নির্মাণ শেষ হয়েছে ছয় বছর আগে। ব্যয় হয়েছে ৩১ কোটি ৪৮ লাখ টাকার বেশি। রয়েছে আধুনিক অবকাঠামো ও চিকিৎসা সরঞ্জামও। কিন্তু প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক অনুমোদন ও জনবল না থাকায় এখনো পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হয়নি রংপুরের ১০০ শয্যাবিশিষ্ট শিশু হাসপাতাল।
ফলে একদিকে রংপুর মেডিকেল কলেজ (রমেক) হাসপাতালের শিশু বিভাগে বাড়ছে রোগীর চাপ, অন্যদিকে পড়ে থেকে নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে নতুন হাসপাতালের মূল্যবান যন্ত্রপাতি। নিউমোনিয়া, শ্বাসকষ্টসহ বিভিন্ন জটিলতায় আক্রান্ত শিশুরা যেখানে পর্যাপ্ত জায়গা না পেয়ে মেঝেতে চিকিৎসা নিতে বাধ্য হচ্ছে, সেখানে নতুন ভবনের অধিকাংশ কক্ষই পড়ে আছে তালাবদ্ধ অবস্থায়।
নির্মাণ শেষ, কিন্তু চালুর অপেক্ষা শেষ হয়নি:
স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর (এইচইডি) রংপুর কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, রংপুর সিটি করপোরেশনের সামনে সদর হাসপাতালের ১ একর ৭৮ শতাংশ জমির ওপর নির্মাণ করা হয়েছে তিনতলা শিশু হাসপাতাল ভবন ও আবাসিক কোয়ার্টার। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ব্যয় হয়েছে ৩১ কোটি ৪৮ লাখ ৯২ হাজার ৮০৯ টাকা।
নথিপত্র অনুযায়ী, ২০২০ সালের ৮ মার্চ হাসপাতাল ভবনটি সিভিল সার্জনের কাছে হস্তান্তর করা হয়। তবে ওই সময় দেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শুরু হলে ভবনটি সাময়িকভাবে করোনা আইসোলেশন ওয়ার্ড হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
করোনা পরিস্থিতি শেষ হওয়ার পর ২০২৩ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন স্বাস্থ্যমন্ত্রী হাসপাতালটির উদ্বোধন করেন। তবে তখন পর্যন্ত ছিল না প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক অনুমোদন, তৈরি হয়নি জনবলের কাঠামো, বরাদ্দ হয়নি পরিচালন ব্যয়ের অর্থ। ফলে উদ্বোধনের পরও হাসপাতালটি কার্যকর চিকিৎসাকেন্দ্রে রূপ নিতে পারেনি।
রংপুর বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, হাসপাতালটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালুর জন্য ২০২৩ সালের ৫ জুন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে ৬৫৯ জনবল নিয়োগের প্রস্তাব পাঠানো হয়। প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়, হাসপাতালটি পরিচালনায় বছরে প্রয়োজন হবে ৪৬ কোটি ৫৬ লাখ ৩ হাজার ৬৩৮ টাকা। এরপর জেলা সিভিল সার্জন ও বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের কার্যালয় থেকে একাধিকবার তাগিদপত্র ও পরিদর্শন প্রতিবেদন পাঠানো হলেও এখনো চূড়ান্ত অগ্রগতি হয়নি।
গত ৩১ মে হাসপাতালটির অবকাঠামো পরিদর্শন করেন স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ডা. নাজমুল হোসেন। তিনি বলেন, দেশের স্বাস্থ্য খাতে এমন অনেক স্থাপনা রয়েছে, যেগুলো নির্মাণের পরও চালু হয়নি। এসব প্রতিষ্ঠান চালুর বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি জানান, রংপুরের শিশু হাসপাতালটি একটি ভালো অবকাঠামো। এটি চালু করা গেলে রংপুর বিভাগের শিশু চিকিৎসায় বড় সুবিধা হবে। প্রশাসনিক জটিলতা থাকলেও তা সমাধানের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করা হয়েছে এবং পরবর্তী সময়ে মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন দেওয়া হবে।
