জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেন, ধনী ব্যক্তি ও বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানের কর ফাঁকি ঠেকাতে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি আরও শক্তিশালী করা হচ্ছে। একই সঙ্গে রাজস্ব ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়াতে করপোরেট করদাতাদের জন্য ই-রিটার্ন ব্যবস্থা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
গতকাল রোববার জাতীয় সংসদের প্রশ্নোত্তর পর্বে বিভিন্ন সদস্যের লিখিত প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব তথ্য তুলে ধরেন। নওগাঁ-৩ আসনের সংসদ সদস্য মো. ফজলে হুদার প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, সাধারণ মানুষের ওপর অতিরিক্ত করের চাপ না বাড়িয়ে কর আদায়ের পরিধি বাড়ানোই সরকারের লক্ষ্য। এজন্য উচ্চ আয়ের ব্যক্তি ও বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানের কর ফাঁকি রোধে বিশেষ পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
তিনি জানান, করপোরেট করদাতাদের জন্য খুব শিগগিরই ই-রিটার্ন ব্যবস্থা চালু বা সম্প্রসারণ করা হবে। পাশাপাশি করদাতাদের তথ্যভান্ডার আরও সমৃদ্ধ করতে সরকারের বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে এপিআই (এপিআই) সংযোগের মাধ্যমে তথ্য আদান-প্রদান ও সমন্বয়ের কাজ চলছে।
অর্থমন্ত্রীর ভাষ্য, সম্ভাব্য রাজস্ব নির্ধারণে ঝুঁকিভিত্তিক নিরীক্ষা ও অনুসন্ধান কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। অনলাইনে উৎসে কর কর্তনের আওতা বাড়ানোর পাশাপাশি ইচ্ছাকৃত কর ফাঁকিদাতাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
গাজীপুর-৫ আসনের সংসদ সদস্য এ কে এম ফজলুল হক মিলনের প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন পদক্ষেপের ফলে ২০২৫ সালের অক্টোবরে মূল্যস্ফীতি কমে ৮ দশমিক ১৭ শতাংশে নেমে এসেছিল। তবে আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ বাজারের প্রভাবে চলতি বছরের মে মাসে তা আবার বেড়ে ৯ দশমিক ৪২ শতাংশে পৌঁছেছে।
তিনি জানান, অতিরিক্ত চাহিদাজনিত মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে নীতি সুদহার ১০ শতাংশে অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে উৎপাদন বৃদ্ধি এবং সরবরাহব্যবস্থার সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশ ব্যাংক ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। এর মধ্যে ৪১ হাজার কোটি টাকা বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর অতিরিক্ত তারল্য থেকে এবং বাকি ১৯ হাজার কোটি টাকা বাংলাদেশ ব্যাংক সরবরাহ করবে। এ ছাড়া বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে বাজারভিত্তিক নমনীয় বিনিময় হার ব্যবস্থা চালু রাখা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
কুড়িগ্রাম-৩ আসনের সংসদ সদস্য মো. মাহবুবুল আলমের প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী জানান, নতুন উদ্যোক্তাদের সহায়তায় বাংলাদেশ ব্যাংকের পুনঃঅর্থায়ন তহবিল ১০০ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫০০ কোটি টাকা করা হয়েছে। এই তহবিল থেকে নতুন উদ্যোক্তারা বিনা জামানতে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ৭ শতাংশ সুদে ঋণ নিতে পারবেন। আর জামানতের বিপরীতে সর্বোচ্চ ৩৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণের সুযোগ থাকবে।
এ ছাড়া স্টার্টআপ উদ্যোক্তাদের জন্য ৫০০ কোটি টাকার পৃথক পুনঃঅর্থায়ন তহবিল গঠন করা হয়েছে। এই তহবিল থেকে ৪ শতাংশ সুদে ঋণ পাওয়া যাবে। পাশাপাশি ৩৯টি তপশিলি ব্যাংকের অংশীদারিত্বে গঠিত বাংলাদেশ স্টার্টআপ ইনভেস্টমেন্ট কোম্পানির মাধ্যমে ইকুইটি সহায়তাও দেওয়া হবে।
সাবিকুন্নাহারের প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী জানান, গত ৩১ মে পর্যন্ত রাষ্ট্রায়ত্ত ৯টি ব্যাংকে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৮৮ হাজার ৭০১ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। তিনি বলেন, ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে সরকার স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে। এর আওতায় খেলাপি ঋণ কমাতে নতুন রেজল্যুশন কৌশল, আন্তর্জাতিক মানের ক্রেডিট ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, জামানত মূল্যায়নের আধুনিক পদ্ধতি এবং ঋণ আদায়ে কর্মকর্তাদের জন্য প্রণোদনা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
মো. মাহবুবুর রহমানের প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী জানান, মুজিববর্ষ উপলক্ষে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন, শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি ও বেদি নির্মাণ, সরকারি দপ্তরে ব্রোঞ্জ, তামা ও মার্বেল পাথরের ভাস্কর্য স্থাপন এবং রাষ্ট্রীয় সময় গণনার ডিজিটাল বোর্ড বসানোসহ বিভিন্ন খাতে সরকারের মোট ব্যয় হয়েছে ৯৮২ কোটি ৯১ লাখ ৭৪ টাকা। তিনি সংসদে এ ব্যয়ের বিস্তারিত বিবরণও উপস্থাপন করেন।
এ সময় অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, আগের প্রধানমন্ত্রীর এক বছরে খাবার বাবদ ব্যয় হয়েছিল ৩৫ কোটি টাকা। বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর ব্যয়ের সঙ্গে তুলনা করে তিনি মন্তব্য করেন, এ ধরনের ব্যয় কেবল একটি খাতেই সীমাবদ্ধ নয়, আরও বিভিন্ন ক্ষেত্রেও এমন ব্যয়ের নজির রয়েছে।
গাজীপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য সালাহউদ্দিন আইউবীর সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, দেশের অর্থ বিদেশে পাচার বা লুটপাট করে পালিয়ে যাওয়া ব্যক্তিদের বিষয়ে সরকার কোনো ধরনের ছাড় দেবে না।
তিনি জানান, সংশ্লিষ্ট অনেকের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে, তদন্ত অব্যাহত রয়েছে এবং সম্পত্তি ক্রোকের কার্যক্রমও শুরু হয়েছে। এ বিষয়ে সরকারের কঠোর অবস্থান ভবিষ্যতেও বহাল থাকবে।
অন্যদিকে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম সংসদে জানিয়েছেন, রাষ্ট্রীয় মোবাইল অপারেটর টেলিটক বাংলাদেশ লিমিটেডের নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণে সরকার কাজ করছে।শেখ মো. আব্দুল্লাহর প্রশ্নের জবাবে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, টেলিটক বিক্রির কোনো পরিকল্পনা সরকারের নেই।

