Close Menu
Citizens VoiceCitizens Voice
    Facebook X (Twitter) Instagram YouTube LinkedIn WhatsApp Telegram
    Citizens VoiceCitizens Voice শনি, জুলাই 4, 2026
    • প্রথমপাতা
    • অর্থনীতি
    • বাণিজ্য
    • ব্যাংক
    • পুঁজিবাজার
    • বিমা
    • কর্পোরেট
    • বাংলাদেশ
    • আন্তর্জাতিক
    • আইন
    • অপরাধ
    • মতামত
    • অন্যান্য
      • খেলা
      • শিক্ষা
      • স্বাস্থ্য
      • প্রযুক্তি
      • ধর্ম
      • বিনোদন
      • সাহিত্য
      • বিশ্ব অর্থনীতি
      • ভূ-রাজনীতি
      • বিশ্লেষণ
      • ভিডিও
    Citizens VoiceCitizens Voice
    Home » রোহিঙ্গাদের জন্য আসা টাকা কোথায় যায়?
    বাংলাদেশ

    রোহিঙ্গাদের জন্য আসা টাকা কোথায় যায়?

    নিউজ ডেস্কজুলাই 4, 2026
    Facebook Twitter Email Telegram WhatsApp Copy Link
    Share
    Facebook Twitter LinkedIn Telegram WhatsApp Email Copy Link

    রোহিঙ্গা সংকট এখন আর শুধু একটি মানবিক বিপর্যয়ের নাম নয়; এটি সময়ের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী, জটিল এবং ক্লান্তিকর এক বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে। মিয়ানমার থেকে প্রাণ বাঁচাতে পালিয়ে আসা ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গা বছরের পর বছর বাংলাদেশের কক্সবাজার ও ভাসানচরের শিবিরে আশ্রয় নিয়ে বেঁচে আছে। তাদের জীবন নির্ভর করছে আন্তর্জাতিক সহায়তা, খাদ্য বরাদ্দ, চিকিৎসা, নিরাপত্তা, শিক্ষা ও ন্যূনতম মানবিক সেবার ওপর।

    এই বিপুল জনগোষ্ঠীর পাশে দাঁড়াতে বাংলাদেশ সরকার, জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা, দেশি-বিদেশি সাহায্য সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক দাতারা দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে। তাদের মধ্যে জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাগুলোর একটি পালন করে আসছে। আশ্রয়, সুরক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, জ্বালানি, অবকাঠামো এবং অন্যান্য জরুরি সহায়তার বড় অংশই এই সংস্থার নেতৃত্বে বা অংশীদারিত্বে পরিচালিত হয়েছে।

    কিন্তু যে সংস্থার ওপর এত বড় দায়িত্ব, সেই সংস্থার পরিচালিত রোহিঙ্গা সহায়তা কার্যক্রমে যদি অনিয়ম, অপচয়, দুর্বল পরিকল্পনা ও অকার্যকর ব্যয়ের প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে বিষয়টি শুধু হিসাব-নিকাশের সমস্যা থাকে না। এটি সরাসরি মানুষের জীবন, ক্ষুধা, চিকিৎসা, শিক্ষা এবং নিরাপত্তার প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়।

    জাতিসংঘ সদর দপ্তরের অভ্যন্তরীণ তদারকি দপ্তরের সাম্প্রতিক নিরীক্ষায় ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশে পরিচালিত রোহিঙ্গা সহায়তা প্রকল্পে গুরুতর ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতা, অনিয়ম এবং অর্থের অপচয়ের চিত্র উঠে এসেছে। এই তথ্য সম্প্রতি নিউ এজে প্রকাশিত প্রতিবেদনে সামনে আসে। প্রতিবেদনের প্রতিটি অংশই দেখায়, কীভাবে ভুল সিদ্ধান্ত, অপ্রয়োজনীয় ক্রয়, অকার্যকর প্রকল্প এবং দুর্বল তদারকি শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে দুর্বল মানুষের ওপরই চাপ তৈরি করে।

