টাঙ্গাইলের মধুপুরের সুস্বাদু ‘হানি কুইন’ আনারস এবার দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে জায়গা করে নিচ্ছে। নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত পদ্ধতিতে উৎপাদিত এই আনারস ইতোমধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ কয়েকটি দেশে রপ্তানি হয়েছে। একই সঙ্গে জার্মানি ও চীনে রপ্তানির প্রস্তুতি চলছে। নতুন সম্ভাবনা হিসেবে পাকিস্তানের বাজারেও মধুপুরের আনারস প্রবেশের পথ তৈরি হচ্ছে।
কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে ‘গুড অ্যাগ্রিকালচারাল প্র্যাকটিস (জিএপি)’ কর্মসূচির আওতায় আনারস উৎপাদনে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এ কর্মসূচির অংশ হিসেবে মাটি ও পানির গুণগত মান পরীক্ষা, প্রয়োজন অনুযায়ী জৈব সার ব্যবহার এবং রোগবালাই নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে নিরাপদ উৎপাদন নিশ্চিত করা হচ্ছে। চলতি মৌসুমে মধুপুরে ১২ একর জমিতে এই পদ্ধতিতে আনারস চাষ হয়েছে এবং সেখানকার উৎপাদিত আনারস ইতোমধ্যে বিদেশে পাঠানো শুরু হয়েছে।
সম্প্রতি পাকিস্তানের জাতীয় নিরাপদ খাদ্য ও গবেষণা মন্ত্রণালয়ের প্ল্যান্ট প্রটেকশন অধিদপ্তরের কীটতত্ত্ববিদ মোহাম্মদ আকীদ মেহদী মধুপুরের কয়েকটি আনারসবাগান পরিদর্শন করেন। সফরকালে তিনি আনারসের উৎপাদন প্রক্রিয়া, মান ও স্বাদ সম্পর্কে খোঁজ নেন এবং কৃষি বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন।
পরিদর্শন শেষে তিনি জানান, বাংলাদেশের উৎপাদিত আনারস তাঁর কাছে সুস্বাদু ও স্বাস্থ্যসম্মত মনে হয়েছে। দেশে ফিরে তিনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে তাঁর পর্যবেক্ষণ তুলে ধরবেন। এরপর দুই দেশের মধ্যে প্রয়োজনীয় সরকারি চুক্তি হলে পাকিস্তানে বাংলাদেশি আনারস রপ্তানির সুযোগ তৈরি হতে পারে।
মধুপুর উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৪২ সালে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সদস্য মিজি দয়াময়ী সাংমা ভারতের মেঘালয় থেকে ৭৫০টি আনারসের চারা এনে মধুপুরের ইদিলপুর গ্রামে প্রথম আনারস চাষ শুরু করেন। সেই উদ্যোগ এখন বিশাল শিল্পে পরিণত হয়েছে।
বর্তমানে উপজেলার ছয়টি ইউনিয়নে মোট ৬ হাজার ৬৩৮ হেক্টর জমিতে আনারসের চাষ হচ্ছে। এর মধ্যে ক্যালেন্ডার বা জায়ান্ট কিউ জাতের আনারস রয়েছে ৪ হাজার ৩৭৫ হেক্টরে, জলডুগি জাতের আবাদ হয়েছে ২ হাজার ২৪৫ হেক্টরে এবং এমডি-২ জাতের আনারস চাষ হচ্ছে ১৮ হেক্টর জমিতে। চলতি মৌসুমে এসব বাগান থেকে প্রায় আড়াই লাখ টন আনারস উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে।
নিরাপদ আনারস উৎপাদনে সফল কৃষকদের একজন ছানোয়ার হোসেন। তিনি মধুপুরে পাঁচ একর এবং গাজীপুরের শ্রীপুরে আট একর জমিতে নিরাপদ পদ্ধতিতে আনারস চাষ করেছেন। তাঁর বাগানের আনারস জার্মানিতে রপ্তানির প্রস্তুতি চলছে। প্রয়োজনীয় পরীক্ষাগার বিশ্লেষণ ও রপ্তানির আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়াও প্রায় শেষ পর্যায়ে।
ছানোয়ার হোসেন বলেন, দীর্ঘদিন ধরে নিরাপদ উপায়ে আনারস উৎপাদনের জন্য কাজ করছেন তাঁরা। এবার জার্মানিতে আনারস পাঠানোর উদ্যোগ সফল হলে আন্তর্জাতিক বাজারে আরও বড় পরিসরে রপ্তানির সুযোগ তৈরি হবে বলে তিনি আশা করছেন।
মধুপুর উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত কৃষি কর্মকর্তা তাজমী নূর রাত্রি জানান, দীর্ঘদিন ধরে অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহারের প্রবণতা থেকে কৃষকদের বের করে আনতে কাজ করছে কৃষি বিভাগ। ক্ষতিকর রাসায়নিকের ব্যবহার কমিয়ে নিরাপদ আনারস উৎপাদনে কৃষকদের প্রশিক্ষণ ও পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
তিনি জানান, চলতি মৌসুমে জিএপি কর্মসূচির আওতায় উৎপাদিত আনারসের মধ্যে প্রায় ৬ হাজার আনারস দুবাইসহ কয়েকটি দেশে রপ্তানি করা হয়েছে। পাশাপাশি পাকিস্তানের প্রতিনিধিদল বাগান পরিদর্শনের সময় উৎপাদন পদ্ধতি, আনারসের মান এবং রোগবালাই ও ক্ষতিকর কীটপতঙ্গের উপস্থিতি সম্পর্কেও বিস্তারিত মূল্যায়ন করেছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের টাঙ্গাইলের উপপরিচালক আশেক পারভেজ বলেন, মধুপুরের আনারস স্বাদ ও গুণগত মানের জন্য দীর্ঘদিন ধরে পরিচিত। নিরাপদ উৎপাদন নিশ্চিত করতে কৃষকদের নিয়মিত কারিগরি সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে কয়েকটি দেশে রপ্তানি শুরু হয়েছে। ভবিষ্যতে বিদেশের বাজার আরও সম্প্রসারিত হলে কৃষকের আয় বাড়বে, পাশাপাশি দেশের রপ্তানি খাতও আরও শক্তিশালী হবে।