১০০ শয্যার হাসপাতাল চলছে মাত্র তিন কক্ষে:
পূর্ণাঙ্গ হাসপাতাল চালু না হওয়ায় ২০২৪ সালের ১০ জানুয়ারি স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের নির্দেশে এখানে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বর্ধিত বহির্বিভাগ চালু করা হয়। বর্তমানে হাসপাতালের নিচতলার মাত্র তিনটি কক্ষ ব্যবহার করে সীমিত পরিসরে চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, মূল ভবনের ওপরের তলার বেশির ভাগ কক্ষ তালাবদ্ধ। নিচতলায় একটি কক্ষে নার্সরা টিকিট দিচ্ছেন, অন্য কক্ষে দেওয়া হচ্ছে সরকারি ওষুধ। বন্ধ রয়েছে অভ্যর্থনা কক্ষও।
মাত্র ৯ জন কর্মী দিয়ে চলছে বহির্বিভাগের কার্যক্রম। এর মধ্যে রয়েছেন চারজন কনসালট্যান্ট ও দুইজন মেডিকেল অফিসার। প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত প্রায় ৭০ থেকে ৮০ জন শিশু এখানে চিকিৎসা নিতে আসে। তবে তারা মূলত চিকিৎসকের পরামর্শ ও ওষুধের প্রেসক্রিপশন ছাড়া বড় কোনো সেবা পাচ্ছে না।
সন্তানের চিকিৎসার জন্য আসা রংপুর সদর উপজেলার বাসিন্দা আল-আমিন ইসলাম বলেন, এখানে শুধু চিকিৎসক দেখিয়ে ওষুধের পরামর্শ দেওয়া হয়। কোনো পরীক্ষা-নিরীক্ষা বা নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (আইসিইউ) সুবিধা নেই। তিনি বলেন, সরকার এত টাকা ব্যয়ে হাসপাতাল নির্মাণ করেছে। কিন্তু মানুষ এখনো এর পূর্ণ সুবিধা পাচ্ছে না। ভবন ও যন্ত্রপাতি কাজে লাগিয়ে দ্রুত পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসাসেবা চালু করা প্রয়োজন।
২০০ শয্যায় উন্নীত করার পরিকল্পনা:
রংপুর বিভাগীয় স্বাস্থ্য উপপরিচালক ডা. মো. ওয়াজেদ আলী বলেন, হাসপাতালটি বর্তমানে ১০০ শয্যার অনুমোদনপ্রাপ্ত হলেও এটিকে ২০০ শয্যায় উন্নীত করার পরিকল্পনা নিয়ে কাজ চলছে। তিনি বলেন, রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিভাগে রোগীর চাপ অনেক বেশি। নতুন হাসপাতালটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হলে শিশু চিকিৎসার ক্ষেত্রে বড় পরিবর্তন আসবে।
তিনি আরও জানান, করোনা হাসপাতাল হিসেবে ব্যবহারের সময় এখানে ১০টি আইসিইউসহ বেশ কিছু যন্ত্রপাতি স্থাপন করা হয়েছিল। একটি কারিগরি কমিটির মাধ্যমে এসব যন্ত্রপাতি পরীক্ষা করা হয়েছে এবং সেগুলো সচল রয়েছে। নিয়মিতভাবে এগুলো পরীক্ষা করা হচ্ছে। তার ভাষ্য, হাসপাতাল চালুর জন্য জনবল সৃষ্টি ও অন্যান্য প্রশাসনিক বিষয় নিয়ে কাজ চলছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উদ্যোগে দ্রুত হাসপাতালটি চালু হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
ছয় বছর আগে নির্মিত একটি পূর্ণাঙ্গ শিশু হাসপাতাল এখনো কেবল সম্ভাবনার প্রতীক হয়ে আছে। অথচ রংপুর অঞ্চলের হাজারো শিশুর উন্নত চিকিৎসার প্রয়োজন প্রতিদিনই বাড়ছে।

