ঢাকার হাজারীবাগ থেকে সাভারের হেমায়েতপুরে ট্যানারি স্থানান্তরের ফলে রাজধানীর পরিবেশ দূষণ কিছুটা কমেছে। তবে এর বিপরীতে সাভার এলাকায় নতুন করে পরিবেশগত চাপ ও দূষণের ঝুঁকি বেড়েছে। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের অধীন বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) প্রকাশিত এক প্রভাব মূল্যায়ন প্রতিবেদনে এমন চিত্র উঠে এসেছে।
গত মঙ্গলবার প্রকাশিত ‘চামড়া শিল্পনগরী, ঢাকা (চতুর্থ সংশোধিত)’ প্রকল্পের প্রভাব মূল্যায়ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাভার চামড়া শিল্পনগরীর আশপাশে পরিবেশগত নানা সমস্যা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে শিল্পনগরীর পাশ দিয়ে প্রবাহিত ধলেশ্বরী নদীর পানি কালচে হয়ে গেছে, দুর্গন্ধ বেড়েছে, জলজ প্রাণীর উপস্থিতি কমেছে এবং বায়ুদূষণও বৃদ্ধি পেয়েছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, শিল্পনগরীতে কেন্দ্রীয় বর্জ্য পরিশোধনাগার (সিইটিপি) নির্মাণ করা হলেও সেটি এখনো পূর্ণ সক্ষমতায় পরিচালিত হচ্ছে না। অতিরিক্ত বর্জ্য প্রবাহ, রাসায়নিক ও পানির অতিরিক্ত ব্যবহার, কঠিন বর্জ্য সিইটিপির লাইনে চলে আসা, বিদ্যুৎ সংকট, দুর্বল রক্ষণাবেক্ষণ এবং দক্ষ জনবলের অভাবে বর্জ্য পরিশোধন কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
হাজারীবাগের ট্যানারিগুলো সাভারের হেমায়েতপুরে স্থানান্তরের উদ্দেশ্যে ২০০৩ সালের জানুয়ারিতে প্রকল্পটির অনুমোদন দেওয়া হয়। ১৭৫ কোটি ৭৫ লাখ টাকা ব্যয়ে ২০০৫ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও প্রকল্পটি সম্পন্ন হতে প্রায় সাড়ে ১৮ বছর লেগে যায়। শেষ পর্যন্ত ২০২১ সালের জুনে প্রকল্পের কাজ শেষ হয়। একাধিক দফায় সংশোধনের ফলে প্রকল্পের ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ১৫ কোটি ৫৬ লাখ টাকা। তবে প্রকৃত ব্যয় হয়েছে প্রায় ৯৩৭ কোটি টাকা।
সমীক্ষার অংশ হিসেবে সিইটিপির আউটলেট এবং ধলেশ্বরী নদীর উজান ও ভাটির বিভিন্ন স্থান থেকে পানির নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষাগারে বিশ্লেষণ করা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একাধিক দূষণ সূচক অনুমোদিত সীমার চেয়ে বেশি পাওয়া গেছে। আইসিডিডিআরবির পরীক্ষায় দেখা যায়, নদীর উজান ও ভাটির তুলনায় সিইটিপির আউটলেটেই দূষণের মাত্রা সবচেয়ে বেশি।
আউটলেটের পানিতে রাসায়নিক অক্সিজেন চাহিদা (সিওডি) পাওয়া গেছে লিটারপ্রতি ৭৩৭ মিলিগ্রাম, যেখানে অনুমোদিত সীমা ২০০ মিলিগ্রাম। একইভাবে জৈব রাসায়নিক অক্সিজেন চাহিদা (বিওডি) অনুমোদিত ৩০ মিলিগ্রামের বিপরীতে পাওয়া গেছে ২৯৯ মিলিগ্রাম।
মোট স্থগিত কঠিন পদার্থ (টিএসএস) পাওয়া গেছে লিটারপ্রতি ২২৪ মিলিগ্রাম, যদিও অনুমোদিত সীমা ১০০ মিলিগ্রাম। অন্যদিকে অ্যামোনিয়ার মাত্রা ছিল লিটারপ্রতি ৫৩ দশমিক ৯১ মিলিগ্রাম, যা নির্ধারিত ৫০ মিলিগ্রামের চেয়ে বেশি।
তিনটি স্থান থেকেই সংগ্রহ করা নমুনায় দ্রবীভূত অক্সিজেনের পরিমাণ স্বাভাবিকের তুলনায় কম পাওয়া গেছে। যেখানে পানিতে এই অক্সিজেনের মাত্রা লিটারপ্রতি ৪ দশমিক ৫ থেকে ৮ মিলিগ্রাম থাকা প্রয়োজন, সেখানে সিইটিপির আউটলেটের পানিতে তা ছিল মাত্র শূন্য দশমিক ১৭ মিলিগ্রাম।
চলতি বছরের মার্চে পরিবেশ অধিদপ্তরের পৃথক পরীক্ষাতেও একই ধরনের উদ্বেগজনক তথ্য উঠে আসে। সেখানে সিইটিপি আউটলেটে বিওডি পাওয়া যায় লিটারপ্রতি ৮৬ মিলিগ্রাম, ক্লোরাইড ৩ হাজার ১৯৬ মিলিগ্রাম এবং মোট ক্রোমিয়াম ৫ দশমিক ১৫১ মিলিগ্রাম। আরও উদ্বেগজনক পরিস্থিতি দেখা গেছে সিইটিপি আউটলেটসংলগ্ন বাইপাস ড্রেনে। সেখানে বিওডি ছিল লিটারপ্রতি ৭৫০ মিলিগ্রাম, টিএসএস ৩৬৪ মিলিগ্রাম এবং মোট ক্রোমিয়াম ১১ দশমিক শূন্য ৫ মিলিগ্রাম।
