ব্যবসা শুরু করতে দীর্ঘসূত্রতা, অনুমোদনের জটিলতা এবং দপ্তরভিত্তিক আমলাতান্ত্রিক বাধা কমাতে বড় ধরনের সংস্কারের পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের লক্ষ্যে ব্যবসা শুরুর সব ধরনের অনুমোদন ও লাইসেন্স সেবা একটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের আওতায় আনার প্রস্তাব করা হয়েছে। সরকারি একটি সংস্থার তত্ত্বাবধানে পরিচালিত এই ব্যবস্থাকে কার্যত একক প্রবেশদ্বার হিসেবে গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে।
প্রস্তাব অনুযায়ী, বিভিন্ন অনুমোদন ও লাইসেন্স সেবার জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা বা সার্ভিস লেভেল অ্যাগ্রিমেন্ট (এসএলএ) নির্ধারণ করা হবে। কোনো সংস্থা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মতামত, অনাপত্তি, নাদাবি বা ছাড়পত্র না দিলে সেটিকে সম্মতি হিসেবে বিবেচনা করা হবে। এরপর স্বয়ংক্রিয় প্রক্রিয়ায় আবেদন নিষ্পত্তি করে ব্যবসা শুরুর অনুমোদন দেওয়া হবে।
নতুন ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য আরও একটি সুবিধার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। তারা অনলাইনে প্রাথমিক অনুমোদন নিয়ে দ্রুত কার্যক্রম শুরু করতে পারবেন। পরে ৬ থেকে ১২ মাসের মধ্যে প্রয়োজনীয় চূড়ান্ত লাইসেন্স সংগ্রহের সুযোগ থাকবে। ব্যবসা-বাণিজ্য সহজ করতে সরকার যে ডিরেগুলেশন বা বিনিয়ন্ত্রণকরণ কর্মসূচি হাতে নিয়েছে, এই প্রস্তাবগুলো তারই অংশ। আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাবে বিষয়গুলো বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
জাতীয় সংসদে উপস্থাপিত বাজেট বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, অর্থনীতির বর্তমান ভঙ্গুর পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠতে এ ধরনের সংস্কার প্রয়োজন। তার মতে, ব্যবসা শুরুর প্রক্রিয়া সহজ করার পাশাপাশি আয়কর, ভ্যাট ও শুল্ক ব্যবস্থাতেও একই ধরনের সংস্কার আনা হবে। অর্থমন্ত্রী আশা প্রকাশ করে বলেন, এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হলে আগামী দুই বছরের মধ্যে অর্থনীতি স্থিতিশীলতার পথে এগোবে। তৃতীয় বছর থেকে পুনরুদ্ধারের গতি বাড়বে এবং পরবর্তী দুই বছরে অর্থনীতি সমৃদ্ধির দিকে অগ্রসর হবে।
তবে ব্যবসায়ীদের একাংশ সরকারের ঘোষণাগুলো নিয়ে সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন। তাদের মতে, অতীতেও ব্যবসা সহজ করার নানা উদ্যোগের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, কিন্তু বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত অগ্রগতি দেখা যায়নি। বিশেষ করে রাজস্ব ঘাটতির সময় ব্যবসায়ীদের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি হলে সংস্কার উদ্যোগগুলো অনেক ক্ষেত্রে গুরুত্ব হারায়। তাই তারা ঘোষণার চেয়ে কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন।
গত ১১ জুন জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব উপস্থাপন করেন অর্থমন্ত্রী। এর মধ্যে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। বর্তমানে সংসদে বাজেট নিয়ে আলোচনা চলছে।
বাজেট বক্তব্যের অষ্টম অধ্যায়ে ডিরেগুলেশনকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ব্যবসা ও বিনিয়োগ সহজ করতে সেখানে মোট নয়টি প্রাথমিক প্রস্তাব তুলে ধরা হয়। ব্যবসা শুরুর অনুমোদন ব্যবস্থার পাশাপাশি বিদেশি বিশেষজ্ঞ ও দক্ষ কর্মীদের ওয়ার্ক পারমিট সাত দিনের মধ্যে প্রদানের উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
এ ছাড়া বড় ও কৌশলগত বিদেশি বিনিয়োগ প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর অধীনে সহায়তা কর্মকর্তা বা প্রকল্পভিত্তিক ব্যবস্থাপক নিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে। বিনিয়োগকারীদের আইনি সুরক্ষা জোরদার করতে দ্বিপক্ষীয় বিনিয়োগ চুক্তি ও দ্বৈত কর পরিহার চুক্তির কার্যকর বাস্তবায়নের কথাও বলা হয়েছে।
