বাংলাদেশে প্রবীণ পিতা-মাতার আর্থিক ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এক যুগেরও বেশি সময় আগে ‘পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন, ২০১৩’ প্রণয়ন করা হলেও এখনও এ আইন সম্পর্কে সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা সীমিত। ফলে অনেক প্রবীণ নাগরিক নিজেদের আইনগত অধিকার সম্পর্কে না জেনে অবহেলা, অনাদর ও অনিশ্চয়তার মধ্যে জীবন কাটাতে বাধ্য হচ্ছেন বলে মনে করছেন আইনজ্ঞ ও মানবাধিকারকর্মীরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু আইন প্রণয়ন করাই যথেষ্ট নয়; আইন সম্পর্কে মানুষের জানাশোনা ও কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণে দেশব্যাপী ব্যাপক প্রচারণা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সচেতনতা কার্যক্রমের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
বর্তমান আইনে বলা হয়েছে, আর্থিকভাবে সক্ষম প্রত্যেক সন্তান তার পিতা-মাতার ভরণপোষণের দায়িত্ব পালন করতে বাধ্য। ভরণপোষণের আওতায় খাদ্য, বস্ত্র, চিকিৎসা, বাসস্থান এবং প্রয়োজনীয় সেবাযত্ন অন্তর্ভুক্ত। একাধিক সন্তান থাকলে সবাইকে যৌথভাবে এই দায়িত্ব বহন করতে হবে।
আইন অনুযায়ী, পিতা-মাতা সন্তানদের সঙ্গে একসঙ্গে বসবাস না করলেও তাদের প্রয়োজনীয় খরচ ও দেখভালের ব্যবস্থা করতে হবে। কোনো সন্তান দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে বা ইচ্ছাকৃতভাবে এড়িয়ে গেলে সংশ্লিষ্ট আদালতে অভিযোগ দায়েরের সুযোগ রয়েছে।
এ আইনের লঙ্ঘনকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। আদালতে দোষী প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ এক লাখ টাকা জরিমানা এবং জরিমানা পরিশোধ না করলে তিন মাস পর্যন্ত কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।
তবে আইন বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ মনে করেন, বর্তমান শাস্তির পরিমাণ বাস্তবতার তুলনায় কম। তাদের মতে, কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা না থাকলে অনেকেই আইনটিকে গুরুত্বের সঙ্গে নেবেন না এবং এর প্রতিরোধমূলক প্রভাবও সীমিত থাকবে।
প্রবীণদের একটি বড় অংশ এখনও জানেন না যে সন্তানদের ওপর তাদের ভরণপোষণের আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে। ষাটোর্ধ্ব এক গৃহিণী জানান, নিয়মিত সংবাদপত্র ও টেলিভিশনের খবর অনুসরণ করলেও এমন একটি আইন রয়েছে— সে বিষয়ে আগে তার কোনো ধারণা ছিল না। তার মতে, এ বিষয়ে প্রচার বাড়ানো গেলে মানুষ আরও সচেতন হবে।
আইনবিদদের ভাষ্য, পিতা-মাতার প্রতি সন্তানের দায়িত্ব কেবল নৈতিক বা ধর্মীয় বিষয় নয়, এটি আইনের মাধ্যমেও সুরক্ষিত একটি অধিকার। পারিবারিক বন্ধনের দুর্বলতা, সামাজিক মূল্যবোধের পরিবর্তন এবং আইনি অজ্ঞতার কারণে অনেক প্রবীণ ব্যক্তি তাদের প্রাপ্য সহায়তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মো. মোতাহার হোসেন সাজু বলেন, আইনটিতে শুধু আর্থিক ভরণপোষণের বিষয় নয়, পিতা-মাতার পাশে থাকা এবং তাদের প্রয়োজনীয় সঙ্গ দেওয়ার বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। তার মতে, সন্তানরা শুধু অর্থ দিয়ে দায়িত্ব শেষ করতে পারে না; প্রবীণ পিতা-মাতার মানসিক সহায়তা ও সঙ্গ পাওয়ার অধিকারও রয়েছে।
মানবাধিকারকর্মী ও আইনজীবী মোহাম্মদ আদনান ইয়াজদানীর মতে, দেশের অধিকাংশ মানুষ এখনও মৌলিক আইন সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা রাখেন না। কারণ, নাগরিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ আইনি বিষয়গুলো সম্পর্কে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শিক্ষাদানের সুযোগ খুবই সীমিত। ফলে অনেক মানুষ নিজেদের অধিকার ও দায়িত্ব সম্পর্কে অজ্ঞ থেকে যান।
তিনি বলেন, বিবাহ, উত্তরাধিকার, ভোক্তা অধিকার, সাইবার অপরাধ কিংবা পিতা-মাতার ভরণপোষণের মতো আইন সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। তাই এসব বিষয়ে প্রাথমিক পর্যায় থেকেই শিক্ষার ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।
সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, আইনটির কার্যকারিতা বাড়াতে জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে সমন্বিত প্রচারণা চালানো দরকার। টেলিভিশন, রেডিও, সংবাদপত্র ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সচেতনতামূলক প্রচার জোরদারের পাশাপাশি ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশন পর্যায়ে বিশেষ কর্মসূচি নেওয়া যেতে পারে।
এ ছাড়া মসজিদ, মন্দির ও অন্যান্য ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে আলোচনা, স্থানীয় পর্যায়ে সভা-সেমিনার আয়োজন, বিলবোর্ড স্থাপন এবং মাইকিংয়ের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছে বার্তা পৌঁছে দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। পাশাপাশি আইনটির বাস্তবায়ন ও কার্যকারিতা পর্যবেক্ষণে সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর আরও সক্রিয় ভূমিকা প্রয়োজন বলেও মত দিয়েছেন তারা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের পাঠ্যক্রমে মৌলিক আইন শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করা গেলে নাগরিকদের মধ্যে আইনি সচেতনতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। কারণ, অধিকার ও দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন নাগরিকই একটি মানবিক, দায়িত্বশীল এবং আইনসম্মত সমাজ গঠনের প্রধান ভিত্তি।
প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। তাই তাদের সম্মান, নিরাপত্তা এবং ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করতে ‘পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন’কে কেবল কাগজে সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তবে কার্যকর করার দাবি ক্রমেই জোরালো হচ্ছে।