    প্রথমেই দেখা যায়, শরণার্থীদের প্রকৃত প্রয়োজন না বুঝে অনেক সামগ্রী কেনা হয়েছে। রোহিঙ্গারা পানির কলস বা পাত্র ব্যবহার করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করলেও তাদের জন্য ৮৭,৮৭৫ মার্কিন ডলারের জেরিক্যান কেনা হয়েছিল। আবার ১,৮২,০২৮ মার্কিন ডলারের চামচ-ছুরি-কাঁটার সামগ্রী কেনা হয়, যদিও অনেক রোহিঙ্গা পরিবার প্রচলিত অভ্যাস অনুযায়ী হাতে খায় এবং এসব সামগ্রীর বাস্তব ব্যবহার ছিল সীমিত। শিবিরে থাকা মানুষের অভিযোগ ও অভিজ্ঞতা জানা সত্ত্বেও অখাদ্য সহায়তা সামগ্রীর প্যাকেটগুলো সময়মতো পরিবর্তন করা হয়নি। ফলে ৬২,১০০টি রান্নাঘরের সামগ্রীর সেট অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে থাকে, যার মূল্য প্রায় ১৩ লাখ ২০ হাজার মার্কিন ডলার।

    এখানে সমস্যাটি শুধু অর্থ অপচয়ের নয়। সমস্যাটি পরিকল্পনার। যাদের জন্য সহায়তা, তাদের জীবনযাপন, সংস্কৃতি, প্রয়োজন, ব্যবহারিক বাস্তবতা এবং মতামতকে গুরুত্ব না দিলে সাহায্য কার্যক্রম কাগজে বড় দেখালেও মাঠে অকার্যকর হয়ে পড়ে। ত্রাণ তখন সহায়তা না হয়ে গুদামের বোঝা হয়ে যায়।

    দ্বিতীয় বড় উদাহরণ হাতি পর্যবেক্ষণ টাওয়ার নির্মাণ। শিবির এলাকায় হাতি চলাচলজনিত ঝুঁকি মোকাবিলার জন্য ৯৯টি টাওয়ার নির্মাণে ২২ লাখ মার্কিন ডলার ব্যয় করা হয়। কিন্তু পরবর্তী মূল্যায়নে দেখা যায়, এই টাওয়ারগুলো প্রত্যাশিতভাবে কার্যকর হয়নি। নির্মাণসামগ্রী বাবদ আরও ৫৬,০২৫ মার্কিন ডলারের ক্ষতি হয় এবং টাওয়ারগুলো কার্যকর করার ব্যর্থ চেষ্টায় অতিরিক্ত ৩,৬৭,৭৫৯ মার্কিন ডলার ব্যয় করা হয়। ২০২৫ সালের মূল্যায়নে টাওয়ারের সংখ্যা কমানোর সুপারিশ করা হলেও নিরীক্ষার সময় পর্যন্ত মাত্র ১২টি সরানো হয়েছিল। বাকি ৩৭টি সরাতে পারলে আরও ১,৮০,০০০ মার্কিন ডলার সাশ্রয় হতে পারত।

    এ ধরনের প্রকল্প আমাদের একটি মৌলিক শিক্ষা দেয়। মানবিক সহায়তায় ভালো উদ্দেশ্য যথেষ্ট নয়; দরকার বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা, বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন এবং ব্যয়ের যৌক্তিকতা। যদি একটি প্রকল্প মাঠে কাজ না করে, তবে সেটি যত বড় বাজেটেরই হোক, মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে না।

    তৃতীয়ত, যানবাহন ব্যবস্থাপনাতেও গুরুতর অদক্ষতার প্রমাণ পাওয়া গেছে। ১৬টি শরণার্থী শিবিরের জন্য ৫২টি কর্মসূচি-সম্পর্কিত যানবাহনের প্রয়োজনীয়তা যথাযথভাবে ব্যাখ্যা করা যায়নি। একইভাবে ৪৮টি প্রশাসনিক যানবাহন রাখা হলেও চালক ছিল মাত্র ২৯ জন। আরও উদ্বেগজনক হলো, মোট ১০৪টি যানবাহনের মধ্যে ১০টি দীর্ঘদিন অচল অবস্থায় ছিল, তবুও সেগুলোর ভাড়া বাবদ ৮০,০০০ মার্কিন ডলারের বেশি অর্থ পরিশোধ করা হয়েছে।

