বাংলাদেশে পানিতে ডুবে মৃত্যুর ঘটনা এখনো বড় জনস্বাস্থ্য সংকট হিসেবে রয়ে গেছে। বিশেষ করে শিশুরাই এই ঝুঁকির সবচেয়ে বড় শিকার। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে দেশে পানিতে ডুবে মারা গেছে ৫৮২ জন। এর মধ্যে ৫২৬ জনই শিশু, যা মোট মৃত্যুর প্রায় ৯০ শতাংশ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যুর বড় অংশই প্রতিরোধ করা সম্ভব। শিশুর বয়স ছয় বছর হলেই সাঁতার শেখানো, সার্বক্ষণিক নজরদারি নিশ্চিত করা এবং দুর্ঘটনার পর দ্রুত সঠিক পদ্ধতিতে প্রাথমিক চিকিৎসা দিতে পারলে এই মৃত্যুর সংখ্যা অনেকটাই কমানো সম্ভব। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ছয় বছর বয়সে একটি শিশুকে সাঁতার শেখানো গেলে পানিতে ডুবে মৃত্যুর ঝুঁকি থেকে প্রায় ৯০ দশমিক ৩ শতাংশ পর্যন্ত সুরক্ষা পাওয়া সম্ভব।
‘ইউনাইট টু টার্ন দ্য টাইড’ বা ‘স্রোতের মোড় ঘোরাতে ঐক্যবদ্ধ হওয়া’—এই প্রতিপাদ্য নিয়ে আজ ২৫ জুলাই পালিত হচ্ছে বিশ্ব পানিতে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধ দিবস। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ২০৩৫ সালের মধ্যে বিশ্বজুড়ে পানিতে ডুবে মৃত্যুর হার ৩৫ শতাংশ কমানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এই লক্ষ্য অর্জনে শিশুদের নিরাপত্তা, সাঁতার শিক্ষা এবং দুর্ঘটনা প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
ছয় মাসে ৫২৬ শিশুর মৃত্যু:
ডিজাস্টার ফোরামের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত দেশে পানিতে ডুবে মোট ৫৮২ জনের মৃত্যু হয়েছে। তাদের মধ্যে ৫২৬ জন শিশু, ১১ জন নারী এবং ৪৫ জন পুরুষ।
মৃত শিশুদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ছিল ১ থেকে ৫ বছর বয়সী। এই বয়সের ২৫২ শিশু পানিতে ডুবে মারা গেছে। এছাড়া ৬ থেকে ১০ বছর বয়সী ১৫১ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। স্থানভেদে সবচেয়ে বেশি মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে পুকুরে। ছয় মাসে পুকুরে ডুবে মারা গেছে ৩৪৮ জন। নদীতে মৃত্যু হয়েছে ১০৪ জনের।
২০২৫ সালে প্রাণ হারায় ১ হাজার ১৮৪ শিশু:
ডিজাস্টার ফোরামের ২০২৫ সালের হিসাব আরও উদ্বেগজনক। গত বছর জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশে পানিতে ডুবে মারা যায় ১ হাজার ৩১১ জন। এর মধ্যে শিশু ছিল ১ হাজার ১৮৪ জন, যা মোট মৃত্যুর প্রায় ৯১ শতাংশ।
মৃত শিশুদের মধ্যে ছেলে ৭৬১ জন এবং মেয়ে ৪২৩ জন। বয়স অনুযায়ী সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে ১ থেকে ৫ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে। এ বয়সের ৬৩১ শিশু মারা গেছে। এছাড়া ৬ থেকে ১০ বছর বয়সী ৩৫৪ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সকাল ৭টা থেকে বেলা ১১টার মধ্যে পানিতে ডুবে মৃত্যুর ঘটনা বেশি ঘটেছে। এ সময় পুকুরে ৭৬৫ জন, নদীতে ১৮৫ জন এবং ডোবায় ১০৬ জনের মৃত্যু হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পানিতে ডুবে মৃত্যুর ঘটনা কমাতে সবচেয়ে বড় বাধা হলো তথ্যের ঘাটতি, প্রয়োজনীয় সুযোগের অভাব এবং সচেতনতার সংকট। ন্যাশনাল অ্যালায়েন্স ফর ড্রাউনিং প্রিভেনশনের (এনএডিপি) আহ্বায়ক সদরুল হাসান মজুমদার বলেন, পানিতে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধে প্রথম প্রয়োজন সঠিক তথ্য পৌঁছে দেওয়া। অনেক অভিভাবকই জানেন না, শিশুর ছয় বছর বয়স হলেই তাকে সাঁতার শেখানো প্রয়োজন।
