রাজধানীর যানজট নিয়ন্ত্রণে প্রযুক্তিনির্ভর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার দিকে যাচ্ছে ঢাকা মহানগর পুলিশ। আগামী ছয় মাসের মধ্যে ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ ১২০টি মোড়ে চালু করা হবে সেমি-অটোমেটিক ট্রাফিক সিগন্যাল ব্যবস্থা। এরই মধ্যে ১২টি পয়েন্টে এ ব্যবস্থা চালু হয়েছে, আগামী এক মাসের মধ্যে তা ৬০টির বেশি পয়েন্টে সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) আনিছুর রহমান জানিয়েছেন, শুধু জনবল বাড়িয়ে রাজধানীর যানজটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। এজন্য সড়ক ব্যবস্থাপনায় বৈজ্ঞানিক পরিবর্তন, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং আধুনিক ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালুর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, বর্তমানে ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগে প্রায় ৪ হাজার ১০০ সদস্য কর্মরত রয়েছেন। তবে ছুটি, প্রশিক্ষণ ও অসুস্থতার কারণে নিয়মিতভাবে প্রায় ৩ হাজার ৬০০ থেকে ৩ হাজার ৭০০ সদস্য রাজধানীর ৬৬৮টি ট্রাফিক পয়েন্টে দায়িত্ব পালন করছেন। এর মধ্যে প্রায় ২৫টি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে ২৪ ঘণ্টা দায়িত্ব পালন করতে হয়।
ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা উন্নত করতে গত প্রায় এক বছরে রাজধানীর ৭৫টি স্থানে সড়ক ডাইভারশন ও প্রকৌশলগত পরিবর্তন আনা হয়েছে। কোথাও যান চলাচলের ধরন পরিবর্তন করা হয়েছে, কোথাও নতুন পথ নির্ধারণ করা হয়েছে। এসব পরিবর্তনের ফলে যানজট কমার ইতিবাচক ফল পাওয়া যাচ্ছে বলে জানিয়েছে ট্রাফিক বিভাগ।
আনিছুর রহমান উদাহরণ দিয়ে বলেন, মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ের পশ্চিম প্রান্তে আসাদ গেটের চার রাস্তার মোড়ে আগে নিয়মিত যানজট তৈরি হতো। পরে সেখানে সরাসরি চলাচল সীমিত করে বাম দিকে ঘুরে কিছু দূর গিয়ে ইউটার্নের ব্যবস্থা করা হয়। এতে ওই এলাকায় যান চলাচল স্বাভাবিক হয়েছে এবং ট্রাফিক সদস্যের প্রয়োজনও কমেছে।
একই ধরনের পরিবর্তন আনা হয়েছে মোহাম্মদপুরের বসিলা, বনানীর কাকলী, মিরপুরের ইসিবি চত্বর এবং কালশী ফ্লাইওভারের নিচের এলাকায়। ডিএমপির এই কর্মকর্তা বলেন, ঢাকার মতো জনবহুল মহানগরে শুধু ট্রাফিক পুলিশের সংখ্যা বাড়িয়ে সমস্যার সমাধান করা যাবে না। বরং সড়কের নকশা, যান চলাচলের ধরন ও বাস্তব পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে পরিকল্পিত পরিবর্তন আনতে হবে।
তিনি জানান, রাজধানীর কোথায় কখন যানজট বেশি হয়, সে বিষয়ে ট্রাফিক বিভাগের অভিজ্ঞতা রয়েছে। পিক আওয়ার ও অফ-পিক আওয়ার অনুযায়ী সদস্য মোতায়েন করা হয়। তবে দীর্ঘমেয়াদে শুধু ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। এজন্য বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিকে যুক্ত করাই টেকসই সমাধান।
সেমি-অটোমেটিক সিগন্যাল ব্যবস্থায় প্রয়োজন অনুযায়ী সিগন্যালের সময় পরিবর্তন করা যাবে। ভবিষ্যতে পুরোপুরি স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থায় যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। উন্নত দেশগুলোতে যেমন একাধিক সিগন্যাল একে অপরের সঙ্গে যুক্ত থাকে এবং যানবাহনের চাপ অনুযায়ী সিগন্যালের সময় নির্ধারিত হয়, বাংলাদেশেও ধাপে ধাপে সে ধরনের প্রযুক্তি চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
তবে আনিছুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের সড়কব্যবস্থা উন্নত দেশগুলোর মতো পরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠেনি। তাই তাদের মডেল পুরোপুরি অনুসরণ করা সম্ভব নয়। দেশের বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে ধাপে ধাপে প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থা চালু করতে হবে।
তিনি জানান, গত দুই মাসে নগরবাসীর কাছ থেকে ট্রাফিক আইন মেনে চলার ক্ষেত্রে ভালো সাড়া পাওয়া গেছে। মানুষ সিগন্যাল অনুসরণ করছেন এবং আগের তুলনায় যানজটে দীর্ঘ সময় আটকে থাকার ঘটনা কমেছে।
তবে ঢাকার যানজট সমস্যা পুরোপুরি শেষ হয়নি। ভারী বৃষ্টিপাত, সড়ক অবরোধ, মিছিল ও বিভিন্ন কর্মসূচির কারণে এখনো যান চলাচলে বড় ধরনের বাধা সৃষ্টি হয়। রাজধানীর এক এলাকার সমস্যা অন্য এলাকায় প্রভাব ফেলে বলে সমন্বিত পরিকল্পনার প্রয়োজন রয়েছে।
ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার বলেন, যানজট নিরসনে শুধু ট্রাফিক পুলিশের উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। সংশ্লিষ্ট সব সরকারি সংস্থা, উন্নয়নকারী প্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ সড়ক ব্যবহারকারীদের সমন্বিত ভূমিকা প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, অনেক সময় বিভিন্ন সংস্থা আগাম সমন্বয় ছাড়াই সড়কে উন্নয়নকাজ শুরু করে। এতে যান চলাচল ব্যাহত হয়। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে কাজের সময় ট্রাফিক সিগন্যালের কেবল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় পুরো ব্যবস্থা অকার্যকর হয়ে পড়ে। তাই উন্নয়ন কার্যক্রমের পাশাপাশি কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করাও জরুরি।