    মানবিক সহায়তা কার্যক্রমে যানবাহনের প্রয়োজন থাকতে পারে, বিশেষ করে কক্সবাজারের মতো বিস্তৃত ও দুর্গম এলাকায়। কিন্তু প্রয়োজনের নামে অতিরিক্ত গাড়ি রাখা, অচল গাড়ির ভাড়া দেওয়া বা চালকের সংখ্যার সঙ্গে গাড়ির সংখ্যা না মিলানো স্পষ্টতই দুর্বল ব্যবস্থাপনার লক্ষণ। এই অর্থ দিয়ে খাদ্য, ওষুধ, শিশু শিক্ষা বা জরুরি সুরক্ষা সেবা জোরদার করা যেত।

    চতুর্থত, তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের পুনরায় ভরার ক্ষেত্রেও বড় ধরনের অতিরিক্ত ব্যয়ের তথ্য পাওয়া গেছে। প্রকৃত প্রয়োজন ছিল ১ কোটি ৮৭ লাখ মার্কিন ডলারের, কিন্তু কেনা হয়েছে ২ কোটি ৪২ লাখ মার্কিন ডলারের। অর্থাৎ প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি ক্রয় করা হয়েছে। রোহিঙ্গা শিবিরে রান্নার জ্বালানি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বনভূমির ওপর চাপ কমানো এবং নারীদের নিরাপদ রান্নার ব্যবস্থা নিশ্চিত করার জন্য গ্যাস সরবরাহ দরকার। কিন্তু দরকারি খাতে ব্যয় মানেই অযৌক্তিক অতিরিক্ত ব্যয় গ্রহণযোগ্য নয়।

    পঞ্চমত, কক্সবাজারে ২,৪০,০০০ মার্কিন ডলার ব্যয়ে একটি নতুন কার্যালয় নির্মাণ করা হয়, কিন্তু জমির মালিকের কাছ থেকে আনুষ্ঠানিক অনুমতি নেওয়া হয়নি। পরে তৃতীয় তলা যোগ করায় ব্যয় আরও বাড়ে। কাজ শেষ হওয়ার পর জমির মালিক ভাড়া বাড়ানোর কথা জানান, অথচ কোনো আনুষ্ঠানিক ভাড়া চুক্তি ছিল না। নতুন কার্যালয়টি পাঁচ মাস খালি পড়ে থাকে, কিন্তু এই সময়েও প্রতি মাসে ১১,০০০ মার্কিন ডলার ভাড়া পরিশোধ চলতে থাকে।

    এ ধরনের ঘটনা শুধু আর্থিক অব্যবস্থাপনা নয়, প্রশাসনিক দায়িত্বহীনতারও দৃষ্টান্ত। একটি আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থার ক্ষেত্রে জমির অনুমতি, ভাড়া চুক্তি, ব্যবহার পরিকল্পনা এবং ব্যয়ের যৌক্তিকতা নিশ্চিত করা মৌলিক শর্ত হওয়া উচিত।

    আরও উদ্বেগজনক হলো, কিছু গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও যন্ত্রপাতি তৈরি বা কেনা হলেও সেগুলো ব্যবহার করা হয়নি। উখিয়ায় ১৫ লাখ মার্কিন ডলার ব্যয়ে একটি বিশেষায়িত হাসপাতাল নির্মিত হয়েছিল। ভাসানচরে ২০ শয্যার একটি অন্তর্বিভাগীয় চিকিৎসা কেন্দ্র সংস্কার ও সৌর সরঞ্জাম স্থাপনে মোট ১,৪০,০০০ মার্কিন ডলার ব্যয় করা হয়। আবার ৭৪,৩০১ মার্কিন ডলারের একটি এক্স-রে যন্ত্র কেনা হয়। কিন্তু এসব স্থাপনা ও সরঞ্জামের ব্যবহার নিশ্চিত করা যায়নি।

