রাহাদ সুমন,বরিশাল প্রতিবেদক-
ডেঙ্গুকে শহরকেন্দ্রিক রোগ হিসেবে দেখা হলেও এখন সেই চিত্র দ্রুত বদলে যাচ্ছে। রাজধানী ছাড়িয়ে দেশের বিভিন্ন জেলা ও গ্রামীণ এলাকাতেও ছড়িয়ে পড়ছে রোগটি। চলতি বছরে হাসপাতালে ভর্তি ডেঙ্গু রোগীর প্রায় ৭৮ শতাংশই ঢাকার বাইরের বাসিন্দা। এদিকে, বরিশাল বিভাগে সবচেয়ে বেশি রোগী শনাক্ত হওয়ায় অঞ্চলটি নতুন উদ্বেগের কেন্দ্র হয়ে উঠেছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, মে মাসের তুলনায় জুনে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় তিন গুণ বেড়েছে। একই সঙ্গে বেড়েছে মৃত্যুর সংখ্যাও। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে, এক মাসের ব্যবধানে ডেঙ্গুতে মৃত্যু বেড়েছে প্রায় সাত গুণ। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই প্রবণতা বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকির ইঙ্গিত দিচ্ছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত মঙ্গলবার পর্যন্ত চলতি বছরে দেশে মোট পাঁচ হাজার ৩১৭ ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে চার হাজার ১২৫ জন বা ৭৮ দশমিক ৫ শতাংশ রাজধানীর বাইরে এবং এক হাজার ১৩০ জন রাজধানীতে ভর্তি হয়েছেন। তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, ডেঙ্গু এখন আর শুধু নগরকেন্দ্রিক নয়; এটি ধীরে ধীরে জেলা ও গ্রামীণ এলাকাতেও বিস্তার ঘটিয়েছে।
বরিশাল বিভাগে রোগীর সংখ্যা বেশি
বিভাগভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী, এ বছর সবচেয়ে বেশি এক হাজার ৪৪০ ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছেন বরিশাল বিভাগে। গত বছর বরগুনা অপ্রত্যাশিতভাবে ডেঙ্গুর হটস্পট হয়ে উঠলেও এবার পটুয়াখালী, পিরোজপুর ও ঝালকাঠিতে রোগীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, পটুয়াখালীতে ২৫৪ জন, পিরোজপুরে ৩৫০ জন এবং ঝালকাঠিতে ২৭১ জন রোগী শনাক্ত হয়েছেন। এসব এলাকায় ডেঙ্গুর সংক্রমণ নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বরিশাল বিভাগের পরিচালক ডা. শ্যামল কৃষ্ণ মণ্ডল বলেন, বরিশাল বিভাগে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়লেও পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। জেলার হাসপাতালগুলোতে রোগীদের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে বিশেষ নজরদারি চালানো হচ্ছে। পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসন ও স্বাস্থ্য বিভাগের সমন্বয়ে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে সচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে।
জুনে রোগী ও মৃত্যু বেড়েছে
চলতি বছরের মধ্যে জুন মাসেই সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছে। এখন পর্যন্ত এ মাসে দুই হাজার ১২০ জন আক্রান্ত হয়েছেন। মে মাসে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ৭১৪ জন। অর্থাৎ, এক মাসের ব্যবধানে রোগীর সংখ্যা প্রায় তিন গুণ বেড়েছে। অন্যদিকে, ডেঙ্গুতে মৃত্যুও বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। এ বছর এখন পর্যন্ত মোট ১২ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে শুধু জুন মাসেই মারা গেছেন সাতজন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বুধবারের নিয়মিত বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ডেঙ্গুতে গত ২৪ ঘণ্টায় আরও দুজনের মৃত্যু হয়েছে। তারা দুজনই ময়মনসিংহ বিভাগের সিটি করপোরেশনের বাইরের এলাকার বাসিন্দা। একই সময়ে নতুন করে শনাক্ত হয়েছেন ১৫৭ রোগী। সুস্থ হয়েছেন ১১৯ জন। আর এ পর্যন্ত সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছেন চার হাজার ৯১৯ জন।
কেন বাড়ছে ডেঙ্গুর বিস্তার
বাংলাদেশ মেডিকেল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ডা. সাইফ উল্লাহ মুনশির মতে, ২০২৩ সালের ভয়াবহ ডেঙ্গু পরিস্থিতি রোগটির বিস্তারে বড় ভূমিকা রেখেছে। তাঁর ভাষ্য, ওই সময় ঈদুল আজহার ছুটিতে বিপুলসংখ্যক মানুষ রাজধানী ছেড়ে নিজ নিজ এলাকায় যাওয়ার কারণে সংক্রমণ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত ও অপরিকল্পিত নগরায়ণও ডেঙ্গুর বিস্তারে ভূমিকা রাখছে। বিভিন্ন এলাকায় নির্মাণকাজ, কৃত্রিম পানির পাত্র এবং বৃষ্টির পানি জমে থাকা এডিস মশার বংশবিস্তারের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করছে।
রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক পরিচালক আবু মোহাম্মদ জাকির হোসেন বলেন, জেলার বসতির ধরনে পরিবর্তনের কারণে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।
অন্যদিকে কীটতত্ত্ববিদ তৌহিদ উদ্দিন আহমেদের মতে, বড় শহরের বাইরের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর এডিস নিয়ন্ত্রণের অভিজ্ঞতা ও সক্ষমতা এখনও সীমিত। শুধু শহর নয়, জেলা ও উপজেলা পর্যায়েও সমন্বিত মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম জোরদার করতে হবে। পাশাপাশি জনসচেতনতা, কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং নিয়মিত নজরদারি বাড়ানো জরুরি। এখনই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে ডেঙ্গু আরও বড় জনস্বাস্থ্য সংকটে পরিণত হতে পারে।

