দেশের চা বাজারে আবারও মূল্যবৃদ্ধির ইঙ্গিত স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। টানা দুই বছরের ধারাবাহিকতায় এবারও চায়ের নিলামের ন্যূনতম মূল্যস্তর বা ফ্লোর প্রাইস পুনর্নির্ধারণের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ চা বোর্ড ও সংশ্লিষ্ট বিক্রয় সংগঠনগুলো। এ উদ্যোগের খবর ছড়িয়ে পড়তেই নিলাম বাজারে বেড়েছে ক্রেতাদের আগ্রহ, যার প্রভাব পড়তে শুরু করেছে পাইকারি ও খুচরা বাজারেও।
খাতসংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, মাত্র তিন সপ্তাহের ব্যবধানে নিলামে চায়ের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। একই সময়ে পাইকারি বাজারেও প্রতি কেজি চায়ের দাম বেড়েছে প্রায় ৫০ টাকা। ফলে খুচরা বাজারেও মূল্যবৃদ্ধির চাপ তৈরি হয়েছে।
ব্যবসায়ীরা জানান, প্রায় তিন সপ্তাহ আগে বিভিন্ন কোম্পানি প্রতি কেজি চায়ের দাম ২০ টাকা বাড়ায়। এরপর গত শুক্রবার থেকে আরও ১০ টাকা বাড়িয়ে নতুন দামে বাজারজাত করা হচ্ছে। এর আগে বছরের প্রথমার্ধে মৌসুম শুরুর সময় নিলামের প্রভাবে কয়েক দফায় ২০ থেকে ৩০ টাকা পর্যন্ত দাম বাড়ানো হয়েছিল। সব মিলিয়ে চলতি বছরে সাধারণ ব্লেন্ড চায়ের দাম প্রতি কেজিতে অন্তত ৫০ থেকে ৬০ টাকা বেড়েছে। এর আগেও ২০২৫ সালের শেষার্ধে কেজিপ্রতি ২০ থেকে ৩০ টাকা মূল্য বৃদ্ধি হয়েছিল। বর্তমানে দেশের বাজারে প্রতি কেজি চা ৫০০ থেকে ৬৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
চা বোর্ডের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২২-২৩ মৌসুমে নিলামে প্রতি কেজি চায়ের গড় দাম ছিল ১৯৬ টাকা ৫৮ পয়সা। ২০২৪ সালে প্রথমবারের মতো ন্যূনতম মূল্যস্তর চালু হওয়ার পর গড় মূল্য বেড়ে দাঁড়ায় ২২৭ টাকা ৮০ পয়সায়, অর্থাৎ বৃদ্ধি পায় ৩১ টাকা ২২ পয়সা। পরবর্তী মৌসুমে মূল্যস্তর আবার সংশোধন হলে গড় দাম আরও ৪৩ টাকা ৪ পয়সা বেড়ে ২৪৫ টাকা ৫০ পয়সায় পৌঁছে।
চলতি বছরও নিলাম বাজারে একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। ২০ জুলাই পর্যন্ত চট্টগ্রামের ১২টি নিলামে ২ কোটি ৫৪ লাখ ৫১ হাজার ১৩৬ কেজি চা বিক্রি হয়েছে। সেখানে প্রতি কেজির গড় দাম ছিল ২৭২ টাকা ৯২ পয়সা। একই সময়ে শ্রীমঙ্গলের ১২টি নিলামে ৫ লাখ ৫ হাজার ৩২ কেজি চা বিক্রি হয়, যার গড় মূল্য ছিল ২৬৩ টাকা ৩০ পয়সা। অন্যদিকে ১৪ জুলাই পর্যন্ত পঞ্চগড়ের সাতটি নিলামে বিক্রি হয়েছে ১ লাখ ৮৭ হাজার ৩৭ কেজি চা। সেখানে প্রতি কেজির গড় মূল্য ছিল ২৩৯ টাকা ৫৪ পয়সা।
খাতসংশ্লিষ্টদের ধারণা, বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে চলতি বছর দেশের তিনটি নিলাম কেন্দ্রেই গড়ে প্রতি কেজি চায়ের দাম আরও ৩০ থেকে ৪০ টাকা পর্যন্ত বাড়তে পারে।
চা উৎপাদনকারীরা বলছেন, দেশের ১৭২টি চা বাগান এবং বিভিন্ন জেলার ক্ষুদ্র চা চাষিদের উৎপাদন ব্যয় কয়েক বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে বাড়লেও নিলামে দীর্ঘদিন প্রত্যাশিত দাম পাওয়া যায়নি। ফলে অনেক বাগান লোকসানে পড়ে এবং শ্রমিকদের মজুরি ও ঋণ পরিশোধে সংকটে পড়ে। এ পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে ২০২৪ সালের ৬ মার্চ প্রথমবারের মতো চায়ের বিভিন্ন গ্রেড অনুযায়ী ন্যূনতম মূল্যস্তর নির্ধারণ করা হয়।
পরে ২০২৫ সালের মে মাসে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বৈঠকে দ্বিতীয় দফায় সেই মূল্যস্তর সংশোধনের সিদ্ধান্ত হয় এবং একই বছর তা কার্যকর করা হয়। সর্বশেষ সংশোধনে আটটি গ্রেডের চায়ের লিকার রেটিং অনুযায়ী প্রতি কেজিতে ২০ থেকে ৮৫ টাকা পর্যন্ত ন্যূনতম মূল্য বৃদ্ধি করা হয়েছিল।