    এই অংশটি সবচেয়ে মানবিক বেদনার জায়গা তৈরি করে। কারণ একই সময়ে শিবিরে স্বাস্থ্যসেবা সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা ছিল, চিকিৎসা সুবিধা সীমিত ছিল, শিশু ও বৃদ্ধদের চিকিৎসা প্রয়োজন ছিল প্রবল। এমন পরিস্থিতিতে হাসপাতাল, শয্যা, সৌর সরঞ্জাম বা চিকিৎসা যন্ত্র অব্যবহৃত থাকা মানে শুধু অর্থের অপচয় নয়; এটি সম্ভাব্য চিকিৎসাসেবা থেকে মানুষকে বঞ্চিত করা।

    ষষ্ঠত, নির্মাণকাজ ও পণ্য ক্রয়ের ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতাহীনতা এবং অতিরিক্ত দামের গুরুতর অভিযোগ উঠে এসেছে। ২০২১ সাল থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত ২ কোটি ৫০ লাখ মার্কিন ডলারের নির্মাণ ও ক্রয়কাজ একটি মাত্র ঠিকাদারকে দেওয়া হয়, যার মূল্য বাজারদরের তুলনায় ২৬ শতাংশ বেশি ছিল। এতে আনুমানিক ৬৫ লাখ মার্কিন ডলারের ক্ষতি হয়েছে।

    আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ কর্মসূচিও একটি মাত্র ঠিকাদারের ওপর নির্ভরশীল ছিল, যদিও আরও চারটি পূর্বযোগ্য প্রতিষ্ঠান ৩৩ থেকে ৪৩ শতাংশ কম দরে প্রস্তাব দিয়েছিল। একইভাবে গ্যাস পুনরায় ভরা, চুলা, আগুন ধরানোর যন্ত্র, প্রেসার কুকার এবং প্রশিক্ষণ বাবদ ৩ কোটি মার্কিন ডলারের চুক্তি একটি সরবরাহকারীকে দেওয়া হয়, যিনি সর্বনিম্ন দরদাতা ছিলেন না। চুক্তি অনুযায়ী গ্যাস সংরক্ষণাগারের খরচ ঠিকাদারের বহন করার কথা থাকলেও সংস্থাটি নিজেই ১৬ লাখ ৬০ হাজার মার্কিন ডলার পরিশোধ করেছে। আবার প্রেসার কুকারের সঙ্গে থাকা আগুন ধরানোর যন্ত্রের নিশ্চয়তা থাকা সত্ত্বেও অতিরিক্ত ৬৫,৩৬৭ মার্কিন ডলারের আগুন ধরানোর যন্ত্র কেনা হয়।

    এখানে প্রশ্ন উঠবেই: কেন বারবার একই ঠিকাদার বা সরবরাহকারীকে সুবিধা দেওয়া হলো? কেন কম দামের যোগ্য প্রতিষ্ঠান থাকা সত্ত্বেও বেশি দামে চুক্তি করা হলো? কেন চুক্তির দায় সংস্থাই নিজের কাঁধে নিল? এসব প্রশ্নের স্বচ্ছ উত্তর না এলে দাতা, সরকার এবং সাধারণ মানুষের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

