টানা বৃষ্টি এবং উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের কারণে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে, বিশেষ করে পার্বত্য এলাকায়, কৃষিখাতে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির চিত্র দেখা দিয়েছে। পানিতে তলিয়ে গেছে আউশ ধান, আমনের বীজতলা, পাট, গ্রীষ্মকালীন সবজি, মরিচ, আদা, হলুদ, বিভিন্ন ফলসহ নানা ধরনের কৃষিজ ফসল। ফলে আসন্ন মৌসুমের উৎপাদন নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
কৃষি বিভাগের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, গতকাল শনিবার (১১ জুলাই) পর্যন্ত দেশের ১২টি জেলায় ২৮ হাজার ৬১০ হেক্টরের বেশি জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একই সঙ্গে প্রায় ৫ লাখ হেক্টর জমির দণ্ডায়মান ফসল এখনো পানির নিচে বা জলাবদ্ধ অবস্থায় রয়েছে, যা পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে।
ক্ষতিগ্রস্ত জেলার তালিকায় রয়েছে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান, সুনামগঞ্জ, সিরাজগঞ্জ, হবিগঞ্জ, নওগাঁ, যশোর, চুয়াডাঙ্গা ও মেহেরপুর। এরই মধ্যে আবহাওয়া অধিদপ্তর রোববার দেশের ছয় বিভাগে অতিভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস দিয়েছে। রংপুর, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগে ভারী থেকে অতিভারী বর্ষণের আশঙ্কা থাকায় বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
কৃষি বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, বর্তমান পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে দেশের কৃষি উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে পানিতে দীর্ঘ সময় ডুবে থাকা ফসল নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে।
শুধু কৃষিই নয়, বন্যার প্রভাব পড়েছে মৎস্যখাতেও। চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন এলাকায় পুকুর ও চিংড়ির ঘের প্লাবিত হওয়ায় বিপুল পরিমাণ মাছ ভেসে গেছে। জেলা মৎস্য অফিসের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রামের ১৫টি উপজেলার ১৫৩টি ইউনিয়নে ৯ হাজার ৯৩৩টি পুকুর ও দিঘি এবং ৩২০টি চিংড়ি ঘের ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে প্রায় ৪ হাজার ১০০ হেক্টর জলাশয়ে মাছ চাষ ক্ষতির মুখে পড়েছে।
এদিকে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সহায়তায় মাঠপর্যায়ে কাজ শুরু করেছে কৃষি মন্ত্রণালয়। ইউনিয়ন ও ওয়ার্ডভিত্তিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে মন্ত্রণালয়। শনিবার সকালে কুমিল্লায় কৃষি ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ ইয়াছিন বলেন, ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা প্রস্তুত হওয়ার পর সরকার প্রয়োজনীয় সহায়তা দেবে।
তবে চলমান বন্যায় কৃষিখাতে অতিরিক্ত ক্ষতির আশঙ্কা তিনি দেখছেন না। তাঁর ভাষ্য, বোরো ধান ইতোমধ্যে ঘরে তোলা হয়েছে। নতুন করে রোপণ করা চারার বড় ধরনের ক্ষতি হয়নি। তবে যেসব চারা দীর্ঘ সময় পানির নিচে থাকবে, সেগুলো পচে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাঁর মতে, এ পর্যন্ত রোপণ করা চারার প্রায় ২৫ শতাংশ বন্যার প্রভাবে আক্রান্ত হয়েছে।
মন্ত্রী আরও জানান, কোথায় কত জমি প্লাবিত হয়েছে এবং পুনরায় রোপণের জন্য কত চারা প্রয়োজন হবে—এসব তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। সম্ভাব্য চারা সংকট মোকাবিলায় উঁচু এলাকায় চারা উৎপাদনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কৃষকদের ঘরে বীজ না থাকলেও সরকার প্রয়োজনীয় চারা সরবরাহের প্রস্তুতি নিয়েছে।
অন্যদিকে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের আশঙ্কা, যদি আরও চার থেকে পাঁচ দিন পানি স্থায়ী হয়, তাহলে আউশ ধান ও মৌসুমি সবজির বড় অংশ সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যেতে পারে। এতে কৃষকদের আর্থিক ক্ষতি যেমন বাড়বে, তেমনি ভবিষ্যতে কৃষিপণ্যের সরবরাহেও প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

