেমনি তৈরি করছে নতুন ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকিও। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, কিছু জনপ্রিয় এআই প্ল্যাটফর্ম বিশেষ ধরনের নির্দেশনা পেলে জাতীয় পরিচয়পত্রের ছবি, নাম, পরিচয় নম্বর এমনকি স্বাক্ষরের মতো সংবেদনশীল তথ্যও পরিবর্তন করতে সক্ষম হচ্ছে। এতে পরিচয় জালিয়াতি, আর্থিক প্রতারণা এবং ডিজিটাল নিরাপত্তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
তথ্য যাচাই ও গবেষণাধর্মী প্রতিষ্ঠান ডিসমিসল্যাবের এক পরীক্ষায় বিশ্বের কয়েকটি বহুল ব্যবহৃত এআই প্ল্যাটফর্মের নিরাপত্তা ব্যবস্থা মূল্যায়ন করা হয়। গবেষণায় দেখা যায়, সব প্ল্যাটফর্মের নিরাপত্তা কাঠামো সমান কার্যকর নয়। কোথাও ঝুঁকিপূর্ণ অনুরোধ সরাসরি আটকে দেওয়া হয়েছে, আবার কোথাও আংশিকভাবে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে কোনো দৃশ্যমান সতর্কবার্তাও পাওয়া যায়নি।
পরীক্ষার অংশ হিসেবে গবেষকরা অনলাইনে পাওয়া একটি বাংলাদেশি জাতীয় পরিচয়পত্রের নমুনা এবং একটি স্টক ছবি ব্যবহার করেন। এরপর কাল্পনিক পরিচয়, নাম, পিতা-মাতার তথ্য ও পরিচয় নম্বর সংযোজনের মাধ্যমে বিভিন্ন এআই সিস্টেমের প্রতিক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করা হয়। গবেষণার উদ্দেশ্য ছিল সরকারি পরিচয়পত্র-সদৃশ নথিতে পরিবর্তনের অনুরোধ এআই কীভাবে সামলায়, তা যাচাই করা।
গবেষণার ফলাফল অনুযায়ী, কিছু প্ল্যাটফর্ম নাম, পরিচয় নম্বর ও অন্যান্য তথ্য পরিবর্তনের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সীমাবদ্ধতা আরোপ করলেও অন্য কিছু প্ল্যাটফর্ম তুলনামূলকভাবে সহজেই এসব পরিবর্তন করে দিয়েছে। বিশেষ করে দুটি বহুল আলোচিত এআই সেবাকে গবেষকরা অধিক ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। কারণ সেগুলো পরিচয়পত্রসদৃশ নথিতে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিবর্তন করে বাস্তবসম্মত ফলাফল তৈরি করতে পেরেছে।
গবেষকদের মতে, উদ্বেগের বিষয় শুধু তথ্য পরিবর্তনের সক্ষমতা নয়; বরং অনেক ক্ষেত্রে ব্যবহারকারীকে পর্যাপ্ত সতর্কবার্তা না দেওয়া। এর ফলে প্রযুক্তি সম্পর্কে কম জ্ঞানসম্পন্ন ব্যবহারকারীরাও অপব্যবহারের সুযোগ পেতে পারে।
অন্যদিকে কিছু এআই প্ল্যাটফর্ম তুলনামূলকভাবে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। তারা পরিচয়পত্রের সংবেদনশীল তথ্য পরিবর্তনের অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেছে অথবা আংশিক পরিবর্তনের পর নিরাপত্তা সতর্কতা দেখিয়েছে। তবে গবেষণাটি ইঙ্গিত করছে যে বর্তমান নিরাপত্তা ব্যবস্থা সব ক্ষেত্রে সমান কার্যকর নয়।
শুধু বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয়পত্র নয়, বিদেশি পরিচয়পত্র নিয়েও একই ধরনের পরীক্ষা চালানো হয়। মালয়েশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের পরিচয়পত্রের নমুনা ব্যবহার করে পরিচালিত পরীক্ষাতেও অনুরূপ ফলাফল পাওয়া গেছে। এতে বোঝা যাচ্ছে, সমস্যাটি কোনো নির্দিষ্ট দেশের নথির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি বৈশ্বিক পর্যায়ের একটি প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ।
গবেষণার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এআই কোম্পানিগুলোর প্রকাশ্য নীতিমালা ও বাস্তব কার্যকারিতার মধ্যে ব্যবধান। অধিকাংশ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান তাদের নীতিমালায় জালিয়াতি, প্রতারণা ও ভুয়া পরিচয় তৈরির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। কিন্তু বাস্তব পরীক্ষায় দেখা গেছে, কিছু ক্ষেত্রে সেই নীতিমালার প্রয়োগ যথেষ্ট শক্তিশালী নয়। ফলে নীতিগত নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও নিরাপত্তা ব্যবস্থায় ফাঁক থেকে যাচ্ছে।
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান সময়ে ব্যাংক হিসাব খোলা, মোবাইল সিম নিবন্ধন, চাকরির আবেদন, আর্থিক লেনদেন, ভ্রমণ এবং বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে পরিচয়পত্র অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই যদি প্রযুক্তির মাধ্যমে বিশ্বাসযোগ্য ভুয়া পরিচয়পত্র তৈরি করা সম্ভব হয়, তাহলে প্রতারণার ঝুঁকি বহুগুণে বেড়ে যেতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শুধু এআই কোম্পানিগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা শক্তিশালী করাই যথেষ্ট নয়। একই সঙ্গে জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট ও অন্যান্য সরকারি নথিতে উন্নত যাচাইকরণ প্রযুক্তি যুক্ত করতে হবে। কিউআর কোড, ডিজিটাল ভেরিফিকেশন, কেন্দ্রীয় ডেটাবেজ যাচাই এবং বহুমাত্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছাড়া ভবিষ্যতে জালিয়াতি প্রতিরোধ কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
গবেষণাটি আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা সামনে এনেছে—প্রযুক্তি যত উন্নত হচ্ছে, অপব্যবহারের কৌশলও তত আধুনিক হচ্ছে। ফলে কেবল প্রযুক্তিনির্ভর সমাধান নয়, ব্যবহারকারীদের সচেতনতা বৃদ্ধি, প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা নীতিমালা হালনাগাদ এবং আইনগত কাঠামো শক্তিশালী করাও জরুরি।
বিশ্লেষকদের মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আগামী দিনের অর্থনীতি ও সমাজের অন্যতম চালিকাশক্তি হলেও এর নিরাপত্তাজনিত দুর্বলতাগুলো দ্রুত সমাধান করা না গেলে পরিচয় জালিয়াতি, আর্থিক প্রতারণা এবং সাইবার অপরাধের নতুন ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তাই এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া সময়ের দাবি।