    সপ্তমত, ৩৯ লাখ মার্কিন ডলারের জ্বালানি ও পরিবেশ কর্মসূচির ক্ষেত্রেও বাজারদরের তুলনায় বেশি ব্যয়ের তথ্য পাওয়া গেছে। ২০২১ সালের সৌর প্রকল্পে ঠিকাদারের দর বাজারদর ও একই খাতের তুলনামূলক ব্যয়ের চেয়ে ৩৬ শতাংশ পর্যন্ত বেশি ছিল। ২০২৩ সালে স্পষ্ট ব্যাখ্যা ছাড়াই চুক্তির দর ১৯ থেকে ২৫ শতাংশ বাড়ানো হয়, যার ফলে অতিরিক্ত ২,৯৪,৮৪০ মার্কিন ডলার খরচ হয়। নির্মাণ কাঠামোর আওতায় বৈদ্যুতিক কাজের ব্যয় বাজারদরের তুলনায় প্রায় ১০ শতাংশ বেশি ছিল, যার ফলে ১৫ লাখ মার্কিন ডলারের ক্ষতি হয়। আরও গুরুতর বিষয় হলো, একই প্রতিষ্ঠানকে সম্ভাব্যতা যাচাই, নকশা প্রস্তুত এবং বৈদ্যুতিক স্থাপনার বাস্তবায়ন—সব কাজেই যুক্ত করা হয়েছে, যা স্বার্থের সংঘাতের স্পষ্ট ঝুঁকি তৈরি করে।

    মানবিক সহায়তায় স্বার্থের সংঘাত শুধু নীতিগত সমস্যা নয়; এটি অর্থের কার্যকারিতা নষ্ট করে। যে প্রতিষ্ঠান নিজেই সম্ভাব্যতা যাচাই করে, নিজেই নকশা বানায় এবং নিজেই বাস্তবায়ন করে, সেখানে স্বাধীন মূল্যায়নের সুযোগ সংকুচিত হয়। ফলে ব্যয় বাড়ে, জবাবদিহি কমে এবং প্রকল্পের মান নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়।

    এই নিরীক্ষার গুরুত্ব এখানেই যে, রোহিঙ্গা সহায়তা কার্যক্রম এখন তীব্র অর্থসংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আন্তর্জাতিক দাতাদের অনুদান কমেছে। খাদ্য সহায়তা কমানোর চাপ তৈরি হয়েছে, স্বাস্থ্যসেবা ঝুঁকিতে পড়েছে, শিশুদের শিক্ষা কার্যক্রম অনিশ্চয়তায় আছে এবং শিবিরে মৌলিক সেবা চালু রাখতেই সংস্থাগুলো হিমশিম খাচ্ছে।

    এমন সময়ে প্রতিটি অপ্রয়োজনীয় ব্যয় সরাসরি মানবিক ক্ষতিতে রূপ নেয়। ৮০,০০০ মার্কিন ডলার অচল গাড়ির ভাড়ায় গেলে সেটি আর ওষুধ কেনায় যায় না। ১৩ লাখ ২০ হাজার মার্কিন ডলারের অব্যবহৃত রান্নাঘরের সামগ্রী মানে সেই অর্থ খাদ্য, আশ্রয় বা শিশু শিক্ষায় ব্যয় হয়নি। ১৫ লাখ মার্কিন ডলারের হাসপাতাল ব্যবহৃত না হলে সেটি কাগজে স্বাস্থ্যসেবা, কিন্তু বাস্তবে শূন্য প্রতিশ্রুতি।

    রোহিঙ্গা পরিবারগুলো কোনো পরিসংখ্যান নয়। তারা এমন মানুষ, যাদের ঘর নেই, নাগরিক অধিকার নেই, নিরাপদ ভবিষ্যৎ নেই। তাদের জীবনে প্রতিটি সহায়তার মূল্য আছে। একটি খাদ্য প্যাকেট, একটি চিকিৎসা সেবা, একটি স্কুলঘর, একটি নিরাপদ আশ্রয়—এসবই তাদের দৈনন্দিন বেঁচে থাকার সঙ্গে জড়িত। তাই ত্রাণের অর্থ অপচয় হলে ক্ষতিটা কোনো দপ্তরের হিসাবের খাতায় আটকে থাকে না; তা পৌঁছে যায় মানুষের পাতে, শিশুর শ্রেণিকক্ষে, রোগীর বিছানায় এবং মায়ের নিরাপত্তাহীনতায়।

