থ্যালাসেমিয়া, ক্যানসার ও কিডনিসহ বিভিন্ন জটিল রোগে আক্রান্ত মানুষের জন্য এক ব্যাগ রক্ত শুধু চিকিৎসাসামগ্রী নয়, অনেক ক্ষেত্রে সেটিই জীবন বাঁচিয়ে রাখার একমাত্র অবলম্বন। বিশ্ব রক্তদাতা দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে এমনই আবেগঘন কথা বলেছেন থ্যালাসেমিয়া রোগী রিপা তাসনিম।
রাজধানীর মালিবাগে বাংলাদেশ থ্যালাসেমিয়া ফাউন্ডেশন হাসপাতালে আয়োজিত আলোচনা সভায় তিনি বলেন, রক্ত কৃত্রিমভাবে তৈরি করা সম্ভব নয়। তাই একজন স্বেচ্ছাসেবী রক্তদাতার দেওয়া এক ব্যাগ রক্ত রোগীদের কাছে নতুন জীবন, নতুন আশা এবং সুস্থভাবে বেঁচে থাকার শক্তি এনে দেয়।
রিপা তাসনিম বলেন, থ্যালাসেমিয়া রোগীদের নিয়মিত রক্ত গ্রহণ ছাড়া স্বাভাবিক জীবনযাপন প্রায় অসম্ভব। একইভাবে ক্যানসার ও কিডনি রোগীদের চিকিৎসাতেও রক্তের প্রয়োজন হয়। তাই স্বেচ্ছায় রক্তদানকারীদের অবদান হাজারো পরিবারের মুখে হাসি ফিরিয়ে দেয়।
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ থ্যালাসেমিয়া ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মনজুর মোরশেদ বলেন, বর্তমানে ফাউন্ডেশনের রোগীদের জন্য প্রতি ১০০ জনে ৩২ জন নিয়মিত রক্তদাতা পাওয়া যাচ্ছে। আগামী এক বছরের মধ্যে এই সংখ্যা ৫০ জনে উন্নীত করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে প্রতিষ্ঠানটি। তবে লক্ষ্য অর্জনে সচেতনতা বৃদ্ধি ও স্বেচ্ছাসেবী রক্তদাতার সংখ্যা বাড়ানো জরুরি।
রক্তপরিসঞ্চালন বিশেষজ্ঞ মুরাদ সুলতান বলেন, স্বেচ্ছায় রক্তদান মানবতার অন্যতম বড় সেবা। তিনি দেশে শতভাগ স্বেচ্ছাসেবী রক্তদান ব্যবস্থা চালুর জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, একটি দেশের মোট জনসংখ্যার অন্তত ১ থেকে ২ শতাংশ মানুষ নিয়মিত রক্তদান করলে জাতীয় চাহিদা পূরণ করা সম্ভব।
অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন রক্তপরিসঞ্চালন বিশেষজ্ঞ রাজিয়া সুলতানা। তিনি বলেন, নিয়মিত রক্তদাতাদের সুস্থ থাকতে আয়রনসমৃদ্ধ খাবার খাওয়া এবং পর্যাপ্ত পানি পান করা প্রয়োজন। পাশাপাশি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা মেনে নির্ধারিত সময় পরপর রক্তদান এবং রক্ত দেওয়ার পর অন্তত ২৪ ঘণ্টা ভারী কাজ এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেন তিনি।
আলোচনায় বক্তারা বলেন, থ্যালাসেমিয়া একটি বংশগত রক্তস্বল্পতাজনিত রোগ। দেশে প্রতিবছর প্রায় ৮ থেকে ১১ হাজার শিশু এই রোগ নিয়ে জন্ম নেয়। প্রতি নয়জন মানুষের মধ্যে একজন থ্যালাসেমিয়ার বাহক। তাই বিয়ের আগে ‘হিমোগ্লোবিন ইলেকট্রোফোরেসিস’ পরীক্ষা করে বাহক শনাক্ত করা গেলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে এই রোগের ঝুঁকি থেকে রক্ষা করা সম্ভব।
অনুষ্ঠান শেষে থ্যালাসেমিয়া রোগীদের কল্যাণে সর্বাধিকবার রক্তদানকারী ব্যক্তি, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয় এবং রক্তদাতা সংগঠনকে সম্মাননা স্মারক ও সনদ প্রদান করা হয়। দিবসটি উপলক্ষে দিনব্যাপী স্বেচ্ছায় রক্তদান কর্মসূচিও অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে তরুণ রক্তদাতাদের পাশাপাশি ফাউন্ডেশনের কর্মীরাও অংশ নেন।
বক্তারা বলেন, একটি ব্যাগ রক্ত হয়তো একজন দাতার কাছে সামান্য বিষয়, কিন্তু একজন রোগীর কাছে সেটিই হতে পারে নতুন জীবনের সুযোগ। তাই নিয়মিত স্বেচ্ছায় রক্তদানে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তারা।