প্রতিবেদনে ৪২৮ জন ট্যানারি কর্মী এবং ৫১ জন চামড়া ব্যবসায়ীর মতামতের ভিত্তিতে পরিচালিত জরিপের ফলাফলও তুলে ধরা হয়েছে। জরিপে অংশ নেওয়া ৪২৮ জন কর্মীর মধ্যে ২০৫ জন বা প্রায় ৪৭ দশমিক ৯ শতাংশ দূষণকে ‘মাঝারি’ বলেছেন। ১৫৯ জন বা ৩৭ দশমিক ১৫ শতাংশের মতে দূষণ ‘কম’ এবং ১৭ জন বা ৩ দশমিক ৯৭ শতাংশের মতে ‘খুব কম’। অন্যদিকে ১৪ জন বা ৩ দশমিক ২৭ শতাংশ দূষণকে ‘বেশি’ এবং ২৩ জন বা ৫ দশমিক ৩৭ শতাংশ ‘অত্যন্ত বেশি’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। ১০ জন এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাভার চামড়া শিল্পনগরীর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এখনো প্রত্যাশিত মানে পৌঁছাতে পারেনি। ৫১ জন চামড়া ব্যবসায়ীর মধ্যে ২৮ জন বা ৫৪ দশমিক ৯০ শতাংশ মনে করেন, কিছু উন্নতি হলেও বর্জ্য নিয়ন্ত্রণে এখনো উল্লেখযোগ্য সমস্যা রয়েছে। ১১ জন বা ২১ দশমিক ৫৭ শতাংশ বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে অপ্রতুল বলেছেন। ৯ জন বা ১৭ দশমিক ৬৫ শতাংশের মতে অধিকাংশ বর্জ্য এখনো নিয়ন্ত্রণহীন।
অন্যদিকে মাত্র ২ জন মনে করেন, অধিকাংশ বর্জ্য সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে এবং মাত্র ১ জনের মতে বর্জ্য সম্পূর্ণ নিরাপদভাবে পরিশোধন বা নিষ্কাশন করা হচ্ছে। প্রতিবেদন বলছে, সিইটিপি থাকলেও সেটির কার্যকারিতা এখনো সন্তোষজনক নয়। ফলে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দক্ষতা বৃদ্ধি, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা উন্নয়ন এবং কঠোর তদারকির প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট হয়েছে।
আইএমইডির মূল্যায়নে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা ধরে রাখতে লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপ (এলডব্লিউজি) সনদ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও অধিকাংশ ট্যানারি এখনো তা অর্জন করতে পারেনি। এর কারণ হিসেবে পরিবেশগত অনুবর্তিতার ঘাটতি, ক্রোম পুনরুদ্ধার ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা, শ্রমিকদের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা, সিইটিপির আংশিক কার্যকারিতা এবং পর্যাপ্ত তদারকির অভাবকে দায়ী করা হয়েছে।
এ ছাড়া কাঁচা চামড়ার বাজারে অস্বচ্ছতা, মধ্যস্বত্বভোগীর প্রভাব, প্রশাসনিক জটিলতা, ওয়ান-স্টপ সার্ভিস চালু না হওয়া এবং কিছু অবকাঠামোর অপূর্ণ ব্যবহারকেও শিল্পের বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রতিবেদন সতর্ক করে বলেছে, স্লাজ ও ক্রোম বর্জ্যের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপদ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত না হলে ভবিষ্যতে পরিবেশগত ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।
প্রতিবেদনে অংশগ্রহণকারী উত্তরদাতাদের সুপারিশ বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সাভার চামড়া শিল্পনগরীর টেকসই উন্নয়নের জন্য সিইটিপির উন্নয়নকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। মোট ৯৬ দশমিক ০৮ শতাংশ উত্তরদাতা সিইটিপির সক্ষমতা বাড়ানোর সুপারিশ করেছেন। ৮০ দশমিক ৩৯ শতাংশ আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আবারও আকৃষ্ট করতে সরকারের সক্রিয় উদ্যোগের পক্ষে মত দিয়েছেন।
এ ছাড়া ৭৪ দশমিক ৫১ শতাংশ উত্তরদাতা শিল্পনগরীতে হাসপাতাল বা ক্লিনিক স্থাপনের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। প্রায় ৪৫ দশমিক ১০ শতাংশ ওয়ান-স্টপ সার্ভিস চালুর সুপারিশ করেছেন। প্রতিবেদনে সিইটিপির সক্ষমতা বৃদ্ধি, প্রতিটি ট্যানারিতে বাধ্যতামূলক প্রি-ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট স্থাপন, কঠোর পরিবেশগত তদারকি এবং রিয়েল-টাইম মনিটরিং চালুর সুপারিশ করা হয়েছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অর্জন, রপ্তানি সক্ষমতা বাড়ানো এবং শ্রমিকদের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া এলডব্লিউজি সনদ অর্জনের জন্য সময়বদ্ধ কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতা ও কারখানার মধ্যে আরও কার্যকর যোগাযোগ গড়ে তোলার পরামর্শও দেওয়া হয়েছে।
প্রতিবেদনের সার্বিক মূল্যায়নে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের চামড়া শিল্পকে পরিকল্পিত ও আধুনিক কাঠামোয় নিয়ে যেতে প্রকল্পটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তবে পরিবেশ ব্যবস্থাপনা, সিইটিপির কার্যকারিতা, আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখা এবং শিল্পের টেকসই পরিচালনায় এখনো বড় ধরনের ঘাটতি রয়ে গেছে।

