রাজধানীর আদ্-দ্বীন হাসপাতালকে ঘিরে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল। ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনার পর হাসপাতালটির লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্তের প্রসঙ্গ টেনে তিনি দাবি করেছেন, সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের জন্য হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কোটি কোটি টাকা নিয়ে তার পেছনে ঘুরেছে। তবে কোনো ধরনের চাপ বা প্রভাব কাজে আসেনি বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি।
শনিবার নরসিংদীর মনোহরদী উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে দরিদ্র ও অসহায় মানুষের মধ্যে আর্থিক অনুদান বিতরণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এ মন্তব্য করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। অনুষ্ঠানে উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন ও পৌর এলাকার দুই শতাধিক মানুষের হাতে আর্থিক সহায়তা তুলে দেওয়া হয়।
বক্তব্যে মন্ত্রী বলেন, ছয় নবজাতকের মৃত্যুর মতো একটি গুরুতর ঘটনার পর সরকারের দায়িত্ব ছিল কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া। তিনি দাবি করেন, হাসপাতালটির লাইসেন্স রক্ষার জন্য বিভিন্নভাবে চেষ্টা করা হলেও শেষ পর্যন্ত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তার ভাষায়, কোটি কোটি টাকার প্রস্তাবও তাকে সিদ্ধান্ত থেকে সরাতে পারেনি।
এই বক্তব্যের মাধ্যমে স্বাস্থ্যখাতে জবাবদিহিতা ও নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নটি আবারও সামনে এসেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, চিকিৎসাসেবার মান, হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিয়ে জনমনে যে উদ্বেগ রয়েছে, তা দূর করতে সরকারের কঠোর অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিতে পারে। তবে একই সঙ্গে এমন অভিযোগের বিষয়ে স্বচ্ছ তদন্ত ও প্রমাণভিত্তিক তথ্য প্রকাশও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বর্তমান সরকারের স্বাস্থ্যসেবা পরিকল্পনার বিভিন্ন দিকও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, সরকারের লক্ষ্য হচ্ছে চিকিৎসাসেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া। এজন্য ভবিষ্যতে পরীক্ষামূলকভাবে এমন একটি ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে, যেখানে স্বাস্থ্যকর্মীরা সরাসরি মানুষের বাড়িতে গিয়ে প্রাথমিক চিকিৎসাসেবা প্রদান করবেন।
তার মতে, প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ নির্ণয় ও প্রয়োজনীয় সেবা নিশ্চিত করা গেলে অপ্রয়োজনীয়ভাবে হাসপাতালে রোগীর চাপ কমবে। শুধু গুরুতর রোগীদেরই হাসপাতালে পাঠানো হবে, ফলে চিকিৎসাব্যবস্থা আরও কার্যকর হবে।
মন্ত্রী আরও জানান, স্বাস্থ্যখাতে বড় ধরনের অবকাঠামোগত উন্নয়ন পরিকল্পনাও হাতে নেওয়া হয়েছে। চীনের সহযোগিতায় তিন হাজার শয্যার দুটি বিশেষায়িত হাসপাতাল নির্মাণের উদ্যোগ চলছে। এসব হাসপাতালে নারী ও শিশুদের জন্য বিশেষ চিকিৎসা সুবিধা রাখা হবে।
তিনি বলেন, আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থার সঙ্গে জরুরি সেবাকে আরও গতিশীল করতে চারটি হেলিকপ্টার সংযোজনের পরিকল্পনা রয়েছে, যাতে সংকটাপন্ন রোগীদের দ্রুত চিকিৎসাকেন্দ্রে নেওয়া সম্ভব হয়। পাশাপাশি আগামী পাঁচ মাসের মধ্যে দেশের বিভিন্ন এলাকায় আরও পাঁচটি শিশু হাসপাতাল উদ্বোধনের পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।
বক্তব্যের এক পর্যায়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী দুর্নীতির বিরুদ্ধেও কঠোর অবস্থানের কথা তুলে ধরেন। তিনি দাবি করেন, বর্তমান সরকার প্রশাসনিক সেবায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে কাজ করছে এবং সরকারি সুবিধা পেতে মানুষকে আগের মতো ঘুষ দিতে হচ্ছে না।
সব মিলিয়ে মনোহরদীর এই অনুষ্ঠানটি শুধু সামাজিক সহায়তা বিতরণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং স্বাস্থ্যখাতের বর্তমান চ্যালেঞ্জ, হাসপাতাল ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহিতা, দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান এবং ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্যনীতি নিয়ে সরকারের পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ বার্তাও উঠে এসেছে। বিশেষ করে আদ্-দ্বীন হাসপাতাল নিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর মন্তব্য ইতোমধ্যেই নতুন রাজনৈতিক ও সামাজিক আলোচনার জন্ম দিয়েছে, যা আগামী দিনগুলোতে আরও বিস্তৃত বিতর্কের বিষয় হয়ে উঠতে পারে।

