জাতীয় বাজেটে শ্রমজীবী মানুষের স্বার্থ কতটা প্রতিফলিত হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন শ্রমিক নেতারা। তাদের অভিযোগ, অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি পোশাকশ্রমিকদের অবদান স্বীকার করা হলেও বাজেট ও নীতিনির্ধারণে তাদের প্রয়োজনীয় গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না। শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়ন, খাদ্য নিরাপত্তা, আবাসন ও সামাজিক সুরক্ষার মতো বিষয়গুলো এখনও কাঙ্ক্ষিত গুরুত্ব পায়নি বলে মনে করেন তারা।
রাজধানীতে বাজেট পর্যালোচনা বিষয়ক এক সংলাপে বাংলাদেশ পোশাক শিল্প শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক তাসলিমা আখতার শ্রমিকস্বার্থ উপেক্ষার বিষয়টি নিয়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, রাজপথে থাকাকালে অনেকেই শ্রমিকের অধিকার নিয়ে সোচ্চার থাকেন, কিন্তু রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব বা মন্ত্রিত্ব পাওয়ার পর সেই অবস্থান আর দৃশ্যমান থাকে না। ফলে শ্রমিকদের প্রত্যাশা ও বাস্তবতার মধ্যে বড় ধরনের ব্যবধান তৈরি হয়।
তার মতে, দেশের রপ্তানি আয় ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে পোশাকশ্রমিকদের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও বাজেটে তাদের জন্য বিশেষ কোনো সুরক্ষা বা কল্যাণমূলক কর্মসূচির স্পষ্ট প্রতিফলন দেখা যায় না। বিশেষ করে করোনাকালে ঝুঁকি নিয়ে উৎপাদন সচল রাখা শ্রমিকদের অবদান এখনও যথাযথ স্বীকৃতি পায়নি বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
শ্রমিকনেত্রীর অভিযোগ, নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য বিভিন্ন সামাজিক সহায়তা কর্মসূচি থাকলেও শিল্পশ্রমিকদের জন্য আলাদা ও লক্ষ্যভিত্তিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়নি। তিনি প্রশ্ন তোলেন, শ্রমিকদের জন্য বিশেষ পরিচয়ভিত্তিক সহায়তা বা সুবিধা চালুর বিষয়ে সরকার কেন কার্যকর উদ্যোগ নিচ্ছে না।
তিনি আরও বলেন, বাজারে নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় শ্রমিকদের জীবনযাত্রার ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এই বাস্তবতায় স্বল্পমূল্যে খাদ্য সহায়তা বা ওএমএস কর্মসূচিতে শ্রমিকদের অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানান তিনি। তার মতে, সীমিত আয়ের শ্রমিক পরিবারগুলোর জন্য খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন জরুরি প্রয়োজন।
পোশাক খাতে কর্মরত নারী শ্রমিকদের ভবিষ্যৎ নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তাসলিমা আখতার। তিনি বলেন, প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন ও স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার প্রসারের ফলে অনেক শ্রমিক কর্মসংস্থান হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছেন। বিশেষ করে নারী শ্রমিকদের দক্ষতা উন্নয়ন, পুনঃপ্রশিক্ষণ এবং বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরিতে বাজেটে বিশেষ বরাদ্দ প্রয়োজন ছিল।
আবাসন সংকটের বিষয়টিও তুলে ধরেন তিনি। দীর্ঘদিন ধরে শিল্পাঞ্চলগুলোতে শ্রমিকদের জন্য ডরমিটরি বা নিরাপদ আবাসনের দাবি জানানো হলেও এ বিষয়ে দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি বলে অভিযোগ করেন। তার মতে, কর্মক্ষেত্রের পাশাপাশি বাসস্থান ও সামাজিক নিরাপত্তাও শ্রমিক কল্যাণের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
একই সঙ্গে কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের জন্য আন্তর্জাতিক মানের জাতীয় দুর্ঘটনা বীমা বা সুরক্ষা কাঠামো প্রণয়নের দাবি জানান তিনি। শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করতে একটি কার্যকর জাতীয় নীতিমালা প্রণয়ন সময়ের দাবি বলেও উল্লেখ করেন।
শ্রমিক নেতাদের মতে, বর্তমান শিল্প কাঠামোয় উৎপাদন ও মুনাফার বিষয়টি যতটা গুরুত্ব পায়, শ্রমিক কল্যাণের প্রশ্নটি ততটা অগ্রাধিকার পায় না। ফলে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির পেছনে যাদের শ্রম সবচেয়ে বেশি, তাদের জীবনমানের উন্নয়ন কাঙ্ক্ষিত গতিতে এগোয় না।
অন্যদিকে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় একটি দুর্বল অর্থনৈতিক কাঠামো থেকে উত্তরণের চেষ্টা চলছে। নীতিনির্ধারকদের দাবি, নতুন বাজেটে অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে এবং শ্রমিক, কৃষক ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর স্বার্থ বিবেচনায় রাখা হয়েছে।
সরকারের প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, শ্রম আইন অনুসারে মজুরি কাঠামো ও শ্রমিক কল্যাণের বিষয়গুলো পর্যালোচনায় রয়েছে। পাশাপাশি সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আবাসন ও কর্মসংস্থানকে অগ্রাধিকার দিয়ে ধাপে ধাপে সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে শ্রমিক সংগঠনগুলোর দাবি, অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি ও রপ্তানি সাফল্যের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা শ্রমিকদের জন্য আরও দৃশ্যমান ও বাস্তবমুখী পদক্ষেপ প্রয়োজন। তাদের মতে, ন্যায্য মজুরি, খাদ্য সহায়তা, নিরাপদ আবাসন, সামাজিক সুরক্ষা এবং কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেলে শুধু শ্রমিকদের জীবনমানই উন্নত হবে না, দেশের শিল্প খাতও আরও টেকসই ও প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠবে।

