২০২৪ সালের ৪ আগস্ট সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুর থানায় হামলায় ১৫ জন পুলিশ সদস্য নিহত হওয়ার ঘটনা দেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত সহিংস ঘটনাগুলোর একটি। হামলায় বেঁচে যাওয়া পুলিশ সদস্যদের বর্ণনায় উঠে এসেছে আতঙ্ক, প্রাণ বাঁচানোর মরিয়া চেষ্টা এবং পরিবারকে শেষ বিদায়ের বার্তা দেওয়ার মতো হৃদয়বিদারক অভিজ্ঞতা।
এই ঘটনার আড়াই বছর পরও হত্যা মামলার তদন্ত চলমান রয়েছে, আর লুট হওয়া অস্ত্রের একটি অংশ এখনও উদ্ধার হয়নি।
‘হয়তো আর বাঁচব না’
হামলা থেকে বেঁচে ফেরা উপপরিদর্শক (এসআই) আব্দুল মালেক জানান, পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ হয়ে উঠেছিল যে তিনি ছোট ভাইকে ফোন করে নিজের শেষ কথা বলে নিয়েছিলেন।
তার ভাষ্য, তিনি ভাইকে বলেছিলেন, ‘আমাদের থানা আক্রমণ করেছে। মনে হয় আর বাঁচব না। সন্তানগুলোর খেয়াল রাখিস।’ এরপর ফোন কেটে দেন।
তিনি প্রাণে বেঁচে ফিরলেও ওই হামলায় থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাসহ (ওসি) মোট ১৫ জন পুলিশ সদস্য নিহত হন। ঘটনাস্থল ও আশপাশ থেকে ১৩ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। আহত আরও দুজন পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। নিহতদের একজনের মরদেহ থানার পাশের একটি গাছে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিল বলে প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি।
এই ঘটনায় বেঁচে যাওয়া পুলিশ কনস্টেবল ইমরুল কায়েস খান বলেন, ‘সে সময় আমি এনায়েতপুর থানায় কর্মরত ছিলাম। চাকরি জীবনে যেসব থানায় দায়িত্ব পালন করেছি, সব জায়গাতেই মানুষের সঙ্গে আন্তরিক সম্পর্ক গড়ে তুলেছি এবং সাধ্যমতো তাদের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছি। কিন্তু ৪ আগস্টে……………. (কেঁদে ফেলেন তিনি)।
তিনি আরো বলেন, আমাদের ওপর যখন হত্যার উদ্দেশ্যে হামলা করা হয়, তখন সবাই প্রাণ বাঁচাতে যে যেদিকে পারে পালানোর চেষ্টা করে। আমিও পালানোর চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু কেউ রেহাই পাইনি। হামলাকারীরা আমাকে মৃত ভেবে ফেলে রেখে যায়। আল্লাহর অশেষ রহমতে আজও বেঁচে আছি।’
থানা ছেড়ে পালিয়েও রক্ষা মেলেনি
হামলার সময় থানায় আগুন ধরিয়ে দেওয়া হলে অনেক পুলিশ সদস্য পেছনের দিক দিয়ে পালিয়ে আশপাশের বাড়িতে আশ্রয় নেন।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, হামলাকারীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে লুকিয়ে থাকা পুলিশ সদস্যদের খুঁজে বের করে মারধর করেন। থানার পেছনের একটি বাড়ির বাসিন্দার ভাষ্য অনুযায়ী, বাথরুমে আশ্রয় নেওয়া কয়েকজন পুলিশ সদস্যকে বের করে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। পরে ওই বাড়ির সামনেই তাদের মরদেহ একত্র করা হয়েছিল।
অস্ত্র লুট, এখনও উদ্ধার হয়নি সব
থানার নথি অনুযায়ী, হামলার সময় ১৮টি রাইফেল, পিস্তল ও শটগানসহ বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গুলি লুট হয়। এর মধ্যে এখনও ছয়টি অস্ত্র এবং অধিকাংশ গুলি উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
কীভাবে শুরু হয়েছিল হামলা
পুলিশ ও স্থানীয়দের তথ্য অনুযায়ী, সেদিন সকালে পাঁচ থেকে ছয় হাজার আন্দোলনকারী মিছিল নিয়ে থানার সামনে জড়ো হন। প্রথম দফায় পুলিশের অনুরোধে তারা সরে গেলেও দুপুর সাড়ে ১২টা থেকে ১টার মধ্যে আবারও বিপুল সংখ্যক মানুষ থানার দিকে এগিয়ে আসে।
পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রথমে টিয়ার শেল ও রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে। ওইদিন সরকারবিরোধী আন্দোলনে অংশ নেওয়া তিনজন গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন।
থানার সামনে ব্যবসা করা এক ব্যক্তি জানান, তিনি হাজারো মানুষকে স্লোগান দিতে দিতে থানার দিকে যেতে দেখেছেন। সংঘর্ষ শুরু হওয়ার পর নিরাপত্তার জন্য তিনি এলাকা ছেড়ে চলে যান।
‘প্রাণঘাতী গুলি চালানোর ইচ্ছা ছিল না’
