সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক বদলির ক্ষেত্রে প্রযুক্তিনির্ভর অনলাইন পদ্ধতি থেকে সরে এসে আবারও কমিটিনির্ভর অফলাইন ব্যবস্থা চালু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।
নতুন এ ব্যবস্থায় বদলির আবেদন নিষ্পত্তি করবেন সচিব, বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) নেতৃত্বাধীন চার স্তরের কমিটি। তবে প্রতিটি কমিটিতে সভাপতির মনোনীত দুজন করে ‘গণ্যমান্য ব্যক্তি’ রাখার বিধান ঘিরে ইতোমধ্যে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং রাজনৈতিক প্রভাবের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
শিক্ষক নেতারা, শিক্ষা প্রশাসনের সাবেক কর্মকর্তারা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের একটি বড় অংশের মতে, অনলাইন পদ্ধতিতে বদলি কার্যক্রম পরিচালনার ফলে যেসব অভিযোগ অনেকটাই কমে এসেছিল, নতুন ব্যবস্থায় সেসব সমস্যা আবারও ফিরে আসতে পারে। বিশেষ করে রাজনৈতিক তদবির, ব্যক্তিগত সুপারিশ, ঘুষ ও প্রভাব বিস্তারের সুযোগ বাড়তে পারে বলে তাদের আশঙ্কা।
সম্প্রতি জারি করা প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, শিক্ষক বদলির জন্য জাতীয়, বিভাগীয়, জেলা এবং উপজেলা বা থানা পর্যায়ে পৃথক কমিটি গঠন করা হবে। জাতীয় পর্যায়ের কমিটির সভাপতি থাকবেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব। সদস্য থাকবেন প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এবং সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব। আন্তঃবিভাগীয় বদলির আবেদন এই কমিটি নিষ্পত্তি করবে।
বিভাগীয় পর্যায়ে বিভাগীয় কমিশনারের নেতৃত্বে গঠিত কমিটিতে বিভাগীয় শিক্ষা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের পাশাপাশি সভাপতির মনোনীত দুজন গণ্যমান্য ব্যক্তি সদস্য হিসেবে থাকবেন।
একইভাবে জেলা পর্যায়ে জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বে গঠিত কমিটি জেলার ভেতরে শিক্ষক বদলি এবং নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত সহকারী শিক্ষকদের বিদ্যালয়ে পদায়নের দায়িত্ব পালন করবে। উপজেলা বা থানা পর্যায়ে ইউএনওর নেতৃত্বাধীন কমিটি একই উপজেলার শিক্ষক বদলির আবেদন নিষ্পত্তি করবে।
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, প্রতিটি কমিটি প্রতি মাসে অন্তত একবার বৈঠক করবে। সেখানে আবেদন যাচাই-বাছাই করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে এবং কার্যবিবরণী ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠাতে হবে। যেসব শিক্ষক আগে প্রতিস্থাপন সাপেক্ষে বদলির আদেশ পেয়েছিলেন, তাদের আবেদন অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিষ্পত্তিরও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
তবে নতুন ব্যবস্থার সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হয়ে উঠেছে কমিটিতে ‘গণ্যমান্য ব্যক্তি’ অন্তর্ভুক্তির বিধান। প্রজ্ঞাপনে এ ধরনের ব্যক্তিদের যোগ্যতা, নির্বাচন পদ্ধতি কিংবা দায়িত্ব সম্পর্কে কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। ফলে কাদের গণ্যমান্য ব্যক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হবে, তারা কীভাবে মনোনীত হবেন এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাদের ভূমিকা কী হবে—এসব প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর নেই।
শিক্ষকদের অভিযোগ, অতীতে অফলাইন বদলি ব্যবস্থায় রাজনৈতিক সুপারিশ, স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের হস্তক্ষেপ এবং আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ ছিল ব্যাপক। অনেক ক্ষেত্রে যোগ্য ও জ্যেষ্ঠ শিক্ষকরা বদলির সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন বলেও অভিযোগ ওঠে। সেই অভিজ্ঞতার কারণেই ২০২৩ সালে অনলাইন বদলি ব্যবস্থা চালু করা হয়েছিল।
