ঢাকার মানুষ প্রতিদিন যে সমস্যাগুলোর মুখোমুখি হন, তার মধ্যে অন্যতম হলো যানজট। কর্মস্থলে পৌঁছাতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সড়কে আটকে থাকা, জরুরি কাজে দেরি হওয়া কিংবা গণপরিবহনে ভোগান্তি—এসব যেন রাজধানীবাসীর দৈনন্দিন বাস্তবতা। বছরের পর বছর ধরে নানা উদ্যোগ নেওয়া হলেও কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসেনি। এবার সেই পুরোনো সমস্যার সমাধানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রযুক্তির দিকে ঝুঁকছে সরকার।
রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা চালুর পরিকল্পনা নিয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশ। প্রথম ধাপে ৭৬টি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ট্রাফিক সিগন্যাল ও নজরদারি ক্যামেরা স্থাপনের পরিকল্পনা উপস্থাপন করা হয়েছে। পরবর্তীতে এ ব্যবস্থার আওতা আরও বাড়িয়ে প্রায় ১২০টি মোড়ে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।
গত সোমবার (১৫ জুন) সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত রাজধানীর যানজট নিরসন ও ট্রাফিক ব্যবস্থার আধুনিকায়নবিষয়ক এক সভায় এই পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়। সভায় সরকারের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তারা, ঢাকা মহানগর পুলিশ এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর প্রতিনিধিরা অংশ নেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনও বাস্তবায়ন কার্যক্রমে অংশ নেবে।
এই উদ্যোগের বিশেষ দিক হলো, এর জন্য আলাদা কোনো বড় তহবিল বা নতুন বাজেটের প্রয়োজন হবে না। পুলিশের নিজস্ব তহবিল থেকেই ব্যয় মেটানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে। ফলে অর্থায়নের জটিলতায় প্রকল্প আটকে যাওয়ার আশঙ্কাও তুলনামূলক কম।
আধুনিক এই ব্যবস্থার মূল শক্তি হবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। চলতি বছরের ৭ মে থেকে পরীক্ষামূলকভাবে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে এই প্রযুক্তি ব্যবহার শুরু করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশ। বিশেষ সফটওয়্যারসংবলিত ক্যামেরাগুলো সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮ লঙ্ঘনের ঘটনা স্বয়ংক্রিয়ভাবে শনাক্ত করতে সক্ষম। অর্থাৎ ট্রাফিক আইন ভঙ্গ, সিগন্যাল অমান্য করা বা অন্যান্য অনিয়ম ক্যামেরার নজর এড়ানো কঠিন হবে।
এর আগে রাজধানীর জাহাঙ্গীর গেট, প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের সামনে, বিজয় সরণি, ফার্মগেট, কারওয়ান বাজার, বাংলামোটর এবং হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের সামনের মোড়ে পরীক্ষামূলকভাবে আধুনিক সিগন্যাল ব্যবস্থা চালু করা হয়েছিল। এসব সিগন্যাল দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি করেছে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়।
নতুন ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা হলো, এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরিচালিত হলেও প্রয়োজন হলে ট্রাফিক পুলিশ ম্যানুয়াল নিয়ন্ত্রণও করতে পারবে। ফলে কোনো বিশেষ পরিস্থিতি, দুর্ঘটনা বা ভিআইপি চলাচলের সময় দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হবে।
তবে প্রশ্ন হলো, এবার কি সত্যিই সফল হবে এই উদ্যোগ?
কারণ ঢাকার ট্রাফিক সিগন্যাল ব্যবস্থার অতীত খুব একটা আশাব্যঞ্জক নয়। রাজধানীতে প্রথম ট্রাফিক সিগন্যাল বসানো হয়েছিল ১৯৬০-এর দশকে। কিন্তু ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় সেগুলো অকেজো হয়ে যায়।
পরবর্তীতে ১৯৯৯ থেকে ২০০৫ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাংকের ঋণ সহায়তায় ৬৮টি স্থানে ট্রাফিক সিগন্যাল স্থাপন করা হলেও সেগুলো কার্যকরভাবে চালানো সম্ভব হয়নি। ২০০৯ সালের মধ্যে অধিকাংশই অচল হয়ে পড়ে।
এরপর ২০০৯ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে আরও ৯১টি ইন্টারসেকশনে সিগন্যাল ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়। কিন্তু সেগুলোরও বড় অংশ প্রত্যাশিত ফল দিতে পারেনি। এমনকি ২০১৪ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে জাপানি ঋণ সহায়তায় চারটি ইন্টারসেকশনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন সিগন্যাল বসানো হয়েছিল, কিন্তু সেগুলোও দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর রাখা যায়নি।
এই ইতিহাসের কারণে নতুন প্রকল্প নিয়ে যেমন আশাবাদ রয়েছে, তেমনি কিছু সংশয়ও আছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু প্রযুক্তি বসালেই সমস্যার সমাধান হবে না। সিগন্যাল ব্যবস্থার সঙ্গে ট্রাফিক পুলিশের কার্যকর সমন্বয়, চালকদের আইন মেনে চলার মানসিকতা, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।
তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—বিশ্বের বড় বড় শহরের মতো ঢাকাও এখন প্রযুক্তিনির্ভর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার দিকে এগোচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যদি সঠিকভাবে ব্যবহার করা যায়, তাহলে যানজট নিয়ন্ত্রণ, সড়ক নিরাপত্তা বৃদ্ধি এবং ট্রাফিক আইন প্রয়োগ—সব ক্ষেত্রেই উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনা সম্ভব।
এখন দেখার বিষয়, অতীতের ব্যর্থতার ইতিহাস পেছনে ফেলে এই নতুন উদ্যোগ রাজধানীর সড়ক ব্যবস্থায় সত্যিই কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে কি না। কারণ ঢাকাবাসীর প্রত্যাশা শুধু নতুন প্রকল্প নয়, বাস্তব ফলাফল।

