পারস্য উপসাগরকে ঘিরে চলমান সংঘাতের প্রভাব এখন শুধু জ্বালানি বাজারেই সীমাবদ্ধ নেই। এর প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক সার সরবরাহ ব্যবস্থার ওপরও। বিশেষ করে ইউরিয়া ও ফসফেট সারের আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা দেখা দেওয়ায় এশিয়া ও আফ্রিকার বহু দেশ বড় ধরনের সংকটের মুখে পড়তে পারে বলে সতর্ক করেছে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (ডব্লিউটিও)।
ডব্লিউটিওর ওয়েবসাইটে গত শুক্রবার প্রকাশিত এক ব্লগে বলা হয়েছে, সংঘাতের কারণে সার পরিবহন ও সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে। এর ফলে অনেক দেশ সারস্বল্পতা ও মূল্যবৃদ্ধির ঝুঁকিতে রয়েছে, যা শেষ পর্যন্ত বৈশ্বিক খাদ্য নিরাপত্তার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃষি উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় সার সময়মতো না পাওয়া গেলে কিংবা অতিরিক্ত দামে কিনতে হলে ফসলের উৎপাদন কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। এর সরাসরি প্রভাব পড়বে খাদ্যপণ্যের বাজারে। একই সঙ্গে জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন দেখা দিলে খাদ্য পরিবহন ও সরবরাহ ব্যবস্থাও আরও চাপে পড়তে পারে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বৈশ্বিক সার বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রুট হলো হরমুজ প্রণালি। যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে এই জলপথ দিয়ে সারবাহী জাহাজের চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। সংঘাত শুরুর পর থেকে এই রুট দিয়ে বহির্মুখী সারের চালান কার্যত শূন্যে নেমে এসেছে এবং এখন পর্যন্ত পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার কোনো সুস্পষ্ট লক্ষণ দেখা যায়নি। বিশ্বের নাইট্রোজেন সারের প্রায় ২৫ শতাংশ এবং ফসফেট সারের প্রায় ১১ শতাংশ সরবরাহ আসে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে। ফলে এই অঞ্চলের সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে এর প্রভাব দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে।
সংঘাত শুরুর পরপরই ইউরিয়া সারের দামে বড় ধরনের উল্লম্ফন দেখা যায়। প্রতি টনের দাম ৪০০ ডলার থেকে বেড়ে একসময় ৮৫০ ডলারে পৌঁছে যায়। পরে গত জুনে তা কমে ৪৫৩ ডলারে নেমে এলেও বাজারে অনিশ্চয়তা এখনও কাটেনি। একই সময়ে ডিএপি বা ফসফেট সারের দামও প্রতি টনে ৫৮০ ডলার থেকে বেড়ে ৭৭০ ডলারে পৌঁছায়।
ডব্লিউটিওর মূল্যায়নে, এ সংকটে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে ভারত, থাইল্যান্ড, নেপাল ও শ্রীলঙ্কার মতো দেশ। ভারতের প্রয়োজনীয় নাইট্রোজেন সারের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই আসে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে। একইভাবে আফ্রিকার মালাউই, মোজাম্বিক, কেনিয়া ও তানজানিয়াও সারের জন্য এই অঞ্চলের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। ফলে সরবরাহ দীর্ঘমেয়াদে ব্যাহত হলে এসব দেশের কৃষি উৎপাদনে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি হতে পারে।
এদিকে বৈশ্বিক বাজারে ঘাটতি সামাল দিতে কয়েকটি প্রধান উৎপাদনকারী দেশ সারের রপ্তানিতে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে। চীন ও রাশিয়া রপ্তানি কমিয়ে দিয়েছে অথবা বিশেষ লাইসেন্সের মাধ্যমে সীমিত রপ্তানির ব্যবস্থা চালু করেছে। ডব্লিউটিওর তথ্য অনুযায়ী, এসব পদক্ষেপের কারণে বিশ্ব সারের বাণিজ্যের প্রায় ১৫ থেকে ২৩ শতাংশ পর্যন্ত প্রভাবিত হচ্ছে।
হরমুজ প্রণালিতে চলাচল ব্যাহত হওয়ায় সৌদি আরব বিকল্প হিসেবে লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দর ব্যবহার করে সার রপ্তানির চেষ্টা করছে। তবে এই বিকল্প পথের সক্ষমতা সীমিত এবং পরিবহন ব্যয়ও তুলনামূলক বেশি। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ সংকট পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হচ্ছে না।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে সারবাজারে অস্থিরতা আরও বাড়তে পারে। এর প্রভাব কৃষি উৎপাদন, খাদ্যের মূল্য এবং বৈশ্বিক খাদ্য নিরাপত্তার ওপর দীর্ঘমেয়াদে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