চা বাগান থেকে সরবরাহের পর ব্রোকার প্রতিষ্ঠানগুলো সাতটি গ্রেডে চায়ের লিকার রেটিং নির্ধারণ করে। এ বছরও সেই রেটিংয়ের ভিত্তিতে নতুন ন্যূনতম মূল্যস্তর নির্ধারণে বাংলাদেশ চা বোর্ড, বাংলাদেশ টি ট্রেডার্স অ্যাসোসিয়েশন এবং বাংলাদেশীয় চা সংসদ বৈঠক করেছে। ৯ জুলাই অনুষ্ঠিত বৈঠকে অংশীজনদের মতামত নেওয়া হয়। সেই মতামতের ভিত্তিতে নতুন মূল্যস্তর নির্ধারণের কাজ চলছে।
বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, নতুন মূল্যস্তরের সম্ভাব্য ঘোষণার আগেই বড় বড় ব্র্যান্ডেড কোম্পানিগুলো নিলাম থেকে বেশি পরিমাণে চা কিনে মজুত করছে। এর ফলে নিলামে প্রতিযোগিতা বেড়েছে এবং দামও দ্রুত ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের তথ্যমতে, সাধারণত ভরা মৌসুমে নিলামে মোট চায়ের ৬৫ থেকে ৭৫ শতাংশ বিক্রি হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক কয়েকটি নিলামে বিক্রির হার বেড়ে ৯৫ থেকে ৯৮ শতাংশে পৌঁছেছে। প্রায় সব চায়ের ক্রেতা থাকায় দামও বাড়ছে।
বাংলাদেশীয় চা সংসদের সভাপতি কামরান তানভিরুর ইসলাম বলেন, জ্বালানি, শ্রমিকের মজুরি এবং মূল্যস্ফীতির কারণে বর্তমানে প্রতি কেজি চা উৎপাদনে ব্যয় ২৭০ টাকার কম নয়। শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে এবং উদ্যোক্তাদের ধারাবাহিক লোকসান থেকে রক্ষা করতে নিলামের মূল্যস্তর পুনর্বিবেচনার প্রয়োজন রয়েছে। তার মতে, চা শিল্প দেশের কয়েক লাখ মানুষের কর্মসংস্থান এবং বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের গুরুত্বপূর্ণ খাত হওয়ায় এ বিষয়ে সরকারের সহায়তা প্রয়োজন।
তবে বিপণনকারী প্রতিষ্ঠানের একটি অংশের মত ভিন্ন। একটি শীর্ষস্থানীয় চা বিপণনকারী প্রতিষ্ঠানের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, চা কৃষিপণ্য হলেও এর মূল্য ও বাজার ব্যবস্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে হয়। উৎপাদন বৃদ্ধি, উচ্চফলনশীল জাতের সম্প্রসারণ এবং আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মতো বিষয়গুলো আরও কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন। পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে উৎপাদন চাহিদার তুলনায় কম হওয়ায় বাজারে মূল্যচাপ তৈরি হচ্ছে। তার মতে, চাকে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে বাজার ব্যবস্থাপনায় নতুন দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন।
বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিভিন্ন কোম্পানির মোড়কজাত চায়ের দামও ইতোমধ্যে বেড়েছে। আবুল খায়ের গ্রুপের সিলন ব্র্যান্ডের ৫০০ গ্রামের প্যাকেটের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য ২৮০ টাকা। একই ওজনের সিলন পিডি ২৪৬ টাকা, সিলন বিওপি ২৪১ টাকা এবং সিলন আরডি ২৪৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অন্যদিকে ইস্পাহানি মির্জাপুরের বিভিন্ন ধরনের ৫০০ গ্রামের চা পাইকারি বাজারে ১৯০ থেকে ২৩৫ টাকার মধ্যে বিক্রি হলেও খুচরা পর্যায়ে একই প্যাকেটের জন্য ভোক্তাদের ৩০ থেকে ৪০ টাকা বেশি গুনতে হচ্ছে।
বাংলাদেশ চা বোর্ডের সদস্য (অর্থ ও বাণিজ্য) ইয়াছমিন পারভীন তিবরীজি বলেন, উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও অনেক বাগান নিলামে কাঙ্ক্ষিত মূল্য পাচ্ছে না। সে কারণেই ধারাবাহিকভাবে ন্যূনতম মূল্যস্তর নির্ধারণ করা হচ্ছে। প্রতি বছরের মতো এবারও অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে এবং তাদের মতামতের ভিত্তিতেই বাণিজ্য মন্ত্রণালয় চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে।

