ঢাকায় বর্ষা মানেই জলাবদ্ধতার পুরোনো আতঙ্ক। বছর ঘুরে বর্ষা এলেই রাজধানীর বিভিন্ন সড়ক, অলিগলি ও গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক এলাকাগুলো পানিতে তলিয়ে যায়। একই সঙ্গে শুরু হয় জলাবদ্ধতা নিরসনের নানা উদ্যোগ, খাল-ড্রেন পরিষ্কার এবং খোঁড়াখুঁড়ির কাজ। কিন্তু বছরের পর বছর এসব কার্যক্রম চললেও স্থায়ী সমাধান মিলছে না। ফলে প্রতি বর্ষায় একই দুর্ভোগের মুখোমুখি হতে হচ্ছে নগরবাসীকে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এবারও জলাবদ্ধতাপ্রবণ ২৯টি গুরুত্বপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করেছে। এসব স্থানে পানি জমার সমস্যা কমাতে বিভিন্ন ধরনের অবকাঠামোগত ও রক্ষণাবেক্ষণমূলক কাজের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। তবে নাগরিকদের প্রশ্ন, প্রতিবছর একই ধরনের উদ্যোগ নেওয়ার পরও কেন জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি মিলছে না।
নগর পরিকল্পনাবিদ ও সংশ্লিষ্টদের মতে, সমস্যার মূল কারণ শুধু ড্রেন পরিষ্কার না হওয়া নয়। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে অল্প সময়ে অতিবৃষ্টি, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, খাল ও জলাধার দখল, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং সীমিত পানি নিষ্কাশন অবকাঠামো মিলেই ঢাকার জলাবদ্ধতা পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আওতায় প্রায় ১০৯ বর্গকিলোমিটার এলাকায় বিপুল জনগোষ্ঠীর বসবাস। অথচ পুরো এলাকার বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের জন্য কার্যকর আউটলেট রয়েছে মাত্র চারটি। ভারী বর্ষণের সময় বিপুল পরিমাণ পানি অল্প সময়ের মধ্যে এসব সীমিত পথে সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হয় না। ফলে বিভিন্ন এলাকায় দ্রুত পানি জমে যায় এবং দীর্ঘ সময় ধরে তা স্থায়ী হয়।
বৃষ্টিপাতের দীর্ঘমেয়াদি তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ঢাকায় মোট বার্ষিক বৃষ্টিপাতের প্রবণতা খুব বেশি না বাড়লেও স্বল্প সময়ে অতিবৃষ্টির ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। কয়েক দশক আগের তুলনায় এখন অল্প সময়ের মধ্যে অনেক বেশি বৃষ্টি হচ্ছে। ফলে পুরোনো ড্রেনেজ ব্যবস্থা বাড়তি চাপ সামলাতে পারছে না।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নগরের স্বাভাবিক জলপ্রবাহের পথ সংকুচিত হয়ে যাওয়াও বড় সমস্যা। একসময় যে খালগুলো বৃষ্টির পানি দ্রুত নদীতে পৌঁছে দিত, তার অনেকগুলো এখন দখল, ভরাট কিংবা দূষণের শিকার। কোথাও কোথাও খালের প্রস্থ কমে গেছে, আবার কোথাও বর্জ্যের স্তূপ পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত করছে।
জলাবদ্ধতার ঝুঁকিতে থাকা এলাকাগুলোর মধ্যে ধানমন্ডি, গ্রিন রোড, নিউমার্কেট, ইস্কাটন, মালিবাগ, খিলগাঁও, কমলাপুর, মতিঝিল, পল্টন, ফকিরাপুল, শান্তিবাগ, সায়েদাবাদ, জুরাইনসহ বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক ও আবাসিক এলাকা রয়েছে। ভারী বৃষ্টির সময় এসব এলাকায় সড়কে পানি জমে যানবাহন চলাচল ব্যাহত হয় এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন দুর্বিষহ হয়ে ওঠে।
ব্যবসায়ীরাও জলাবদ্ধতার কারণে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়ছেন। বিশেষ করে নিউমার্কেট ও আশপাশের এলাকায় পানি ঢুকে দোকানের মালামাল নষ্ট হওয়ার ঘটনা প্রায় প্রতি বছরই ঘটছে। এতে ব্যবসায়ীদের আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি ক্রেতাদের উপস্থিতিও কমে যায়।
সমস্যা সমাধানে দক্ষিণ সিটি করপোরেশন স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। স্বল্পমেয়াদে ড্রেন, খাল ও বক্স-কালভার্ট থেকে পলি ও বর্জ্য অপসারণ, জরুরি ভিত্তিতে পাম্প ব্যবহার এবং ওয়ার্ডভিত্তিক দ্রুত প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ড্রেনেজ ব্যবস্থার জন্য একটি সমন্বিত মাস্টারপ্ল্যান তৈরির কাজও চলছে।
মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনায় রয়েছে খাল পুনরুদ্ধার, নতুন আউটলেট নির্মাণ, পাম্প স্টেশনের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং পানি প্রবাহের পথ উন্নয়ন। এ লক্ষ্যে কয়েকটি খাল পুনঃখনন ও সংস্কার প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। পাশাপাশি নদীতে সরাসরি পানি নিষ্কাশনের জন্য নতুন সংযোগপথ তৈরির পরিকল্পনাও রয়েছে।
দীর্ঘমেয়াদে রাজধানীর দক্ষিণ অংশে আরও কয়েকটি নতুন আউটলেট নির্মাণের প্রস্তাব করা হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, বিভিন্ন এলাকা থেকে বৃষ্টির পানি দ্রুত বুড়িগঙ্গা ও আশপাশের জলপথে সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে। তবে এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রয়োজন হবে কয়েক হাজার কোটি টাকা এবং দীর্ঘ সময়।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, শুধু ড্রেন পরিষ্কার বা অস্থায়ী পাম্প বসিয়ে জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। জলবায়ু পরিবর্তনের বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে সমন্বিত ড্রেনেজ নেটওয়ার্ক, খাল পুনরুদ্ধার, নতুন আউটলেট নির্মাণ এবং নগর ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার প্রয়োজন।
বাস্তবতা হলো, বর্ষা এলেই জলাবদ্ধতা নিরসনের তৎপরতা বাড়ে, কিন্তু শুষ্ক মৌসুমে দৃশ্যমান অগ্রগতি তুলনামূলক কম। ফলে বছর শেষে আবারও একই সমস্যার পুনরাবৃত্তি ঘটে। নগরবাসীর প্রত্যাশা, সাময়িক উদ্যোগের পরিবর্তে কার্যকর ও টেকসই পরিকল্পনার বাস্তবায়নের মাধ্যমে রাজধানীকে জলাবদ্ধতার চক্র থেকে স্থায়ীভাবে মুক্ত করা হবে।

