বাংলাদেশ সরকারের মোট ঋণের পরিমাণ ২২ লাখ ৬ হাজার ৪৬৬ কোটি টাকায় পৌঁছেছে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেন, সরকারের ঋণ ব্যবস্থাপনাকে আরও টেকসই ও ঝুঁকিমুক্ত করতে রাজস্ব আয় বাড়ানো, স্বল্পসুদে বৈদেশিক ঋণ গ্রহণ এবং বিকল্প অর্থায়নের উৎস সম্প্রসারণে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
রোববার (১২ জুলাই) জাতীয় সংসদের অধিবেশনে সংসদ সদস্য মো. গোলাম রুহুলের এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী এ তথ্য তুলে ধরেন। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম।
অর্থমন্ত্রী জানান, ২০২৫ সালের ১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সরকারের মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২২ লাখ ৬ হাজার ৪৬৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ ১ লাখ ৫৯ হাজার ৩১১ কোটি টাকা এবং অভ্যন্তরীণ ঋণের পরিমাণ ১২ লাখ ৪৭ হাজার ১৫১ কোটি টাকা।
তিনি বলেন, অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভরতা ধীরে ধীরে কমিয়ে আনতে সরকার কর ও কর-বহির্ভূত রাজস্ব আদায় বৃদ্ধির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। চলতি অর্থবছরে রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত প্রায় ১০ দশমিক ৪ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। রাজস্ব সংগ্রহ বাড়ানো গেলে বাজেট ঘাটতি পূরণে ঋণের প্রয়োজনও কমে আসবে বলে সরকারের প্রত্যাশা।
ঋণ ব্যবস্থাপনাকে আরও কার্যকর ও পরিকল্পিত করতে সরকার মধ্যমেয়াদি ঋণ ব্যবস্থাপনা কৌশল গ্রহণ করেছে বলেও জানান অর্থমন্ত্রী। তার ভাষ্য, এই কৌশলের মাধ্যমে ঋণ গ্রহণ, পরিশোধ এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার পুরো প্রক্রিয়াকে আরও সুসংগঠিত করা হবে। একই সঙ্গে ঋণ ব্যবস্থাপনার ব্যয় কমানো এবং দীর্ঘমেয়াদে আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করাও এর অন্যতম লক্ষ্য।
তিনি আরও বলেন, সরকার ধীরে ধীরে ঋণনির্ভর অর্থনৈতিক কাঠামো থেকে বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতির দিকে এগোতে চায়। সরকারি বিনিয়োগের কার্যকারিতা ও রিটার্ন বাড়ানো গেলে অর্থনীতিতে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পাবে, রাজস্ব আদায় বাড়বে এবং নতুন ঋণ নেওয়ার প্রয়োজনও কমে আসবে।
সুদ ব্যয়ের চাপ নিয়ন্ত্রণে অর্থায়নের উৎস বৈচিত্র্যময় করার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে বলে জানান অর্থমন্ত্রী। এ লক্ষ্যে সুকুক, সম্পদভিত্তিক সিকিউরিটাইজেশন এবং অন্যান্য বিকল্প অর্থায়ন ব্যবস্থার ব্যবহার সম্প্রসারণে সরকার কাজ করছে।
বৈদেশিক ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রেও সতর্ক অবস্থানের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, বাংলাদেশ দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে ঋণ নিলেও অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে স্বল্পসুদে, দীর্ঘমেয়াদি এবং সহজ শর্তের ঋণকে। এতে ঋণ পরিশোধের চাপ তুলনামূলকভাবে কম থাকে এবং অর্থনীতির ওপর অতিরিক্ত বোঝা সৃষ্টি হয় না।
অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের ক্রমবর্ধমান চাপ মোকাবিলায় অর্থ বিভাগ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করছে বলেও জানান তিনি। এর মধ্যে রয়েছে ঋণের স্থায়িত্ব ও ঝুঁকি মূল্যায়নে নিয়মিত বিশ্লেষণ পরিচালনা, রপ্তানি আয় ও প্রবাসী আয় বাড়ানোর উদ্যোগ জোরদার করা, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করা এবং সরকারি গ্যারান্টিযুক্ত ঋণ ও রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের দায়-দেনার ওপর আরও নিবিড় নজরদারি।
অর্থনীতিবিদদের মতে, ঋণের পরিমাণের পাশাপাশি এর ব্যবহার, সুদের হার, পরিশোধ সক্ষমতা এবং ঋণের বিপরীতে উৎপাদনশীল বিনিয়োগ নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সঠিক পরিকল্পনা ও কার্যকর ঋণ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ঋণের চাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হলেও রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা দীর্ঘমেয়াদে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।

