দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন রাষ্ট্রপতি নিয়োগ নিয়ে যে জল্পনা চলছে, তার মধ্যেই আজ বৈঠকে বসছে বিএনপির শীর্ষ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটি। দলীয় সূত্রের বরাত দিয়ে জানা গেছে, এই বৈঠকের মূল আলোচ্য বিষয় হবে দেশের পরবর্তী রাষ্ট্রপতি কে হবেন, সেই প্রশ্ন। আলোচনার মধ্য দিয়ে সম্ভাব্য প্রার্থীর নাম চূড়ান্ত হতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছে দলটি।
সূত্র জানায়, বৈঠকে শুধু রাষ্ট্রপতি প্রসঙ্গই নয়, বরং দেশের সার্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি, বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় পদে নিয়োগ এবং দলের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা হবে।
উল্লেখ্য, গত ২৪ জুলাই স্বাস্থ্যগত জটিলতার কারণ দেখিয়ে রাষ্ট্রপতির পদ থেকে সরে দাঁড়ান তৎকালীন রাষ্ট্রপতি। সংবিধানের নির্ধারিত বিধান অনুসারে তাঁর পদত্যাগপত্র গৃহীত হওয়ার পর জাতীয় সংসদের স্পিকার ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। দেশের ইতিহাসে এবার নির্বাচিত হতে যাচ্ছেন ২৩তম রাষ্ট্রপতি, আর সেই নির্বাচনকে কেন্দ্র করেই দলীয় ফোরামে এই বৈঠক ডাকা হয়েছে।
দলীয় সূত্র বলছে, নতুন রাষ্ট্রপতি বাছাইয়ের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন দলের চেয়ারম্যান তথা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং। স্থায়ী কমিটির বৈঠকে দলের শীর্ষস্থানীয় নেতারা নিজ নিজ মতামত তুলে ধরবেন, আর সবার মতামত শোনার পরই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। প্রার্থী বাছাইয়ে দলের প্রতি আনুগত্য, প্রশাসনিক দক্ষতা, বিচক্ষণতা, সর্বমহলে গ্রহণযোগ্যতা এবং জাতীয় সংকটকালে দৃঢ়তার সঙ্গে অবস্থান নেওয়ার সক্ষমতাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে বলে জানা গেছে।
রাষ্ট্রপতি পদের জন্য যাঁদের নাম এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি আলোচিত, তাঁদের মধ্যে রয়েছেন দলের মহাসচিব তথা স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা একজন শীর্ষ নেতা, স্থায়ী কমিটির আরও তিনজন প্রবীণ সদস্য। সূত্রের ভাষ্যমতে, এই সংক্ষিপ্ত তালিকা থেকেই শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি পদের জন্য একজনকে বেছে নেওয়া হতে পারে।
এই আলোচিত নেতাদের মধ্যে দুজন বর্তমানে দলীয় কর্মকাণ্ডে সরাসরি সক্রিয় ভূমিকা পালন করছেন এবং তাঁরা স্থায়ী কমিটির নিয়মিত সদস্য হিসেবেও কাজ করে যাচ্ছেন। রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার কারণে তাঁদের দলীয় রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা থেকে সরে আসতে হবে—এই বাস্তবতাও প্রার্থী বাছাইয়ের সময় বিবেচনায় রাখা হচ্ছে বলে জানা গেছে।
এ ছাড়া বর্তমানে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করা স্পিকার এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করা ব্যক্তির নামও আলোচনায় উঠে এসেছে। তবে এ বিষয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি।
সূত্র আরও জানায়, বর্তমান ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি যদি স্থায়ীভাবে এই পদে দায়িত্ব পান, তাহলে স্পিকারের আসনটি শূন্য হয়ে পড়বে। সে ক্ষেত্রে শূন্য হওয়া এই পদে স্থায়ী কমিটির অপর এক সদস্যের আসার সম্ভাবনার কথাও আলোচনায় রয়েছে।
সংবিধান অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের পর ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সম্পন্ন করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সেই হিসাবে আগামী ২২ অক্টোবরের মধ্যে এই নির্বাচন প্রক্রিয়া শেষ করতে হবে। এই লক্ষ্য সামনে রেখে নির্বাচন কমিশন ইতিমধ্যে প্রস্তুতিমূলক কার্যক্রম শুরু করে দিয়েছে। গত ২৮ জুলাই রাষ্ট্রপতি নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনার জন্য প্রধান নির্বাচন কমিশনার ভারপ্রাপ্ত স্পিকারের সঙ্গে বৈঠকে বসেছিলেন।
সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন জাতীয় সংসদ সদস্যদের প্রকাশ্য ব্যালটের মাধ্যমে। এই প্রক্রিয়ার জন্য সংসদ সচিবালয় থেকে সংসদ সদস্যদের নামের তালিকা নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ে পাঠানো হবে। এরপর নির্বাচন কমিশন সার্বিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে নির্বাচনের তারিখ ও তফসিল ঘোষণা করবে।
এই নির্বাচনে ভোটদানের অধিকার একমাত্র সংসদ সদস্যদেরই। গোটা নির্বাচন প্রক্রিয়ার নির্বাচনি কর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার। সাধারণত স্পিকার ও প্রধান নির্বাচন কমিশনারের মধ্যে বৈঠকের পরই নির্বাচন কমিশন আনুষ্ঠানিকভাবে তফসিল ঘোষণা করে থাকে।
তফসিল ঘোষণার পর তাতে উল্লেখ থাকবে মনোনয়নপত্র জমাদান, বাছাই প্রক্রিয়া, প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ তারিখ এবং প্রকৃত ভোটগ্রহণের দিন। ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে সংসদ ভবনের অধিবেশন কক্ষে। প্রচলিত রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন অনুযায়ী, একজন প্রার্থীর মনোনয়নপত্রে অন্তত একজন সংসদ সদস্যকে প্রস্তাবক ও আরেকজনকে সমর্থক হিসেবে স্বাক্ষর করতে হয়, পাশাপাশি প্রার্থীর নিজেরও সম্মতিসূচক স্বাক্ষর প্রয়োজন হয়।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, সংসদীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রবর্তনের পর থেকে এ পর্যন্ত মাত্র একবারই একাধিক প্রার্থী থাকার কারণে সংসদ কক্ষে সরাসরি ভোটাভুটির মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন, সেটি হয়েছিল ১৯৯১ সালে। এরপরের প্রতিটি নির্বাচনেই ক্ষমতাসীন দলের মনোনীত প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়ে এসেছেন।
তবে ভবিষ্যতে একাধিক প্রার্থী থাকলে সংসদের অধিবেশন কক্ষে নির্বাচনি কর্মকর্তার তত্ত্বাবধানে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। সংসদ সদস্যরা নির্ধারিত ব্যালট পেপারে নিজেদের পছন্দের প্রার্থীর নাম লিখে স্বাক্ষরসহ তা জমা দেবেন। ভোটগ্রহণ শেষে প্রকাশ্যে ভোট গণনা করে যিনি সর্বোচ্চ ভোট পাবেন, তাঁকেই নতুন রাষ্ট্রপতি হিসেবে ঘোষণা করা হবে।
সব মিলিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে এখন সবার নজর আজকের এই বৈঠকের দিকে, কারণ এখান থেকেই স্পষ্ট হতে পারে দেশের পরবর্তী রাষ্ট্রপতি প্রশ্নে দলের প্রকৃত অবস্থান।