অনলাইন ব্যবস্থায় সফটওয়্যার স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিভিন্ন সূচকের ভিত্তিতে আবেদন মূল্যায়ন করত। চাকরির মেয়াদ, বর্তমান কর্মস্থলের দূরত্ব, দুর্গম এলাকায় দায়িত্ব পালন, নারী শিক্ষক, শারীরিক প্রতিবন্ধিতা, গুরুতর অসুস্থতা, স্বামী-স্ত্রীর কর্মস্থল, পারিবারিক সমস্যা এবং অন্যান্য মানবিক বিষয় বিবেচনায় স্কোর নির্ধারণ করা হতো। সর্বোচ্চ স্কোর পাওয়া আবেদনকারী বদলির জন্য নির্বাচিত হতেন।
যদিও স্কোরিং ব্যবস্থার কিছু দিক নিয়ে শিক্ষকদের একটি অংশের আপত্তি ছিল, তবুও অধিকাংশ শিক্ষক এটিকে তুলনামূলকভাবে নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ এবং প্রযুক্তিনির্ভর একটি ব্যবস্থা হিসেবে মূল্যায়ন করেন। তাদের মতে, সফটওয়্যারভিত্তিক মূল্যায়নের কারণে ব্যক্তিগত সুপারিশ বা রাজনৈতিক প্রভাবের সুযোগ অনেকটাই সীমিত ছিল।
শিক্ষা প্রশাসনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সরকারি কর্মচারীদের বদলি ও পদায়নে তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা ক্রমেই গুরুত্ব পাচ্ছে। কারণ এতে মানবিক বিবেচনার পাশাপাশি নির্দিষ্ট মানদণ্ড অনুসরণ করা সম্ভব হয় এবং সিদ্ধান্তের জবাবদিহিও নিশ্চিত করা যায়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও একই ধরনের আধুনিক ব্যবস্থার দিকে অগ্রসর হওয়ার প্রয়োজন রয়েছে বলে তারা মনে করেন।
বাংলাদেশ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সহকারী শিক্ষক সমিতির নেতারাও অনলাইন বদলির পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। তাদের ভাষ্য, নির্দিষ্ট স্কোরের ভিত্তিতে বদলি হলে একজন শিক্ষক নিশ্চিতভাবে জানতে পারেন কেন তিনি সুযোগ পেলেন বা পেলেন না। কিন্তু কমিটিনির্ভর ব্যবস্থায় সেই স্বচ্ছতা সব সময় নিশ্চিত করা কঠিন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২০২৫ সাল থেকে সাধারণ শিক্ষক বদলি কার্যক্রম প্রায় বন্ধ ছিল। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে অনলাইন বদলি পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেওয়া হলেও সেটি বাস্তবায়ন হয়নি। পরে অনলাইন বদলি নীতিমালা প্রস্তুত হলেও তা কার্যকর না করে নতুন প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে কমিটিভিত্তিক ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে।
তবে সরকার বলছে, এটি স্থায়ী ব্যবস্থা নয়। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ জানিয়েছেন, শিক্ষক বদলির জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ ও আধুনিক নীতিমালা প্রণয়নের কাজ চলছে। সেই নীতিমালা চূড়ান্ত না হওয়া পর্যন্ত বর্তমান কমিটিনির্ভর ব্যবস্থা সাময়িকভাবে কার্যকর থাকবে। দীর্ঘদিন বদলি কার্যক্রম বন্ধ থাকায় দ্রুত তা চালু করতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে ৬৫ হাজার ৫৬৯টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রায় এক কোটি ৩৫ লাখ শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছে। এসব বিদ্যালয়ে কর্মরত শিক্ষকের সংখ্যা প্রায় তিন লাখ ৫৯ হাজার। এত বড় জনবল ব্যবস্থাপনায় বদলি কার্যক্রমকে স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও প্রযুক্তিনির্ভর রাখা শিক্ষা প্রশাসনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। নতুন ব্যবস্থাটি বাস্তবে কতটা কার্যকর ও গ্রহণযোগ্য হবে, তা নির্ভর করবে এর বাস্তবায়ন, জবাবদিহি এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বচ্ছতার ওপর।

