বাংলাদেশ আঞ্চলিক শান্তি, স্থিতিশীলতা এবং আন্তর্জাতিক নৌপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সৌদি আরবের নেতৃত্বে গঠিত বহুজাতিক সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা জোটে যোগ দিয়েছে। শনিবার এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম। তার মতে, গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক জলপথে নিরাপদ নৌচলাচল নিশ্চিত করা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক স্বার্থের সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত।
সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে রিয়াদে আয়োজিত একটি আন্তর্জাতিক বৈঠকের পর বৃহস্পতিবার এই সামুদ্রিক জোট গঠনের ঘোষণা দেওয়া হয়। বাংলাদেশ ছাড়াও কুয়েত, বাহরাইন, পাকিস্তান, তুরস্ক ও জর্ডানসহ মোট ১৪টি দেশ এ উদ্যোগকে সমর্থন জানিয়েছে।
নতুন এই জোটের প্রধান লক্ষ্য হলো বাব এল-মান্দেব প্রণালি, লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরসহ গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক জলপথে নৌচলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, বৈশ্বিক বাণিজ্যপথ নিরাপদ রাখা এবং জ্বালানি পরিবহনের রুট সুরক্ষিত করা। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এসব জলপথে নিরাপত্তা নিশ্চিত হলে বিশ্ব সরবরাহ ব্যবস্থা আরও স্থিতিশীল থাকবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেন, লোহিত সাগর ও আশপাশের জলপথে জাহাজ চলাচল নিরাপদ রাখার লক্ষ্যে গঠিত এই উদ্যোগকে বাংলাদেশ সমর্থন করে। তিনি জানান, এই অঞ্চলে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার স্বার্থেই বাংলাদেশ জোটে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠায় এই উদ্যোগের গুরুত্ব বেড়েছে। গত ২০ জুলাই সৌদি আরবের বিরুদ্ধে হুথিদের ঘোষিত সামুদ্রিক অবরোধের পর পরিস্থিতি আরও উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে ওঠে। এর আগে ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সংঘাতের পর হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে তেলবাহী জাহাজগুলোর একটি বড় অংশ লোহিত সাগরের পথ ব্যবহার শুরু করে। পরে সেখানে অবরোধের প্রভাব পড়ায় আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থায় নতুন চাপ তৈরি হয়।
সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, জোটটির স্থায়ী সদর দপ্তর সৌদি আরবে থাকবে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এই জোটের উদ্দেশ্য হলো সম্মিলিত সামুদ্রিক নিরাপত্তা জোরদার করা, নৌচলাচলের স্বাধীনতা রক্ষা করা, বৈশ্বিক বাণিজ্য নিরাপদ রাখা এবং অভিন্ন নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সদস্য দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানো।
মন্ত্রণালয় আরও স্পষ্ট করেছে, এটি সম্পূর্ণ প্রতিরক্ষামূলক একটি জোট। কোনো নির্দিষ্ট রাষ্ট্র, জোট বা আন্তর্জাতিক সংস্থাকে লক্ষ্য করে এটি গঠন করা হয়নি। আন্তর্জাতিক আইন ও রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের প্রতি পূর্ণ সম্মান রেখে জোটের কার্যক্রম পরিচালিত হবে।
যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির মনে করেন, বাংলাদেশের এই সিদ্ধান্ত মূলত নীতিগত অবস্থান প্রকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। তার মতে, পশ্চিমা দেশগুলোতে বাংলাদেশের অধিকাংশ রপ্তানি লোহিত সাগর হয়ে যায়। ফলে এই নৌপথে যেকোনো ধরনের অস্থিতিশীলতা বাংলাদেশের বাণিজ্য ও অর্থনীতিতে সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডামুখী প্রায় ৭০ শতাংশ রপ্তানি লোহিত সাগর হয়ে পরিবাহিত হয়। তাই এই জোটে সমর্থন জানিয়ে বাংলাদেশ মূলত আন্তর্জাতিক নৌচলাচলের স্বাধীনতা এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যপথ নিরাপদ রাখার পক্ষে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেছে, যা দেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্বার্থের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ।

