জাতীয় সংসদে বাজেট আলোচনায় মুক্তিযুদ্ধ, গণতন্ত্র ও রাজনৈতিক ইতিহাস নিয়ে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে তর্ক-বিতর্কের আবহ তৈরি হয়েছে। বিরোধী দলের সমালোচনার জবাবে সরকারদলীয় সংসদ সদস্য জয়নুল আবদিন ফারুক বলেছেন, সংসদকে অযথা উত্তপ্ত করতে তিনি আগ্রহী নন। তবে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় বিরোধী দলগুলোর অবস্থান নিয়ে আত্মসমালোচনা করার আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতা বাড়ানোরও দাবি জানান।
শনিবার (২৭ জুন) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় এবং ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম বাজেট অধিবেশনের ১৬তম দিনের আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এসব বক্তব্য দেন। বাজেট নিয়ে বিরোধী দলের বিভিন্ন সমালোচনার জবাব দিতে গিয়েই তিনি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, গণতন্ত্র এবং রাজনৈতিক দায়বদ্ধতার বিষয়গুলো তুলে ধরেন।
জয়নুল আবদিন ফারুক বলেন, বিরোধী দলের সমালোচনা গণতন্ত্রেরই অংশ এবং সরকার তা গ্রহণ করে। তবে সেই সমালোচনা যেন গঠনমূলক হয় এবং জাতি গঠনে ইতিবাচক ভূমিকা রাখে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, সরকার ও বিরোধী দল পালাক্রমে দায়িত্ব পালন করবে—এটাই গণতন্ত্রের স্বাভাবিক নিয়ম। তাই রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও পারস্পরিক সহযোগিতার সংস্কৃতি বজায় রাখা প্রয়োজন।
বক্তব্যে তিনি ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, স্বাধীনতার আগে ও সময়কার ঘটনাগুলো নিয়ে বিরোধী দলকে নিজেদের অবস্থান মূল্যায়ন করা উচিত। বিশেষ করে শহীদ বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তিনি বলেন, স্বাধীনতার প্রাক্কালে যারা দেশকে মেধাশূন্য করার চেষ্টা করেছিল, সেই ইতিহাস ভুলে যাওয়া উচিত নয়।
তিনি আরও বলেন, স্বাধীনতার ঘোষণা শোনার পর তিনি নিজেও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। তখন তিনি কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য ছিলেন না বলেও উল্লেখ করেন। তাঁর ভাষায়, দেশের স্বাধীনতার জন্য যাঁরা জীবন উৎসর্গ করেছেন, তাঁদের অবদান সবসময় স্মরণ করা উচিত।
বাজেট আলোচনায় তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের আর্থিক সহায়তা বৃদ্ধির বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেন। অর্থমন্ত্রীর উদ্দেশে তিনি বলেন, স্বাধীনতা অর্জনে মুক্তিযোদ্ধাদের অবদান অনস্বীকার্য। তাই তাঁদের সম্মান ও মর্যাদা আরও বাড়াতে ভাতার পরিমাণ বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে তিনি জুলাইয়ের আন্দোলনে নিহত ও আহত ব্যক্তিদের প্রতিও শ্রদ্ধা জানান, তবে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস যেন কখনো আড়াল না হয়, সেই আহ্বান জানান।
বিরোধী দলের উদ্দেশে তিনি আরও বলেন, দেশের ইতিহাস নিয়ে বিভাজনের পরিবর্তে গঠনমূলক আলোচনা হওয়া উচিত। সংসদকে সংঘাতের পরিবর্তে নীতিনির্ধারণ ও জনগণের কল্যাণে কার্যকর আলোচনার ক্ষেত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
গণতন্ত্র প্রসঙ্গে জয়নুল আবদিন ফারুক বলেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। তাঁর দাবি, পরবর্তী সময়ে সেই গণতান্ত্রিক পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং দীর্ঘ সময় দেশে রাজনৈতিক দমন-পীড়ন চলেছে। তিনি গুম, নিপীড়ন এবং রাজনৈতিক সহিংসতার বিষয়ও বক্তব্যে তুলে ধরেন।
বক্তব্যের শেষদিকে তিনি জাতীয় ঐক্যের আহ্বান জানিয়ে বলেন, রাজনৈতিক মতভেদ থাকলেও দেশের স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। বিভক্তির রাজনীতি নয়, বরং পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহযোগিতার ভিত্তিতে একটি সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলাই হওয়া উচিত সব রাজনৈতিক দলের অভিন্ন লক্ষ্য।

