দেশের ক্ষুদ্র ও অতিক্ষুদ্র ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) ব্যবস্থার বাইরে রাখার দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতি। সংগঠনটির দাবি, এসব ব্যবসাকে ভ্যাটের আওতায় আনা হলে সারা দেশের বিপুলসংখ্যক ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা প্রশাসনিক হয়রানির মুখে পড়বেন। একই সঙ্গে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসা খাতে অস্থিরতা সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
আজ শনিবার দুপুরে রাজধানীর মগবাজারে বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব দাবি তুলে ধরা হয়। সরকার আগামী অর্থবছর থেকে মুদি দোকান, রেস্তোরাঁসহ ১৬ ধরনের ব্যবসাকে ভ্যাটের আওতায় আনার পরিকল্পনা নিয়েছে। বাজেট পাসের পর আগামী মাস থেকেই এ সিদ্ধান্ত কার্যকর হতে পারে। সরকারের এই পরিকল্পনার বিরোধিতা করেই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে দোকান মালিক সমিতি।
গত ২৪ জুন জাতীয় সংসদে বাজেট আলোচনায় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানান, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ভ্যাট থেকে ১ লাখ ৪১ হাজার ৫৮৬ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হয়েছে। রাজস্ব সংগ্রহ আরও বাড়াতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে মুদিদোকান, প্রসাধনসামগ্রীর দোকানসহ কয়েকটি খাতে সুনির্দিষ্ট কর ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি মো. হেলাল উদ্দিন। এ সময় সংগঠনের মহাসচিব মো. জহিরুল হক ভূঁইয়াসহ বিভিন্ন খাতের ব্যবসায়ী নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
সরকার যেসব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে ভ্যাটের আওতায় আনার পরিকল্পনা করেছে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে মুদিদোকান, তৈরি পোশাক ও কাপড়ের দোকান, কনফেকশনারি, প্রসাধনসামগ্রীর দোকান, প্লাস্টিক ও সিরামিকের গৃহস্থালি পণ্যের বিক্রেতা, জুতার দোকান, হার্ডওয়্যার ব্যবসা, ডেকোরেটরস, মুঠোফোন, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র, ফ্রিজ, ওভেন ও অন্যান্য ইলেকট্রনিকস পণ্যের বিক্রেতা, পেইন্ট ও হার্ডওয়্যার, স্যানিটারি ও ফিটিংস, টাইলসের দোকান, ঢেউটিন, রড ও সিমেন্টের ব্যবসা, আসবাবপত্রের দোকান, মিষ্টান্ন ভান্ডার এবং রেস্তোরাঁ।
দোকান মালিক সমিতির ভাষ্য, অতি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা কীভাবে ভোক্তার কাছ থেকে ভ্যাট আদায় করবেন, সে বিষয়ে কোনো সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা নেই। সংগঠনটি আরও দাবি করে, ১৯৯১ সালে দেশে ভ্যাট চালুর সময় তৎকালীন অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমান আশ্বাস দিয়েছিলেন যে হাটবাজার ও বন্দরের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ওপর ভ্যাট আরোপ করা হবে না। বর্তমান পরিকল্পনা সেই প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, দেশে বর্তমানে ভ্যাট নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা প্রায় পৌনে আট লাখ। গত অর্থবছরে আদায় হওয়া প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকার ভ্যাটের মধ্যে বৃহৎ করদাতা ইউনিটের আওতাভুক্ত মাত্র ১০৯টি প্রতিষ্ঠানই মোট রাজস্বের প্রায় ৬০ শতাংশ পরিশোধ করেছে। আর এলটিইউভুক্তসহ বড় পাঁচ হাজার প্রতিষ্ঠান দিয়েছে মোট ভ্যাট আদায়ের ৯৮ শতাংশ। সমিতির নেতাদের অভিযোগ, বড় প্রতিষ্ঠানের ভ্যাট ফাঁকি কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা গেলে রাজস্ব বাড়াতে ক্ষুদ্র ও অতি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের করের আওতায় আনার প্রয়োজন হবে না।
সংবাদ সম্মেলনে সভাপতি মো. হেলাল উদ্দিন বলেন, প্রকৃত ভ্যাটদাতার সংখ্যা বাড়াতে খুচরা ব্যবসায়ীদের হয়রানি না করে দ্রুত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে স্বয়ংক্রিয় ভ্যাট ব্যবস্থাপনা চালু করা উচিত। একই সঙ্গে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে প্রান্তিক ব্যবসায়ীদের ওপর চাপ না বাড়িয়ে বড় প্রতিষ্ঠান এবং উৎস পর্যায় থেকে ভ্যাট আদায়ে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
এদিকে আয়কর আইনের ২১৬ ধারা বাতিলের দাবিও জানায় বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতি। সংগঠনটির মতে, এই ধারা অসম্মানজনক ও নিপীড়নমূলক। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, এ ধারার মাধ্যমে কর কর্মকর্তাদের অতিরিক্ত ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। ফলে মাঠপর্যায়ের অনেক কর্মকর্তা সামান্য ভুলের জন্যও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে বড় ধরনের আইনি ব্যবস্থার ভয় দেখানোর সুযোগ পান।
সংগঠনটির আরও দাবি, প্রতি অর্থবছরের আয়কর ও ভ্যাট রিটার্ন সংশ্লিষ্ট অর্থবছর শেষ হওয়ার পরবর্তী ছয় মাসের মধ্যে, অর্থাৎ ডিসেম্বরের মধ্যে জমা দেওয়ার সুযোগ রাখতে হবে। এরপর ছয় মাস সময় নিয়ে যাচাই-বাছাই শেষ করে যদি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কোনো আপত্তি না থাকে, তাহলে ওই অর্থবছরের কর ও ভ্যাট পরিশোধের সনদ বা ‘বছরের সার্টিফিকেট’ প্রদান করতে হবে।
মো. হেলাল উদ্দিন বলেন, বিদ্যুৎ, পানি ও গ্যাসের বিল পরিশোধের মতো ভ্যাট ও আয়করের ক্ষেত্রেও বছরের শেষে সার্টিফিকেট দেওয়ার ব্যবস্থা চালু করা উচিত। একই সঙ্গে নিরীক্ষা কিংবা কথিত বকেয়া করের অজুহাতে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের হয়রানি বন্ধ করার দাবি জানান তিনি।

