দীর্ঘদিনের বৈষম্য ও বিভিন্ন দাবির সমাধান না হওয়ায় ভিন্নধর্মী কর্মসূচি হাতে নিয়েছেন দেশের পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিগুলোর কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। আন্দোলন বা কর্মবিরতির পরিবর্তে এবার তারা গ্রাহকসেবা ও রাজস্ব আদায় বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে প্রতিদিন এক ঘণ্টা অতিরিক্ত দায়িত্ব পালনের ঘোষণা দিয়েছেন।
বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুৎ অ্যাসোসিয়েশনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আগামী ১৪ জুন থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত দেশের ৮০টি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নিয়মিত দায়িত্বের বাইরে অতিরিক্ত এক ঘণ্টা কাজ করবেন। সংগঠনটির দাবি, এ উদ্যোগের মাধ্যমে একদিকে যেমন দীর্ঘদিনের বৈষম্য ও বঞ্চনার বিষয়টি তুলে ধরা হবে, অন্যদিকে গ্রাহকসেবা ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনার দক্ষতাও বাড়ানো সম্ভব হবে।
সংগঠনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সারা দেশে প্রায় ৪৬ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারী এই কর্মসূচিতে অংশ নেবেন। তাদের হিসাব অনুযায়ী, নির্ধারিত সময়জুড়ে অতিরিক্ত কাজের ফলে জাতীয় পর্যায়ে প্রায় ৭ লাখ ৮২ হাজার কর্মঘণ্টা যুক্ত হবে, যা বিদ্যুৎ খাতের বিভিন্ন সেবামূলক কার্যক্রমে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
পল্লী বিদ্যুৎ সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা গ্রাহক অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তি, বকেয়া বিল আদায়, মাঠপর্যায়ের তদারকি বৃদ্ধি এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে সহায়ক হবে। একই সঙ্গে রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রেও এর সুফল মিলতে পারে।
সংগঠনটির দাবি, পল্লী বিদ্যুতায়ন ব্যবস্থায় বিদ্যমান নানা বৈষম্য ও প্রশাসনিক জটিলতা নিয়ে তারা দীর্ঘদিন ধরে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে আসছে। ২০২৪ সাল থেকে এ বিষয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা হলেও এখনো অনেক সমস্যা অমীমাংসিত রয়ে গেছে। বিষয়গুলো সমাধানে একাধিক কমিটি গঠন করা হলেও বাস্তব অগ্রগতি প্রত্যাশার তুলনায় কম বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তাদের অভিযোগ, বিদ্যুৎ খাত সংস্কার ও কর্মীদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট কিছু বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে নির্দেশনা ও সুপারিশ দেওয়া হলেও সেগুলোর বাস্তবায়ন হয়নি। ফলে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে। তবে সেই অসন্তোষ প্রকাশে সেবামূলক কার্যক্রম ব্যাহত না করে ইতিবাচক বার্তা দেওয়ার জন্যই অতিরিক্ত কর্মঘণ্টার পথ বেছে নেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুৎ অ্যাসোসিয়েশন বলছে, এই কর্মসূচি সরকারের জ্বালানি সাশ্রয় উদ্যোগের প্রতিও সংহতির বহিঃপ্রকাশ। একই সঙ্গে এটি প্রমাণ করবে যে, দাবি-দাওয়া আদায়ের প্রশ্নে দায়িত্বশীল ও জনবান্ধব অবস্থান নিয়েও কর্মীরা নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরতে পারেন।
বিশ্লেষকদের মতে, সাধারণত দাবি আদায়ে কর্মবিরতি, ধর্মঘট বা কর্মসূচির কারণে সেবা খাতে বিঘ্ন ঘটে। সেখানে পল্লী বিদ্যুৎ কর্মীদের অতিরিক্ত কাজের ঘোষণা একটি ব্যতিক্রমী উদ্যোগ। এর মাধ্যমে একদিকে সেবা কার্যক্রম সচল থাকবে, অন্যদিকে সংশ্লিষ্ট সমস্যাগুলোর প্রতি নীতিনির্ধারকদের মনোযোগ আকর্ষণের সুযোগ তৈরি হবে।
বিদ্যুৎ খাত বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের গ্রামীণ অর্থনীতি, কৃষি উৎপাদন এবং ক্ষুদ্র শিল্পের সঙ্গে পল্লী বিদ্যুৎ ব্যবস্থার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। ফলে এ খাতের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের সমস্যা দ্রুত সমাধান করা গেলে সেবার মান আরও উন্নত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। একই সঙ্গে কর্মীদের মধ্যে আস্থা ও কর্মোদ্যমও বৃদ্ধি পাবে।
সংশ্লিষ্ট মহলের প্রত্যাশা, অতিরিক্ত কর্মঘণ্টার এই উদ্যোগ শুধু সাময়িক কর্মসূচি হয়ে থাকবে না; বরং এর মাধ্যমে বিদ্যুৎ খাতের বিদ্যমান সমস্যাগুলো সমাধানে কার্যকর সংলাপ ও বাস্তব পদক্ষেপের পথ তৈরি হবে।