    এই অনিয়মের আরেকটি বড় ক্ষতি হলো আস্থার সংকট। আন্তর্জাতিক সহায়তা মূলত জনসাধারণের করের টাকা, দাতাদের প্রতিশ্রুতি এবং মানবিক দায়িত্ববোধের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। দাতা সরকারগুলো অর্থ দেয় এই বিশ্বাসে যে, তা সততা ও দক্ষতার সঙ্গে মানুষের কাজে লাগবে। কিন্তু যখন নিরীক্ষায় দুর্বল আর্থিক নিয়ন্ত্রণ, অকার্যকর প্রকল্প, বেশি দামে চুক্তি, একক ঠিকাদারের ওপর নির্ভরতা এবং অব্যবহৃত সম্পদের চিত্র উঠে আসে, তখন সেই বিশ্বাস নড়বড়ে হয়।

    দাতারা যদি মনে করেন অর্থ সঠিকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে না, তারা সহায়তা কমাতে পারেন। এর প্রথম আঘাত কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থার ওপর পড়বে না; পড়বে রোহিঙ্গা শিবিরের মানুষের ওপর। খাদ্য বরাদ্দ কমবে, স্বাস্থ্যসেবা সীমিত হবে, শিশুদের শিক্ষা বন্ধ হতে পারে, নারী ও শিশু সুরক্ষা কর্মসূচি দুর্বল হবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের ওপর চাপ আরও বাড়বে, কারণ এত বড় শরণার্থী জনগোষ্ঠীর দায় একা বহন করা কোনোভাবেই সহজ নয়।

    তাই এই বিষয়টি শুধু জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থার অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনার প্রশ্ন নয়; এটি আন্তর্জাতিক মানবিক ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্ন। যারা দুর্ভোগ লাঘবের নামে কাজ করে, তাদের জবাবদিহির মান আরও কঠোর হওয়া উচিত। কারণ তাদের হাতে থাকা অর্থ সাধারণ উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ নয়; এটি এমন অর্থ, যা ক্ষুধার্ত, আশ্রয়হীন, অসুস্থ ও অধিকারহীন মানুষের জন্য বরাদ্দ।

    সংস্থাটি নিরীক্ষার অনেক পর্যবেক্ষণ স্বীকার করেছে এবং সংশোধনমূলক পদক্ষেপ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। কিন্তু শুধু প্রতিশ্রুতি যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন প্রকাশ্য ও নির্ভরযোগ্য জবাবদিহি। কোন সুপারিশ বাস্তবায়িত হলো, কোন চুক্তি পুনর্মূল্যায়ন করা হলো, কোন অব্যবহৃত সম্পদ ব্যবহারযোগ্য করা হলো, কোন ব্যয় বন্ধ করা হলো এবং ভবিষ্যতে একই ভুল ঠেকাতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হলো—এসব তথ্য পরিষ্কারভাবে প্রকাশ করা দরকার।

    প্রকল্প পরিকল্পনায় শরণার্থীদের মতামতকে গুরুত্ব দিতে হবে। ক্রয় ও দরপত্র প্রক্রিয়ায় প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করতে হবে। বাজারদরের সঙ্গে তুলনা বাধ্যতামূলক করতে হবে। একই প্রতিষ্ঠানের হাতে পরামর্শ, নকশা ও বাস্তবায়নের মতো পরস্পর সংশ্লিষ্ট কাজ তুলে দেওয়া বন্ধ করতে হবে। অচল সম্পদ, অপ্রয়োজনীয় যানবাহন, অব্যবহৃত ভবন ও অতিরিক্ত মজুতের তালিকা প্রকাশ করে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

    রোহিঙ্গা সংকটের রাজনৈতিক সমাধান এখনো অনিশ্চিত। প্রত্যাবাসন দীর্ঘদিন ধরে আটকে আছে। শিবিরে জন্ম নেওয়া একটি প্রজন্ম বড় হচ্ছে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ নিয়ে। এমন বাস্তবতায় আন্তর্জাতিক সহায়তা শুধু দয়া নয়; এটি বেঁচে থাকার ন্যূনতম ভরসা। সেই ভরসাকে দুর্বল করার অধিকার কোনো সংস্থা, কোনো ঠিকাদার, কোনো প্রশাসনিক স্তরের নেই।