এসআই আব্দুল মালেক দাবি করেন, শুরুতে পুলিশ প্রাণঘাতী গুলি ব্যবহার করেনি।
তার ভাষ্য, ‘আমাদের ইচ্ছা ছিল না কাউকে গুলি করে মারব। যদি সে রকম ইচ্ছা থাকত, তাহলে থানার সীমানায় ঢোকার আগেই অনেককে গুলি করা যেত। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমরা নিজেরাই প্রাণ হারালাম।’
তিনি জানান, হামলার সময় ওসি (তদন্ত)সহ চারজন থানার পানির ট্যাংকের নিচে আশ্রয় নিয়েছিলেন। পরে সন্ধ্যায় সেনাবাহিনীর সদস্যরা তাদের আহত অবস্থায় উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যান।
কাফনের কাপড় পরে এলাকা ছাড়েন পুলিশ সদস্যরা
ঘটনার পর এনায়েতপুরে পরিস্থিতি এতটাই উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে ওঠে যে ৬ আগস্ট আহত কয়েকজন পুলিশ সদস্যকে লাশবাহী গাড়িতে করে এলাকা থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়।
আব্দুল মালেক বলেন, চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি হাসপাতাল ছাড়ার অনুরোধ করেছিলেন। পরে তাদের সাদা কাফনের কাপড় পরিয়ে লাশবাহী গাড়িতে করে সিরাজগঞ্জ পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে নেওয়া হয়।
অন্তঃসত্ত্বা নারী কনস্টেবল নিহতের গুজব
হামলার সময় থানায় দায়িত্বে ছিলেন তিনজন নারী কনস্টেবল। বেঁচে যাওয়া এক নারী সদস্য জানান, আগুন লাগার পর তারা পাশের একটি বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। সেখানে তাকেও মারধর করা হয় এবং তিনি অচেতন হয়ে পড়েন। পরে হাসপাতালে তার জ্ঞান ফেরে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তখন অন্তঃসত্ত্বা এক নারী কনস্টেবল নিহত হয়েছেন—এমন গুজব ছড়িয়ে পড়ে।
বিবিসির সাক্ষাৎকার অনুসারে, ওই নারী সদস্য বলেন, তিনি তখন অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন না। তবে তাকে বাঁচানোর জন্য এক সহকর্মী হামলাকারীদের বলেছিলেন, তার গর্ভে সন্তান রয়েছে। এরপরও মারধর বন্ধ হয়নি।
তিনি জানান, পরে জানতে পারেন, তাকে রক্ষার চেষ্টা করা সহকর্মী কনস্টেবল রবিউল ইসলামও সেদিন নিহত হন।
হত্যা মামলা ও তদন্তের অগ্রগতি
ঘটনার প্রায় তিন সপ্তাহ পর, ২৬ আগস্ট, এনায়েতপুর থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়। মামলায় স্থানীয় আওয়ামী লীগের চারজন নেতার নাম উল্লেখের পাশাপাশি অজ্ঞাত পাঁচ থেকে ছয় হাজার জনকে আসামি করা হয়।
মামলার প্রধান আসামি করা হয় এনায়েতপুর থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি আহম্মদ মোস্তফা খান বাচ্চুকে। পরে তিনি কারাগারে মারা যান।
এ মামলায় সাবেক সংসদ সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী আব্দুল লতিফ বিশ্বাসসহ আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
সিরাজগঞ্জ জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হাফিজুর রহমান জানান, এ ঘটনায় মোট চারটি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে একটি পুলিশ সদস্যদের হত্যা এবং বাকি তিনটি আন্দোলনকারীদের মৃত্যুর ঘটনায়।
তিনি বলেন, পুলিশ হত্যা মামলায় এখন পর্যন্ত নয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং তদন্ত এখনও চলমান। তার দাবি, তদন্তে রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে নয়, প্রাপ্ত তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতেই ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
মামলার বাদির বক্তব্য
পুলিশ হত্যা মামলার বাদি হিসেবে এসআই আব্দুল মালেকের স্বাক্ষর রয়েছে।
এ বিষয়ে তিনি বলেন, ঘটনার পর তার শারীরিক ও মানসিক অবস্থা ভালো ছিল না। এজাহার অন্যরা প্রস্তুত করেছিলেন, আর তিনি শুধু নির্দেশনা অনুযায়ী তাতে স্বাক্ষর করেন।
অন্যদিকে, সে সময় দায়িত্বে থাকা পুলিশের একজন সাবেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দাবি করেন, তৎকালীন পরিস্থিতিতে চাপের মুখে মামলাটি রেকর্ড করতে হয়েছিল। তার ভাষ্য, স্থানীয় পুলিশও তখন জানিয়েছিল যে পরিস্থিতির কারণে তারা বাধ্য হয়েই মামলা নথিভুক্ত করেছে।

