ডাক বিভাগের মাধ্যমে সীমান্তপারের ই-কমার্স কার্যক্রম সম্প্রসারণের লক্ষ্যে গঠিত বিশেষ কমিটি গঠনের মাত্র একদিনের মাথায় স্থগিত করা হয়েছে। সদস্য নির্বাচন, বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্তির পদ্ধতি এবং সম্ভাব্য স্বার্থের সংঘাত নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পর কর্তৃপক্ষ কমিটির কার্যক্রম আপাতত বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বিষয়টি প্রশাসনিক মহল ও ই-কমার্স খাতে ব্যাপক আলোচনা তৈরি করেছে।
ডাক বিভাগ সূত্রে জানা যায়, গত ২৩ জুন আন্তর্জাতিক ডাক সার্ভিস (আইপিএস) শাখা থেকে ১১ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল ডাক বিভাগের মাধ্যমে ক্রস-বর্ডার ই-কমার্স সেবা সম্প্রসারণ, সম্ভাবনা যাচাই, নীতিগত সুপারিশ তৈরি এবং ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন। তবে পরদিন ২৪ জুন নতুন এক অফিস আদেশে ‘কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা ও অনিবার্য কারণ’ উল্লেখ করে কমিটির কার্যক্রম স্থগিত করা হয়।
ডাক বিভাগের পরিচালক (আইপিএস) মোহাম্মদ ওমর ফারুক জানিয়েছেন, প্রাথমিকভাবে সীমিত পরিসরে কয়েকজন অংশীজনের মতামত নেওয়ার উদ্দেশ্যে কমিটি গঠন করা হয়েছিল। পরে দেখা যায়, এই খাতে আরও অনেক প্রতিষ্ঠান ও উদ্যোক্তা সক্রিয়ভাবে কাজ করছে, যাদের মতামতও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সে কারণে বৃহত্তর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে বর্তমান কমিটি স্থগিত রেখে নতুন কাঠামোতে সবার মতামত নিয়ে পুনর্গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
ডাক অধিদপ্তরের নথি অনুযায়ী, কমিটিতে সরকারি কর্মকর্তাদের পাশাপাশি কয়েকজন বেসরকারি উদ্যোক্তা ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। অফিস আদেশে তাদের বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধি হিসেবে উল্লেখ করা হলেও তারা কোন সংগঠনের প্রতিনিধিত্ব করছেন, সে বিষয়ে কোনো স্পষ্ট তথ্য ছিল না। এই অস্পষ্টতাই পরবর্তীতে বিতর্কের অন্যতম কারণ হয়ে ওঠে।
এছাড়া সদস্য নির্বাচনের ক্ষেত্রে কী ধরনের যোগ্যতা বা মানদণ্ড অনুসরণ করা হয়েছে, সে বিষয়েও কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। সংশ্লিষ্ট মহলের প্রশ্ন, নীতিনির্ধারণী বা ব্যবসায়িক কাঠামো প্রণয়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ কমিটিতে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে স্বচ্ছ নির্বাচন প্রক্রিয়া থাকা উচিত ছিল।
কমিটির তালিকা বিশ্লেষণে দেখা যায়, বেসরকারি সদস্যদের কেউ সফটওয়্যার, কেউ ওয়েবসাইট উন্নয়ন, কেউ প্রযুক্তি বা পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু তাদের প্রত্যেকের সরাসরি সীমান্তপারের ই-কমার্স পরিচালনার বাস্তব অভিজ্ঞতা বা দক্ষতার বিষয়টি অফিস আদেশে উল্লেখ করা হয়নি। ফলে এই প্রতিনিধিত্ব কতটা যৌক্তিক, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
প্রথম অফিস আদেশে কমিটির ওপর সীমান্তপারের ই-কমার্স সম্প্রসারণ, কৌশল নির্ধারণ, কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন এবং বাস্তবায়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের কমিটিতে সরাসরি ব্যবসায়িক স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করা হলে সম্ভাব্য স্বার্থের সংঘাতের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
ই-কমার্স খাতের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, সরকারি কমিটিতে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ নতুন কোনো বিষয় নয়। বরং বাস্তব অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে অনেক ক্ষেত্রেই এটি ইতিবাচক ভূমিকা রাখে। তবে সেই অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে প্রতিনিধিত্বের স্বচ্ছতা, নির্বাচন প্রক্রিয়ার গ্রহণযোগ্যতা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা না গেলে বিতর্ক তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক।
ডাক অধিদপ্তরের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, কমিটি ঘোষণার পর বিভিন্ন পর্যায় থেকে আপত্তি ও পর্যবেক্ষণ আসে। এরপর বিষয়টি পুনর্বিবেচনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সংশ্লিষ্ট সবার মতামত সংগ্রহ করে নতুন করে একটি অধিক গ্রহণযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক কাঠামো তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বৈশ্বিক ই-কমার্স বাজারে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ বাড়াতে ডাক বিভাগের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক লজিস্টিকস ও ক্রস-বর্ডার ই-কমার্স সেবা উন্নয়নের যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এমন উদ্যোগ সফল করতে হলে নীতিনির্ধারণে স্বচ্ছতা, অংশীজনদের ভারসাম্যপূর্ণ প্রতিনিধিত্ব এবং জবাবদিহিমূলক সিদ্ধান্ত গ্রহণ নিশ্চিত করা অপরিহার্য। অন্যথায় সম্ভাবনাময় এই খাতের উন্নয়ন পরিকল্পনাও বিতর্কের মুখে পড়তে পারে।
বর্তমানে কমিটির কার্যক্রম স্থগিত থাকলেও সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা শেষে নতুনভাবে কমিটি গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে ডাক বিভাগ। ফলে ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত অংশগ্রহণ এবং গ্রহণযোগ্য কাঠামোর মাধ্যমে সীমান্তপারের ই-কমার্স উন্নয়নে নতুন পরিকল্পনা আসতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন।