    মানবিক সহায়তার আসল পরীক্ষা বড় বাজেট নয়, বরং কতটা অর্থ সত্যিকারের প্রয়োজনীয় মানুষের কাছে পৌঁছাল। কাগজে প্রকল্পের সংখ্যা বাড়ল কি না, সেটাই মূল কথা নয়; মূল কথা হলো শিশু খাবার পেল কি না, রোগী চিকিৎসা পেল কি না, পরিবার নিরাপদ আশ্রয় পেল কি না, নারী সুরক্ষা পেল কি না, শিক্ষার্থী শেখার সুযোগ পেল কি না।

    রোহিঙ্গা সহায়তায় অপচয়ের এই চিত্র আমাদের মনে করিয়ে দেয়, দুর্বল মানুষের জন্য বরাদ্দ অর্থের প্রতিটি অংশের নৈতিক মূল্য আছে। যে এক ডলার অপচয় হয়, তা হয়তো কারও একবেলার খাবার, কারও ওষুধ, কারও শিক্ষাসামগ্রী, কারও নিরাপদ রান্নার জ্বালানি হতে পারত।

    তাই এখন সবচেয়ে জরুরি কাজ হলো স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং দ্রুত সংশোধন। কারণ অপচয়ের মাশুল দাতা বা দপ্তর দেয় না। সেই মূল্য দেয় শরণার্থী পরিবারগুলো—যাদের জীবন এখনো অনিশ্চয়তা, বঞ্চনা এবং অপেক্ষার ওপর দাঁড়িয়ে আছে।

    Share. Facebook Twitter LinkedIn Email Telegram WhatsApp Copy Link

    সম্পর্কিত সংবাদ

    বাংলাদেশ

    সমাজসেবা অধিদপ্তরের ক্ষুদ্রঋণ কর্মসূচিতে ১৪ কোটি ৭৯ লাখ টাকা ছাড়

    জুলাই 4, 2026
    বাংলাদেশ

    কর্মসংস্থানের নতুন যুগে বাংলাদেশ কতটা প্রস্তুত

    জুলাই 4, 2026
    বাংলাদেশ

    এইচএসসি কেন্দ্রে অভিভাবকদের জন্য শিক্ষা বোর্ডের নতুন নির্দেশনা

    জুলাই 4, 2026
    একটি মন্তব্য করুন Cancel Reply

    সর্বাধিক পঠিত

    ইস্পাত শিল্প তীব্র সংকটে উৎপাদন বন্ধের পথে

    অর্থনীতি অক্টোবর 16, 2024

    আইএমএফের রিপোর্টে ঋণের নতুন রেকর্ড পৌছালো ১০০ ট্রিলিয়ন ডলারে

    অর্থনীতি অক্টোবর 16, 2024

    নতুন বাণিজ্য কৌশলে আরসেপে যুক্ত হতে চায় বাংলাদেশ

    অর্থনীতি অক্টোবর 16, 2024

    অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার পেলেন তিন আমেরিকান অর্থনীতিবিদ

    অর্থনীতি অক্টোবর 16, 2024
    সংযুক্ত থাকুন
    • Facebook
    • Twitter
    • Instagram
    • YouTube
    • Telegram
    ‘হাম ব্যবস্থাপনায় সরকারের গৃহীত পদক্ষেপ সমূহ কি পর্যাপ্ত ছিল, আপনি কি মনে করেন?

    EMAIL US

    contact@citizensvoicebd.com

    FOLLOW US

    Facebook YouTube X (Twitter) LinkedIn
    • About Us
    • Contact Us
    • Terms & Conditions
    • Comment Policy
    • Advertisement
    • About Us
    • Contact Us
    • Terms & Conditions
    • Comment Policy
    • Advertisement

    WhatsApp

    01339-517418

    Copyright © 2026 Citizens Voice All rights reserved

    Type above and press Enter to search. Press Esc to cancel.