রাহাদ সুমন, বরিশাল ব্যুরো
ভরা মৌসুমের দেড় মাস শেষ হলেও বাজারে ইলিশ নেই বললেই চলে। উচ্চ দামের কারণে রুপালি এ মাছটি মধ্যবিত্তের নাগালের বাইরে। কিন্তু মৎস্য অধিদপ্তরের কাগজের হিসাব বলছে ভিন্ন কথা। মৌসুমের প্রথম মাস জুনে দক্ষিণাঞ্চলের নদ-নদী ও সাগরে গত বছরের তুলনায় প্রায় তিন গুণ বেশি ইলিশ আহরণ হয়েছে।
গত ছয় বছরের মধ্যে সর্বাধিক ইলিশও আহরণ হয়েছে গত মাসে। অথচ মোকাম ও হাটবাজারে আসা ইলিশের পরিমাণ মৎস্য অধিদপ্তরের কাগুজে হিসাবকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
মৎস্যসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আহরিত ইলিশের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই জাটকা (১০ ইঞ্চির কম) ও ছোট আকারের ইলিশ। অথচ জাটকা নিধন ও বিক্রি দণ্ডনীয় অপরাধ। নিষিদ্ধ ট্রলিং জাহাজ দিয়ে জাটকা নিধন চলছেই। আহরণ ও বিক্রি নিষিদ্ধ এসব ইলিশও মৎস্য অধিদপ্তরের হিসাবে যুক্ত হওয়ায় আহরণ বেড়েছে বলে দেখানো হচ্ছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে কয়েক বছরের মধ্যে জাটকাও পাওয়া যাবে না বলে আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের।
জানা গেছে, বর্ষা মৌসুমকে ইলিশের মৌসুম হিসেবে গণ্য করা হয়। প্রজনন ও জাটকা বড় হওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করতে নদী ও সাগরে পর্যায়ক্রমে বছরের আট মাস বিভিন্ন মেয়াদে আহরণে নিষেধাজ্ঞা জারি থাকে। সর্বশেষ সাগরে ৫৮ দিনের নিষেধাজ্ঞা শেষ হয়েছে গত ১১ জুন। আগামী অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত নদী-সাগরে আর কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই। তাই এই চার মাসকে ইলিশের ভরা মৌসুম হিসেবে ধরা হয়। দেশে মোট আহরিত ইলিশের প্রায় ৭০ শতাংশই পাওয়া যায় দক্ষিণাঞ্চলের নদ-নদী ও সাগরে।
মৎস্য অধিদপ্তরের বরিশাল বিভাগীয় কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, গত জুনে বিভাগের ছয় জেলায় মোট ৪০ হাজার ৫১৬ টন ইলিশ আহরণ হয়েছে। গত বছরের একই সময়ে আহরণ হয়েছিল ১৪ হাজার ৪৯৬ টন। অর্থাৎ এক বছরে আহরণ বেড়েছে ২৬ হাজার ২০ টন।
এর আগে ২০২৪ সালে ২১ হাজার ৮২৭ টন, ২০২৩ সালে ১৫ হাজার ৪৮২ টন, ২০২২ সালে ৩০ হাজার ৮২০ টন এবং ২০২১ সালে ১৫ হাজার ৮৯২ টন ইলিশ আহরণ হয়েছিল।
মৎস্য অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে এবারের জুনে প্রায় তিন গুণ বেশি ইলিশ আহরণ হয়েছে। অথচ বাজারে সরবরাহ সীমিত। জেলেদের ভাষ্য, আহরণ কিছুটা বেড়েছে ঠিকই, তবে সেটিও হয়েছে ইলিশের ‘সর্বনাশ’ করে। নিষিদ্ধ ট্রলিং জাহাজ দিয়ে মোহনা থেকে জাটকা ধরে আনা হচ্ছে।
পর্যটনকেন্দ্র কুয়াকাটা-সংলগ্ন সাগরে ১৭ বছর ধরে মাছ ধরছেন জেলে ফোরকান সরদার। তিনি বলেন, ‘আগে যে ছোট ইলিশ পেতাম, সেগুলোরও ওজন ছিল আধা কেজির মতো। এখন যে ইলিশ পাই, ছয়টা মিলিয়ে এক কেজি হয়।’
তার ভাষ্য, আগে বড় ইলিশ থাকায় চার থেকে সাড়ে চার ইঞ্চি ফাঁসের জাল ব্যবহার করতেন। এখন ইলিশ ছোট হয়ে যাওয়ায় তিন থেকে সাড়ে তিন ইঞ্চি ফাঁসের জাল ব্যবহার করতে হচ্ছে। এতে প্রচুর জাটকা ধরা পড়ছে।
বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার জেলে মতি মাঝি বলেন, কাঠের তৈরি ট্রলিং জাহাজে ইলিশের রেণু পর্যন্ত নিধন করা হচ্ছে। এ কারণেই বড় ইলিশ কমে গেছে।
পাথরঘাটা মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত বিপণন ব্যবস্থাপক দেলোয়ার হোসাইন জানান, গত বছরের তুলনায় এবার পাথরঘাটায় ইলিশের আমদানি কিছুটা বেড়েছে। এর কারণ, নিষিদ্ধ ট্রলিং ট্রলারগুলো বিভিন্ন কৌশলে মাছ এনে বাজারে বিক্রি করছে। আগে এসব মাছ চোরাইভাবে বিক্রি হওয়ায় সরকারি হিসাবে যুক্ত হতো না।
ইলিশে বিস্ময়কর তথ্য