স্থানীয় পর্যায়ে ব্যবসার অনুমোদন সহজ করতে ট্রেড লাইসেন্স সেবাকে বিনিয়োগ সেবার আওতায় আনার প্রস্তাব রয়েছে। পাশাপাশি নির্বাচিত শিল্পাঞ্চল ও অর্থনৈতিক অঞ্চলে ‘প্লাগ অ্যান্ড প্লে’ সুবিধা চালুর পরিকল্পনা করা হয়েছে, যেখানে গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি, সড়ক সংযোগ এবং প্রাথমিক অনুমোদন আগেই সমন্বিত থাকবে। এ ছাড়া বিভিন্ন দপ্তরের অনুমোদন, যাচাই ও মতামত প্রদানের প্রক্রিয়া সহজ করা এবং অনলাইনে অগ্রগতি পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থাও চালুর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ প্লাস্টিক দ্রব্য প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক অ্যাসোসিয়েশনের পরিচালক এবং এক্সক্লুসিভ ক্যানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ নাসির বলেন, ঘোষিত উদ্যোগগুলো বাস্তবায়িত হলে ব্যবসা পরিচালনা সহজ হবে। তবে প্রশাসনিক সংস্কার ছাড়া এসব পদক্ষেপ কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে তার সংশয় রয়েছে।
শুধু ব্যবসা শুরুর ক্ষেত্রেই নয়, কর ব্যবস্থায়ও সংস্কারের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। করপোরেট কর রিটার্ন অনলাইনে জমা দেওয়ার সুযোগ চালু করা হবে এবং সারা বছর রিটার্ন দাখিলের ব্যবস্থা থাকবে। উৎসে কাটা কর নির্ধারিত করের চেয়ে বেশি হলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থাও চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য দ্বৈত কর পরিহার চুক্তির আওতায় অনলাইনে সনদ প্রদানের ব্যবস্থাও করা হবে।
রপ্তানিমুখী শতভাগ অনুগত শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে প্রতি বছর বন্ড অডিটের বাধ্যবাধকতা তুলে দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। একই সঙ্গে বন্ডেড গুদামে এককালীন কাঁচামাল মজুতের সীমা প্রত্যাহার, জুয়েলারি শিল্পকে বন্ড সুবিধার আওতায় আনা এবং নতুন ১০টি খাতকে ব্যাংক গ্যারান্টির মাধ্যমে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। ভ্যাট ব্যবস্থায়ও ডিজিটাল রূপান্তরের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ই-ভ্যাট ব্যবস্থার মাধ্যমে অনলাইনে ভ্যাট প্রদান বাধ্যতামূলক করার পাশাপাশি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য সহজতর ভ্যাট রিটার্ন ফরম চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
ঢাকা চেম্বারের সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, একক সেবা ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করা, সাত দিনে ওয়ার্ক পারমিট প্রদান, বিদেশি ঋণের সুদের ওপর উৎসে কর কমানো এবং কিছু করসংক্রান্ত জটিলতা দূর করার প্রস্তাব বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়নে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এর সফলতা নির্ভর করবে বাস্তবায়নের ওপর।
অর্থনীতিবিদ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের রিসার্চ ফেলো এম হেলাল আহমেদ জনির মতে, ডিরেগুলেশন কার্যকর করতে হলে সুশাসন, জবাবদিহি, প্রতিযোগিতা কমিশনের কার্যকারিতা এবং আর্থিক খাতের শক্তিশালী তদারকি নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায় অর্থনৈতিক ঝুঁকি বাড়তে পারে এবং বড় ব্যবসায়িক গোষ্ঠীগুলো তুলনামূলক বেশি সুবিধা পেতে পারে, যা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে।
তবে সামগ্রিকভাবে সরকার মনে করছে, অপ্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রণ, দীর্ঘ অনুমোদন প্রক্রিয়া এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমাতে পারলে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগের পরিবেশ আরও উন্নত হবে। এর ফলে নতুন ব্যবসা শুরু করার সময় ও ব্যয় কমবে, শিল্পায়ন ও রপ্তানি সম্প্রসারিত হবে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি বাড়বে।

