মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা যখন আগেই চাপের মুখে, তখন নতুন করে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে ‘সুপার’ এল নিনো। অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কা, এই জলবায়ুগত ঘটনা বিশ্বজুড়ে খাদ্য উৎপাদন ও সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি করতে পারে। এর প্রভাব শুধু চলতি বছরেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং ২০২৮ সাল পর্যন্ত খাদ্যপণ্যের দাম ও মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ বজায় থাকতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন পরিস্থিতি কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর জন্যও নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে। মূল্যস্ফীতির চাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে অনেক দেশকে দীর্ঘ সময় উচ্চ সুদের হার বজায় রাখতে হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ওসেনিক অ্যান্ড অ্যাটমোস্ফিয়ারিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (নোয়া)-এর পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, ২০২৬-২৭ সালের এল নিনো চক্রের কারণে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে বন্যা ও খরার ঝুঁকি বাড়তে পারে। এর ফলে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি খাদ্য সরবরাহেও বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে। সম্ভাব্য তীব্রতার কারণে জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা একে ‘সুপার’ বা ‘গডজিলা’ এল নিনো হিসেবে উল্লেখ করছেন।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বিনিয়োগ ব্যাংক গোল্ডম্যান স্যাক্সের বিশ্লেষকদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এল নিনোর প্রভাব ইতোমধ্যেই কৃষি খাতে দেখা দিতে শুরু করেছে। ভারতে চলতি বর্ষা মৌসুম স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক শুষ্ক। কয়েকটি অঞ্চলে স্বাভাবিক বৃষ্টিপাতের মাত্র ২৫ শতাংশ বৃষ্টি হয়েছে। মধ্য ভারতের কিছু এলাকাতেও বৃষ্টিপাত স্বাভাবিকের প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। এতে গম, চাল ও আখের উৎপাদন এবং সরবরাহ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
গোল্ডম্যান স্যাক্সের হিসাব বলছে, এই পরিস্থিতির কারণে বিশ্ববাজারে খাদ্যপণ্যের দাম সর্বোচ্চ ১৫ দশমিক ৮ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। তবে জলবায়ুর প্রভাব অর্থনীতিতে পুরোপুরি দৃশ্যমান হতে কিছুটা সময় লাগবে। বিশ্লেষকদের ধারণা, ২০২৮ সালের জুলাই থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে এর পূর্ণ প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে।
তবে আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি হলেও প্রতিটি দেশের খুচরা বাজারে তার প্রভাব একই রকম হবে না। স্থানীয় কৃষিনীতি, সরকারি পদক্ষেপ, ভোক্তাদের চাহিদা এবং খুচরা বাজারের মূল্য নির্ধারণের কৌশলের ওপর চূড়ান্ত পরিস্থিতি অনেকাংশে নির্ভর করবে। ইতালির ব্যাংক ইউনিক্রেডিটের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ‘সুপার’ এল নিনোর কারণে বৈশ্বিক কৃষি উৎপাদন প্রায় ১৪ দশমিক ৩ শতাংশ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। আর্থিক হিসাবে যার পরিমাণ প্রায় ৩৪ হাজার ২০০ কোটি মার্কিন ডলারের সমান।
ব্যাংকটির মতে, প্রধান খাদ্যপণ্যের দাম ১০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে। সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়তে পারে চাল, পাম অয়েল, চিনি ও কফির মতো পণ্যে। এসব পণ্যের মূল্য ৫০ থেকে ১০০ শতাংশ, এমনকি তারও বেশি বাড়তে পারে। এই পরিস্থিতিকে অর্থনীতিবিদরা ‘ক্লাইমেটফ্লেশন’ বা জলবায়ুজনিত মূল্যস্ফীতির নতুন ধাপ হিসেবে দেখছেন।
অন্যদিকে সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বহুজাতিক ব্যাংক ইউবিএসের বিশ্লেষকদের মতে, এল নিনোর প্রভাব সব অঞ্চলে এক ধরনের হয় না। এটি বৈশ্বিক বৃষ্টিপাত ও তাপমাত্রার স্বাভাবিক ধারা বদলে দেয়। ফলে কিছু অঞ্চল কৃষি উৎপাদনে ক্ষতির মুখে পড়লেও অন্য কিছু এলাকা তুলনামূলকভাবে অনুকূল আবহাওয়ার সুবিধা পেতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় দীর্ঘস্থায়ী খরা দেখা দিলে পাম অয়েলের উৎপাদন কমে যেতে পারে। যেহেতু পাম অয়েল বহু প্রক্রিয়াজাত খাদ্যের অন্যতম প্রধান কাঁচামাল, তাই এর প্রভাব আন্তর্জাতিক খাদ্যবাজারেও পড়বে। একই সঙ্গে উষ্ণ ও আর্দ্র পরিবেশ বিভিন্ন রোগবালাইয়ের বিস্তার বাড়িয়ে কৃষি উৎপাদন আরও কমিয়ে দিতে পারে।
ইতিহাসও একই ধরনের সতর্কবার্তা দেয়। অতীতের শক্তিশালী এল নিনো ঘটনাগুলো বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কৃষি উৎপাদন ও খাদ্য সরবরাহে বড় ধরনের সংকট তৈরি করেছিল। এক শতাব্দীরও বেশি আগে সংঘটিত ভয়াবহ এক এল নিনোর সময় চীন, দক্ষিণ আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চল, ব্রাজিল, মিসর ও ভারতে তীব্র খরা দেখা দেয়। ঔপনিবেশিক শাসনের প্রেক্ষাপটে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে দুর্ভিক্ষে রূপ নেয়। শুধু ভারতে ১৮৭৬ থেকে ১৮৭৮ সালের মধ্যে ৬০ লাখেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছিল বলে ইতিহাসে উল্লেখ রয়েছে।
আধুনিক সময়েও ১৯৮১-৮২, ১৯৯৬-৯৭, ২০১৫-১৬ এবং ২০২৩-২৪ সালের এল নিনো চক্রগুলো ইতিহাসের সবচেয়ে শক্তিশালী ঘটনাগুলোর মধ্যে স্থান পেয়েছে। তাই নতুন ‘সুপার’ এল নিনোর সম্ভাবনাকে ঘিরে খাদ্য নিরাপত্তা ও বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি নিয়ে উদ্বেগ আরও জোরালো হচ্ছে।

