কিশোরগঞ্জের ঐতিহাসিক পাগলা মসজিদের দানবাক্সে আবারও সৃষ্টি হয়েছে নতুন রেকর্ড। ছয় মাস পর দানবাক্স খুলে দীর্ঘ সময় ধরে গণনা শেষে পাওয়া গেছে ১৫ কোটি ৯০ লাখ ৮০ হাজার ১৪৬ টাকা। নগদ অর্থের পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের বৈদেশিক মুদ্রা, স্বর্ণালংকার এবং রুপাও পাওয়া গেছে, যা মসজিদটির প্রতি মানুষের গভীর আস্থা ও বিশ্বাসের আরেকটি প্রমাণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
শনিবার (২৭ জুন) সকাল থেকে শুরু হওয়া অর্থ গণনার কাজ শেষ হয় রাত সাড়ে ৮টার দিকে। প্রায় সাড়ে ১৩ ঘণ্টা ধরে চলা এই কার্যক্রম শেষে কিশোরগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও দানবাক্স খোলা কমিটির আহ্বায়ক মো. এরশাদুল আহমেদ চূড়ান্ত হিসাব প্রকাশ করেন।
সকালে জেলা প্রশাসক ও পাগলা মসজিদ পরিচালনা কমিটির সভাপতি সোহানা নাসরিনের উপস্থিতিতে দানবাক্সগুলোর তালা খোলা হয়। এরপর দানবাক্স থেকে সংগৃহীত অর্থ ৪৩টি বড় বস্তায় ভরে মসজিদের দ্বিতীয় তলায় নেওয়া হয়। সেখানে টাকা মেঝেতে ঢেলে শুরু হয় গণনার বিশাল কর্মযজ্ঞ।
এই কাজে অংশ নেন পাগলা মসজিদ-সংলগ্ন মাদ্রাসার ১০৬ জন এবং আল-জামিয়াতুল ইমদাদিয়া মাদ্রাসার ৩০০ জন শিক্ষার্থী। পাশাপাশি দিনভর গণনায় সহযোগিতা করেন রূপালী ব্যাংকের ১৩০ জন কর্মকর্তা, মসজিদের ৩৫ জন কর্মচারী এবং জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের ১৯ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী। পুরো প্রক্রিয়াটি সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিলেন জেলা প্রশাসনের ১৩ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট। এছাড়া দায়িত্ব পালন করেন ৪০ জন পুলিশ সদস্য, ৮ জন র্যাব সদস্য এবং ২০ জন আনসার সদস্য। দানবাক্স খোলা থেকে শুরু করে অর্থ ব্যাংকে জমা দেওয়া পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে কঠোর নজরদারি বজায় রাখা হয়।
জেলা প্রশাসক সোহানা নাসরিন বলেন, পাগলা মসজিদের প্রতি মানুষের বিশ্বাস ও আস্থা বছরের পর বছর ধরে অটুট রয়েছে। সেই বিশ্বাসের প্রতিফলনই দানবাক্সে জমা হওয়া বিপুল পরিমাণ অর্থে স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। তিনি জানান, নগদ অর্থের পাশাপাশি পাওয়া বৈদেশিক মুদ্রা, স্বর্ণালংকার ও রুপা জেলা প্রশাসনের ট্রেজারিতে নিরাপদভাবে সংরক্ষণ করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, এই অর্থ কোনো ব্যক্তি বা ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠানের জন্য ব্যবহার করা হয় না। দানবাক্সে জমা হওয়া অর্থ জেলার বিভিন্ন মসজিদ, মাদ্রাসা ও এতিমখানার উন্নয়ন ও পরিচালনায় ব্যয় করা হয়। পাশাপাশি দরিদ্র, অসহায় এবং জটিল রোগে আক্রান্ত মানুষের চিকিৎসা ও কল্যাণমূলক কার্যক্রমেও এই তহবিল থেকে সহায়তা দেওয়া হয়।
এবারের সংগ্রহ আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। এর আগে ছয় মাস আগে দানবাক্স খোলার সময় ১৩টি দানবাক্স থেকে প্রায় ১১ কোটি ৭৮ লাখ ৫০ হাজার টাকা পাওয়া গিয়েছিল। সেই তুলনায় এবার সংগৃহীত অর্থ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, যা দেশের অন্যতম আলোচিত ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে পাগলা মসজিদের প্রতি মানুষের অগাধ বিশ্বাস ও দানের প্রবণতাকে আরও একবার সামনে এনে দিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, শুধু কিশোরগঞ্জ নয়, দেশের বিভিন্ন জেলা এমনকি প্রবাস থেকেও অনেক মানুষ মানত ও ধর্মীয় অনুভূতি থেকে এই মসজিদে দান পাঠিয়ে থাকেন। ফলে প্রতিবার দানবাক্স খোলার সময় নতুন রেকর্ড গড়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এই বিপুল অর্থ সামাজিক ও জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যবহৃত হওয়ায় এর ইতিবাচক প্রভাবও বিস্তৃত পরিসরে পৌঁছে যাচ্ছে।