সাগরতীরের পাথরঘাটা উপজেলায় দেশের দ্বিতীয় বৃহৎ মৎস্য মোকাম। মোহনা ও সাগরে আহরিত ইলিশ এ মোকামে বিক্রি হয়। গত বছরের জুনে এখানে ৫৯ দশমিক ৫১ টন ইলিশ বিক্রি হয়েছিল। এ বছর জুনে বিক্রি হয়েছে ১১৪ দশমিক ৬৮ টন।
মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত দুই বছর বরিশাল বিভাগে মোট আহরণের অর্ধেকের বেশি ভোলা জেলায় দেখানো হয়েছে। এ বছরের জুনে মোট ৪০ হাজার ৫১৬ টনের মধ্যে ২৯ হাজার ৪৪৪ টনই দেখানো হয়েছে ভোলায়। গত বছরও ১৪ হাজার ৪৯৬ টনের মধ্যে ভোলার অংশ ছিল ৭ হাজার ৬৫০ টন।
এ তথ্য নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেন ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার সামরাজ মাছঘাটের আড়তদার আলাউদ্দিন পাটোয়ারী। মেঘনার মোহনায় অবস্থিত এ মাছঘাটে তিনি ৪৭ বছর ধরে ইলিশের ব্যবসা করছেন। তিনি বলেন, ‘মেঘনায় ইলিশ নেই বললেই চলে। ট্রলারগুলো সাগরে গিয়ে বাজার খরচও তুলতে পারে না। মৎস্য অধিদপ্তর শুধু আমলাতান্ত্রিক হিসাব দেখাচ্ছে।’
জাটকা নিধনের কারণে ইলিশ কমে যাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেছেন মৎস্য অধিদপ্তরের বরিশাল অঞ্চলের উপপরিচালক মো. মহসীন। তিনি বলেন, জনবল সংকটসহ নানা সীমাবদ্ধতার কারণে অভিযান পরিচালনায় সমস্যা রয়েছে। তবে এ বছরের জুনে গত বছরের তুলনায় তিন গুণ ইলিশ আহরণ এবং বাজারে সংকটের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা না দিয়ে তিনি বলেন, মাঠপর্যায় থেকে তথ্য সংগ্রহ করেই এ হিসাব করা হয়েছে।
বার্ষিক আহরণ কমেছে
গত পাঁচ বছরে বরিশাল বিভাগে ইলিশের আহরণ কমেছে ১ লাখ ২ হাজার ৭০৪ টন। বিভাগীয় মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০-২১ অর্থবছরে আহরণ হয়েছিল ৩ লাখ ৬৯ হাজার ৩০১ টন। সদ্য শেষ হওয়া ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৬৬ হাজার ৫৯৭ দশমিক ১৫০ টনে।
এর আগের অর্থবছর ২০২৪-২৫ সালে আহরণ হয়েছিল ৩ লাখ ৪৭ হাজার ৭৮৩ টন। অর্থাৎ মাত্র এক বছরে আহরণ কমেছে প্রায় ৬৮ হাজার টন। পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বাধিক আহরণ হয়েছিল ২০২২-২৩ অর্থবছরে, ৩ লাখ ৭০ হাজার ৩৪৩ টন।
সাধ্যের বাইরে দাম
কাগজে-কলমে আহরণ বাড়লেও বাজারে দাম কমেনি, বরং বেড়েছে। বরিশাল পোর্ট রোড মোকামের আড়তদার নাসির উদ্দিন মিয়া জানান, আকারভেদে গত বছরের তুলনায় এ বছর প্রতি কেজিতে ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা বেশি দামে ইলিশ বিক্রি হচ্ছে।
তার ভাষ্য, মোকামে সবচেয়ে বেশি আসছে ৩০০ গ্রামের কম ওজনের জাটকা। গত ১৮ জুলাই এ আকারের ইলিশ পাইকারি বাজারে ৮০০ টাকা এবং খুচরা বাজারে ৯০০ টাকার বেশি দামে বিক্রি হয়েছে। গত বছর একই আকারের ইলিশের দাম ছিল ৫০০ টাকারও কম।
নগরের ২৯ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা সাইমুন ইসলাম জানান, গত ১৬ জুলাই তিনি পোর্ট রোড মোকাম থেকে জাটকার চেয়ে সামান্য বড় পাঁচটি ইলিশ কিনেছেন। মোট ওজন ছিল ১ কেজি ৭০ গ্রাম। প্রতি কেজির দাম দিতে হয়েছে ১ হাজার ১০০ টাকা।
অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক আব্দুর রহমান জানান, তিনি দুটি ইলিশ কিনেছেন, যার মোট ওজন ১ কেজি ৬০০ গ্রাম। দাম দিতে হয়েছে ৩ হাজার টাকা।
পোর্ট রোড মোকাম সূত্রে জানা গেছে, গত ১৮ জুলাই ১ হাজার ২০০ গ্রাম ওজনের ইলিশের পাইকারি দাম ছিল প্রতি কেজি ২ হাজার ৭৫০ টাকা। ১ কেজি ওজনের ইলিশ ২ হাজার ৬৫০ টাকা, ৭০০ থেকে ৯০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ ২ হাজার ৩৫০ টাকা, ৫০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ ১ হাজার ৯৫০ টাকা, ৪০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ ১ হাজার ৫০০ টাকা এবং ৩০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ ১ হাজার ১৫০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। খুচরা বাজারে এসব মাছ আরও ২০০ থেকে ৩০০ টাকা বেশি দামে বিক্রি করা হয়েছে।