তিনি বলেন, দেশে সাঁতার শেখার সুযোগও সীমিত। বিশেষ করে শহরাঞ্চলে ছোট শিশুদের জন্য সহজলভ্য ও নিরাপদ সাঁতার শেখানোর ব্যবস্থা পর্যাপ্ত নয়। কিছু বেসরকারি উদ্যোগ থাকলেও তা সবার নাগালের মধ্যে নেই।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সায়েন্সেস বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ও প্রকল্প পরিচালক অধ্যাপক আবু হাসানাত মোহাম্মদ কিশোয়ার হোসেন বলেন, পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যুর পেছনে সামাজিক কাঠামোরও বড় ভূমিকা রয়েছে। তার মতে, সংক্রামক রোগ বা অন্যান্য স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলায় যেমন জাতীয় কর্মসূচি, বাজেট ও তথ্য সংগ্রহের ব্যবস্থা রয়েছে, পানিতে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধে তেমন কোনো পূর্ণাঙ্গ কাঠামো এখনো তৈরি হয়নি।
তিনি বলেন, শিশুর নিরাপত্তার দায়িত্ব অনেক ক্ষেত্রেই পরিবারের ওপর, বিশেষ করে মায়ের ওপর নির্ভর করে। কিন্তু একজন মাকে একই সঙ্গে রান্না, গৃহস্থালির কাজ, পানি সংগ্রহ, অন্য সন্তানদের দেখাশোনা এবং অনেক সময় আয়মূলক কাজও করতে হয়। ফলে সামান্য অসতর্কতাও ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে। তিনি আরও বলেন, কোথায়, কখন এবং কোন বয়সী শিশুরা বেশি পানিতে ডুবে মারা যাচ্ছে—এসব তথ্য নিয়মিতভাবে সংরক্ষণ করা হয় না। যে সমস্যার সঠিক পরিমাপ নেই, সেটি নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রেও যথেষ্ট গুরুত্ব পায় না।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পানিতে ডুবে মৃত্যু ঠেকাতে তিনটি বিষয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের নিয়মিত নজরদারির মধ্যে রাখতে হবে। গবেষণায় দেখা গেছে, সকাল ৯টা থেকে দুপুর পর্যন্ত শিশুদের ওপর বিশেষ নজর রাখা গেলে পানিতে ডুবে মৃত্যুর হার প্রায় ৮০ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব।
দ্বিতীয়ত, শিশুর ছয় বছর বয়স হলেই তাকে সাঁতার শেখাতে হবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানদণ্ড অনুযায়ী, এ বয়সে সাঁতার শেখানো হলে পানিতে ডুবে মৃত্যুর ঝুঁকি অনেকাংশে কমে যায়।
তৃতীয়ত, পানিতে ডুবে যাওয়ার পর প্রচলিত ভুল পদ্ধতি বাদ দিয়ে দ্রুত সিপিআর দিতে হবে। অনেক সময় শিশুকে উল্টো করে ঝাঁকানো বা পেট থেকে পানি বের করার চেষ্টা করা হয়, যা কার্যকর নয়। বরং প্রশিক্ষিত পদ্ধতিতে দ্রুত শ্বাসপ্রশ্বাস ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করতে হবে।
সদরুল হাসান মজুমদার বলেন, সাঁতারকে শুধু খেলাধুলা হিসেবে দেখলে হবে না। এটি একটি জীবন রক্ষাকারী দক্ষতা। তিনি বলেন, বাবা-মা যেমন সন্তানকে হাঁটতে শেখান, কথা বলতে শেখান কিংবা স্কুলে পাঠান, তেমনি ছয় বছর বয়সে সাঁতার শেখানোও শিশুর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।
তার মতে, পর্যাপ্ত সাঁতার শেখানোর জায়গা না থাকলেও অভিভাবকদের নিজেদের উদ্যোগ নিতে হবে। কারণ দুর্ঘটনার পর ক্ষতির সবচেয়ে বড় বোঝা বহন করতে হয় পরিবারকেই। বাংলাদেশে পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যু কমাতে তাই শুধু সরকারি উদ্যোগ নয়, পরিবার, সমাজ ও প্রতিষ্ঠান—সব পক্ষের সম্মিলিত ভূমিকা প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

