সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের মাধ্যমে সরকারের রাজস্ব আদায় দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ১০ হাজার ৩৯০ কোটি টাকা। যদিও অর্থবছরের জন্য নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৫ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকা। একই সঙ্গে কর ফাঁকি প্রতিরোধে মামলা, অডিট, ডিজিটাল কাস্টমস ব্যবস্থার সম্প্রসারণ এবং কর অব্যাহতি কমানোর মতো একাধিক পদক্ষেপ বাস্তবায়নের কথা জানিয়েছে সরকার।
রোববার (১২ জুলাই) জাতীয় সংসদে এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী দেশের রাজস্ব আহরণ, কর ফাঁকি প্রতিরোধ এবং ভবিষ্যৎ রাজস্ব বৃদ্ধির পরিকল্পনা তুলে ধরেন। যশোর-৪ আসনের সংসদ সদস্য মো. গোলাম রছুলের প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব তথ্য দেন।
অর্থমন্ত্রী জানান, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল ৫ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকা। তবে প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী অর্থবছর শেষে মোট ৪ লাখ ১০ হাজার ৩৯০ কোটি টাকা রাজস্ব সংগ্রহ করা সম্ভব হয়েছে। এই পরিসংখ্যান সাময়িক এবং পরবর্তী সময়ে চূড়ান্ত হিসাবের ভিত্তিতে কিছু পরিবর্তন হতে পারে।
কর ফাঁকির বিরুদ্ধে সরকারের অবস্থান আরও কঠোর করা হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, কাস্টমস-সংক্রান্ত কর ফাঁকির অভিযোগে এ পর্যন্ত ১ হাজার ৭০২টি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে। পাশাপাশি দ্রুত বিচারিক কার্যক্রম পরিচালনার মাধ্যমে ১ হাজার ২৯২টি মামলার নিষ্পত্তিও সম্পন্ন হয়েছে।
রাজস্ব আহরণ আরও বাড়াতে সরকার বহুমুখী কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে বলেও জানান অর্থমন্ত্রী। তার ভাষ্য, কর ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর, স্বচ্ছ এবং প্রযুক্তিনির্ভর করতে একদিকে যেমন অপ্রয়োজনীয় কর অব্যাহতি কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, অন্যদিকে কর ফাঁকি শনাক্ত ও বকেয়া আদায়ে নজরদারিও জোরদার করা হচ্ছে।
তিনি জানান, কর ব্যয় নীতি ও ব্যবস্থাপনা কাঠামো পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়নের মাধ্যমে বিভিন্ন খাতে দেওয়া কর ছাড় পর্যায়ক্রমে সীমিত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এর পাশাপাশি পোস্ট ক্লিয়ারেন্স অডিট জোরদার, দীর্ঘদিনের ঝুলে থাকা মামলা নিষ্পত্তি, বকেয়া রাজস্ব আদায়, নিলাম কার্যক্রম গতিশীল করা, ব্যাংক গ্যারান্টি নগদায়ন, অনিষ্পন্ন আমদানি চালান দ্রুত নিষ্পত্তি এবং বিলম্বিত পরিশোধ ব্যবস্থার আওতায় থাকা রাজস্ব দ্রুত আদায়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
কাস্টমস কার্যক্রমকে আরও আধুনিক করতে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। এ লক্ষ্যে অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ডভিত্তিক কাস্টমস ব্যবস্থা, ই-পেমেন্ট, ই-ফাইলিং এবং স্বয়ংক্রিয় ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে কাস্টমস কার্যক্রমে স্বচ্ছতা বৃদ্ধি, সময় সাশ্রয় এবং রাজস্ব ফাঁকি কমিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
অর্থমন্ত্রী আরও জানান, খাতভিত্তিক শুল্ক ও কর অব্যাহতির বিভিন্ন প্রজ্ঞাপন ধাপে ধাপে প্রত্যাহারের পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে বিলাসবহুল পণ্য এবং জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর পণ্যের ওপর শুল্ক ও করের হার বাড়ানোর বিষয়টিও সরকারের নীতিগত পরিকল্পনার অংশ।
অর্থনীতিবিদদের মতে, রাজস্ব আহরণ বাড়ানো সরকারের আর্থিক সক্ষমতা শক্তিশালী করার অন্যতম প্রধান শর্ত। রাজস্ব সংগ্রহ বৃদ্ধি পেলে বাজেট ঘাটতি মোকাবিলায় ঋণের ওপর নির্ভরতা কমবে এবং উন্নয়ন ব্যয় নির্বাহে সরকারের সক্ষমতাও বাড়বে। তবে লক্ষ্যমাত্রা ও প্রকৃত আদায়ের মধ্যে ব্যবধান কমাতে করজাল সম্প্রসারণ, কর প্রশাসনের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং কর ফাঁকি প্রতিরোধে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি আরও জোরদার করার প্রয়োজন রয়েছে।

