সরকারি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা, ব্যয় বৃদ্ধি ও প্রশাসনিক জটিলতা কমাতে বড় ধরনের নজরদারি ব্যবস্থার ঘোষণা দিয়েছে সরকার। এখন থেকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়সহ সব মন্ত্রণালয়ে ডিজিটাল ড্যাশবোর্ড চালু করে প্রকল্পের অগ্রগতি প্রতিদিন পর্যবেক্ষণ করা হবে। কোনো প্রকল্প অযৌক্তিকভাবে আটকে গেলে বা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ এগিয়ে না নিলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানিয়েছে সরকার।
অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, বাজেটে অর্থ বরাদ্দ দেওয়া যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে দ্রুত ও কার্যকর বাস্তবায়ন। অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, বরাদ্দ থাকা সত্ত্বেও অনেক প্রকল্প সময়মতো শেষ হয় না। ফলে জনগণ কাঙ্ক্ষিত সুবিধা পায় না এবং সরকারের উন্নয়ন কার্যক্রমও বাধাগ্রস্ত হয়। এই বাস্তবতা থেকেই নতুন পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সরকার এখন উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদনের ক্ষেত্রে চারটি মৌলিক বিষয়কে গুরুত্ব দেবে। এগুলো হলো—ব্যয়ের তুলনায় জনগণের লাভ, বিনিয়োগের প্রত্যাবর্তন, কর্মসংস্থান সৃষ্টির সক্ষমতা এবং পরিবেশের ওপর প্রভাব। কোনো প্রকল্প এসব মানদণ্ডে উত্তীর্ণ না হলে তা অনুমোদন পাবে না।
সরকারি সূত্র বলছে, শুধু নতুন প্রকল্প নয়, আগের সরকারগুলোর সময় নেওয়া প্রায় ১ হাজার ৩০০ প্রকল্পও নতুন করে মূল্যায়ন করা হচ্ছে। যেসব প্রকল্প জনস্বার্থে কার্যকর নয় বা প্রত্যাশিত সুফল দেবে না, সেগুলো বাতিল করা হতে পারে। আবার যেসব প্রকল্পে ইতোমধ্যে বিপুল অর্থ ব্যয় হয়েছে, সেগুলোর লক্ষ্য ও কাঠামো পরিবর্তন করে নতুনভাবে বাস্তবায়নের পরিকল্পনাও রয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বাংলাদেশের উন্নয়ন ব্যবস্থার অন্যতম বড় সমস্যা হলো প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘ বিলম্ব। অনেক ক্ষেত্রে প্রকল্পের মেয়াদ কয়েক দফা বাড়াতে হয়, ফলে ব্যয়ও বহুগুণ বেড়ে যায়। নতুন ডিজিটাল ড্যাশবোর্ড ব্যবস্থা কার্যকর হলে প্রকল্পের অগ্রগতি সরাসরি পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে এবং দায়বদ্ধতা বাড়বে।
অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা দেশের ব্যাংকিং খাত নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তার মতে, অনেক ব্যাংক বর্তমানে মূলধন সংকটে রয়েছে এবং আর্থিক খাতের ওপর মানুষের আস্থা পুরোপুরি ফিরিয়ে আনাই এখন সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার। এজন্য আন্তর্জাতিক বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা চলছে। ব্যাংক পুনঃমূলধনীকরণ এবং ব্যবসায়িক খাতকে শক্তিশালী করার বিষয়ে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহও রয়েছে বলে তিনি জানান।
পুঁজিবাজার নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছেন তিনি। আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের নতুন চেয়ারম্যান ও কমিশনার নিয়োগের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি পুনর্গঠনের পরিকল্পনার কথা জানান তিনি। তার ভাষ্য, রাজনৈতিক বিবেচনার পরিবর্তে পেশাগত দক্ষতাকে গুরুত্ব দিয়েই নতুন নেতৃত্ব নির্বাচন করা হবে।
আসন্ন জাতীয় বাজেটকে দেশের সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে একটি কঠিন চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেছেন তিনি। দারিদ্র্য বৃদ্ধি, কর্মসংস্থানের সংকট, বিনিয়োগে স্থবিরতা এবং শিল্প খাতে ধীরগতির কারণে অর্থনীতি চাপে রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে পুনরুজ্জীবিত করতে সরকার ব্যয় বাড়ানোর কৌশল নিয়েছে।
সামাজিক সুরক্ষার অংশ হিসেবে আগামী অর্থবছরে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির জন্য ১৪ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি। একই সঙ্গে কৃষকদের সহায়তায় কৃষক কার্ড বিতরণ কার্যক্রম জোরদার করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
স্বাস্থ্য খাত নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, বাংলাদেশে সাধারণ মানুষ চিকিৎসা ব্যয়ের বড় অংশ নিজ পকেট থেকে বহন করেন, যা অনেক নিম্নআয়ের দেশের তুলনাতেও বেশি। এ পরিস্থিতি পরিবর্তনে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও উন্নয়ন সংস্থার সহযোগিতায় প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
অর্থনীতির নতুন সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র হিসেবে সৃজনশীল অর্থনীতির কথাও তুলে ধরেন তিনি। দক্ষতা উন্নয়ন, পণ্যের মান বৃদ্ধি এবং দেশীয় উদ্যোক্তাদের আন্তর্জাতিক অনলাইন বাজারে প্রবেশের সুযোগ বাড়াতে বাজেটে বিশেষ সহায়তার পরিকল্পনা রয়েছে।
বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরির লক্ষ্যে প্রশাসনিক জটিলতা কমানোরও ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। ব্যবসা পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় সব অনুমোদন ও লাইসেন্স একটি নির্দিষ্ট কেন্দ্র থেকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কোনো সরকারি দপ্তর সাড়া না দিলে আবেদন স্বয়ংক্রিয়ভাবে অনুমোদিত বলে গণ্য হবে—এমন ব্যবস্থাও বিবেচনায় রয়েছে।
তবে অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী নেতারা সরকারের লক্ষ্য ও বাস্তবতার মধ্যে ব্যবধানের বিষয়টি সামনে এনেছেন। তাদের মতে, রাজস্ব আদায়ে দীর্ঘদিনের দুর্বলতা, উন্নয়ন ব্যয়ের তুলনায় পরিচালন ব্যয়ের বৃদ্ধি এবং বিনিয়োগ পরিবেশের নানা সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতে না পারলে বাজেট বাস্তবায়ন কঠিন হতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, সরকারের ঘোষিত সংস্কারগুলো বাস্তবে কার্যকর করা গেলে উন্নয়ন প্রকল্পে গতি আসবে, বিনিয়োগ বাড়বে এবং প্রশাসনিক জবাবদিহি শক্তিশালী হবে। তবে এর সফলতা নির্ভর করবে রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং বাস্তবায়ন সক্ষমতার ওপর।

