বাংলাদেশে শিশুদের ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে বলে নতুন এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফ। সংস্থাটির ২০২৬ সালের ‘চিলড্রেনস ক্লাইমেট রিস্ক রিপোর্ট’ অনুযায়ী, দেশের প্রায় সব শিশু অন্তত একটি জলবায়ু ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে এবং প্রায় ৯০ শতাংশ শিশু একাধিক জলবায়ু বিপদের সম্মুখীন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রায় ৫ কোটি ৯০ লাখ শিশু অন্তত একটি জলবায়ুজনিত ঝুঁকির আওতায় রয়েছে, যা মোট শিশুর শতভাগের কাছাকাছি। এসব ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে নদীভাঙনজনিত বন্যা, খরা, ঘূর্ণিঝড়, তীব্র তাপপ্রবাহসহ নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগ।
ইউনিসেফের তথ্য বলছে, প্রায় ৫ কোটি ৩০ লাখ শিশু, অর্থাৎ দেশের মোট শিশুর প্রায় ৮৯ দশমিক ৫ শতাংশ, একসঙ্গে অন্তত তিন ধরনের জলবায়ু ঝুঁকির মধ্যে বাস করছে। একই সময়ে একাধিক দুর্যোগের চাপ শিশুদের স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ বিকাশে মারাত্মক প্রভাব ফেলছে।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, নদীভাঙন ও বন্যা, খরা এবং ঘূর্ণিঝড়—এই তিনটি প্রধান ঝুঁকির সম্মিলিত প্রভাবে দেশের ২ কোটি ৪০ লাখেরও বেশি শিশু সরাসরি উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে।
সবচেয়ে বিস্তৃত ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে খরাকে। প্রায় ৫ কোটি ৭৯ লাখ শিশু এই ঝুঁকির আওতায় রয়েছে, যা মোট শিশুর প্রায় ৯৮ শতাংশের বেশি। এর মধ্যে কৃষিভিত্তিক খরার ঝুঁকিতে রয়েছে ৫ কোটি ৪০ লাখের বেশি শিশু এবং আবহাওয়াগত খরার ঝুঁকিতে রয়েছে ৫ কোটি ৩০ লাখের মতো শিশু।
ঘূর্ণিঝড়জনিত ঝুঁকিও ব্যাপকভাবে প্রভাব ফেলছে। প্রায় ৫ কোটি ৪০ লাখ শিশু ঘূর্ণিঝড়ের ঝুঁকিতে রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একইভাবে নদীভাঙন ও বন্যার কারণে প্রায় ৩ কোটি ২০ লাখ শিশু সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকিতে আছে।
ইউনিসেফ বলছে, বাংলাদেশ, ভারত, নাইজেরিয়া ও পাকিস্তানের মতো বড় জনসংখ্যার দেশগুলোতে শতাংশের হিসাবে ঝুঁকি মাঝারি মনে হলেও বাস্তবে আক্রান্ত শিশুদের সংখ্যা অত্যন্ত বেশি। তাই এসব দেশকে জলবায়ু ঝুঁকির ‘হাই-ইমপ্যাক্ট জোন’ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বিশ্বজুড়ে নদীভাঙনজনিত বন্যার ঝুঁকির বড় অংশই মাত্র কয়েকটি দেশে কেন্দ্রীভূত, যার মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। একইভাবে তীব্র তাপপ্রবাহের ঝুঁকিতেও দেশের বড় একটি অংশ শিশু রয়েছে।
ঝুঁকি সূচকে বাংলাদেশের অবস্থানও উদ্বেগজনক। ইউনিসেফের জলবায়ু ঝুঁকি সূচকে বাংলাদেশের স্কোর ১০-এর মধ্যে ৯ দশমিক ৩৮, যা বিশ্বের মধ্যে চতুর্থ সর্বোচ্চ। এই তালিকায় বাংলাদেশের ওপরে রয়েছে মিয়ানমার, পাকিস্তান ও ভিয়েতনাম।
বিশ্বব্যাপী পরিস্থিতি বিশ্লেষণে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রায় অর্ধেক শিশু অন্তত তিন ধরনের জলবায়ু ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে এবং কোটি কোটি শিশু একাধিক দুর্যোগের সম্মিলিত প্রভাবে বিপন্ন অবস্থায় আছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের এই তীব্র প্রভাব শুধু পরিবেশগত সমস্যা নয়, বরং এটি শিশুদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও মানসিক বিকাশের ওপর দীর্ঘমেয়াদি সংকট তৈরি করছে। ফলে ঝুঁকি মোকাবিলায় টেকসই নীতি, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা এবং শিশু-কেন্দ্রিক জলবায়ু অভিযোজন কৌশল গ্রহণ এখন জরুরি হয়ে উঠেছে।

