এলডিসি (স্বল্পোন্নত দেশ) থেকে উত্তরণের পর আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে প্রতিযোগিতা ধরে রাখতে নতুন উদ্যোগ নিচ্ছে বাংলাদেশ। রপ্তানি সক্ষমতা বৃদ্ধি, বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়ন এবং বৈশ্বিক বাজারে অবস্থান শক্তিশালী করার লক্ষ্যে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) সহায়তায় নতুন কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
ডব্লিউটিওর আওতাধীন এনহ্যানসড ইন্টিগ্রেটেড ফ্রেমওয়ার্ক (ইআইএফ) কর্মসূচির তৃতীয় পর্যায়ের জন্য তৈরি করা কান্ট্রি প্রোগ্রাম ডকুমেন্ট বাস্তবায়নের মাধ্যমে এসব লক্ষ্য পূরণের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
রোববার বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত কান্ট্রি প্রোগ্রাম ডকুমেন্টের ভ্যালিডেশন কর্মশালায় বাণিজ্য সচিব আতাউর রহমান খান বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একদিকে এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতি চলছে, অন্যদিকে রপ্তানি খাতে নন-ট্যারিফ বাধা, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড মেনে চলার চাপ এবং বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়নের মতো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে।
তিনি বলেন, ইআইএফ কর্মসূচির আগের দুই পর্যায়ে দেওয়া সুপারিশগুলো নতুন কান্ট্রি প্রোগ্রাম ডকুমেন্টে গুরুত্বের সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এতে বাংলাদেশের বাণিজ্য সক্ষমতা বাড়ানো ও প্রয়োজনীয় সংস্কারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ১২টি নির্দিষ্ট কার্যক্রম রাখা হয়েছে।
বাণিজ্য সচিব বলেন, শুধু নীতিমালা বা গবেষণা প্রতিবেদন তৈরি করলেই কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নের ওপরই মূল সাফল্য নির্ভর করবে। এজন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর ও সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। তিনি আরও বলেন, বাণিজ্য সহজীকরণ, উদারীকরণ, প্রয়োজনীয় আইন ও বিধিমালার সংস্কার এবং বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয়ের মাধ্যমে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরি করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
কর্মশালায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (ডব্লিউটিও) খাদিজা নাজনীন বলেন, ইআইএফ কর্মসূচির মাধ্যমে এলডিসিভুক্ত দেশগুলোকে বাণিজ্য সক্ষমতা উন্নয়নে সহায়তা দেওয়া হয়। যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, সুইডেনসহ কয়েকটি উন্নয়ন সহযোগী দেশ এ কর্মসূচিতে অর্থায়ন করে থাকে। তিনি জানান, বাংলাদেশ এর আগে ইআইএফের দুটি পর্যায়ে কার্যক্রম বাস্তবায়ন করেছে। প্রথম পর্যায়ের কার্যক্রম শুরু হয় ২০০৯ সালে এবং শেষ হয় ২০১৫ সালে। এরপর দ্বিতীয় পর্যায়ের কার্যক্রম শুরু হয় ২০১৬ সালে, যা ২০২৪ সালে শেষ হয়েছে।
এখন তৃতীয় পর্যায়ের কার্যক্রম শুরু করার প্রস্তুতি চলছে। নতুন কান্ট্রি প্রোগ্রাম ডকুমেন্টের ভিত্তিতে বাংলাদেশ উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে অর্থায়ন সহায়তা পাবে। পাঁচ বছর মেয়াদি এই কর্মসূচি চলতি বছর থেকেই শুরু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
ইআইএফের পরামর্শক ও সাবেক অতিরিক্ত সচিব মো. হাফিজুর রহমান বলেন, কান্ট্রি প্রোগ্রাম ডকুমেন্ট তৈরির সময় বাংলাদেশের বিভিন্ন নীতি, কৌশল ও আগের গবেষণার সুপারিশ বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। তিনি জানান, ডকুমেন্ট তৈরির প্রাথমিক পর্যায়ে প্রায় ৫২টি প্রকল্প চিহ্নিত করা হয়েছিল। তবে উন্নয়ন সহযোগীদের সম্ভাব্য সহায়তা এবং বাংলাদেশের বাস্তবায়ন সক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে সেগুলো থেকে ১২টি কার্যক্রমকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
এই কার্যক্রমগুলোর মধ্যে রয়েছে রপ্তানি সক্ষমতা বৃদ্ধি, বাণিজ্য সহজীকরণ, বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়ন, সরকারি প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বাড়ানো, প্রশিক্ষণ, গবেষণা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহারের সুযোগ তৈরি করা। তিনি বলেন, এসব উদ্যোগের ক্ষেত্রে দেশের ডিটিআইএস, রপ্তানি নীতি, শিল্পনীতি, বাণিজ্য নীতি, ট্রেড ফ্যাসিলিটেশন অ্যাগ্রিমেন্ট এবং বিনিয়োগ সুবিধা সংক্রান্ত পরিকল্পনাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
কর্মশালায় অংশ নেওয়া সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা আশা প্রকাশ করেন, ইআইএফের তৃতীয় পর্যায়ের কার্যক্রম বাস্তবায়ন হলে এলডিসি উত্তরণের পর বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখা সহজ হবে। পাশাপাশি নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং রপ্তানি খাতের সক্ষমতা বৃদ্ধিতেও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
কর্মশালায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (এফটিএ) আয়েশা আক্তার, অতিরিক্ত সচিব (আইআইটি) শিবির বিচিত্র বড়ুয়াসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, সরকারি সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

