পিতা-মাতার ভরণপোষণ নিশ্চিত করতে বিদ্যমান আইনের আরও কার্যকর প্রয়োগ এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিতে বিশেষ আদালত গঠনের প্রয়োজন রয়েছে বলে মত দিয়েছেন আইন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, আইনের বাস্তব প্রয়োগ জোরদার করা গেলে বৃদ্ধ মা-বাবার প্রতি অবহেলা, নির্যাতন ও দায়িত্বহীন আচরণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে।
রাজধানীতে এক ছায়া সংসদ অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার মো. বদরুদ্দোজা বাদল বলেন, পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইনকে বর্তমান সময়ের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে সংশোধন করা প্রয়োজন। পাশাপাশি এ সংক্রান্ত মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য পৃথক বিশেষ আদালত প্রতিষ্ঠা করা হলে আইনের কার্যকারিতা আরও বাড়বে।
তিনি বলেন, সমাজে বৃদ্ধ মা-বাবার প্রতি অবহেলা ও নির্যাতনের ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষিত ও আর্থিকভাবে স্বচ্ছল পরিবারেও বার্ধক্যে পৌঁছানো বাবা-মা সন্তানের অবজ্ঞা ও উপেক্ষার শিকার হচ্ছেন। কেবল আইনি বাধ্যবাধকতা নয়, সামাজিক ও নৈতিক দায়বদ্ধতার জায়গা থেকেও এ পরিস্থিতির পরিবর্তন প্রয়োজন।
সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানীর মিরপুরে এক বৃদ্ধা নারীর মৃত্যুর ঘটনা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে বিদ্যমান আইনের কঠোর প্রয়োগ জরুরি। আইনে শাস্তির বিধান থাকায় অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
ব্যারিস্টার বাদল আরও বলেন, শুধু ভুক্তভোগী বাবা-মা নয়, প্রতিবেশী বা সংশ্লিষ্ট অন্য কেউও অভিযোগ করার সুযোগ পেলে অনেক ঘটনা দ্রুত সামনে আসতে পারে। তাঁর মতে, সন্তানদের অবহেলা, নির্যাতন বা ভরণপোষণে ব্যর্থতার অভিযোগ প্রমাণিত হলে আইন সংশোধনের মাধ্যমে উত্তরাধিকার সুবিধা সীমিত বা বাতিল করার বিষয়টিও বিবেচনায় আনা যেতে পারে।
তিনি সতর্ক করে বলেন, বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রিতা, প্রশাসনিক উদাসীনতা কিংবা অন্য কোনো প্রভাবের কারণে আইন প্রয়োগ বাধাগ্রস্ত হলে সমাজে অপরাধপ্রবণতা বাড়তে পারে। তাই বৃদ্ধ মা-বাবার অধিকার রক্ষায় আইনি কাঠামোর পাশাপাশি জনসচেতনতা বৃদ্ধি সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে ডিবেট ফর ডেমোক্রেসির চেয়ারম্যান হাসান আহমেদ চৌধুরী কিরণ বলেন, সন্তানদের হাতে মা-বাবার অবহেলা ও নির্যাতনের ঘটনা সমাজের জন্য অত্যন্ত লজ্জাজনক। তিনি অভিযোগ করেন, অনেক ক্ষেত্রে সন্তানরা বাবা-মায়ের সম্পদ নিজেদের নামে লিখে নেওয়ার পর তাঁদের একাকী ও অসহায় অবস্থায় ফেলে রাখে।
তিনি বলেন, দেশে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। অথচ প্রবীণদের জন্য পর্যাপ্ত সেবা ও আবাসন ব্যবস্থা এখনো গড়ে ওঠেনি। প্রবীণ নাগরিকদের মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করতে প্রতিটি জেলায় আধুনিক ও মানসম্মত বৃদ্ধ নিবাস প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা গ্রহণের আহ্বান জানান তিনি।
বক্তারা মনে করেন, পরিবারভিত্তিক মূল্যবোধের অবক্ষয়, নগরজীবনের ব্যস্ততা এবং সামাজিক বন্ধনের দুর্বলতার কারণে প্রবীণদের প্রতি দায়িত্ববোধ কমে যাচ্ছে। ফলে শুধু আইন নয়, পারিবারিক শিক্ষা, সামাজিক সচেতনতা এবং মানবিক মূল্যবোধ জোরদার করাও জরুরি হয়ে উঠেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা আগামী বছরগুলোতে আরও বাড়বে। তাই এখনই কার্যকর নীতি, শক্তিশালী আইনি সুরক্ষা এবং দ্রুত বিচারব্যবস্থা নিশ্চিত করা না গেলে বৃদ্ধ মা-বাবার নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইনকে আরও যুগোপযোগী ও বাস্তবমুখী করার দাবিও তাই ক্রমেই জোরালো হচ্ছে।

