দেশের চলমান গ্যাস সংকট শিগগিরই কেটে যাবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য, পলিসি ও স্ট্র্যাটেজি বিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান। তাঁর মতে, গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হলে বিদ্যুৎ উৎপাদনও বাড়বে। তবে একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করে বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যে জাহাজ চলাচলে বিঘ্নের কারণে আগামী দিনগুলোতে জ্বালানি ও কৃষি খাতকে বেশ কিছু অস্থির সময়ের মধ্য দিয়ে যেতে হতে পারে।
আজ মঙ্গলবার তথ্য অধিদপ্তরের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত সাপ্তাহিক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন তিনি। জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট প্রসঙ্গে তিনি জানান, একটি এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। যদিও বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয়নি, তবে এর ফলে টার্মিনালটি কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারছে না, যার প্রভাবে দেশে গ্যাস সরবরাহ কমে গেছে। গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় শিল্প কারখানা ও বাসাবাড়িতে রান্নার কাজে বিদ্যুতের ব্যবহার বেড়ে গেছে, যা সার্বিকভাবে বিদ্যুৎ সংকট তৈরি করেছে।
তিনি জানান, রাজধানীর বাইরে ব্যাপক লোডশেডিং হচ্ছে এবং তীব্র গরমের মধ্যে মানুষ এই বিদ্যুৎ সংকটে ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। গ্যাস সংকটের প্রকৃত কারণ ব্যাখ্যা করে জাহেদ উর রহমান বলেন, বিদেশ থেকে আমদানি করা গ্যাস প্রথমে এলএনজি টার্মিনালে আনা হয় এবং সেখানে রিগ্যাসিফিকেশন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হয়। দেশে এ ধরনের দুটি টার্মিনাল রয়েছে, যার একটি পরিচালনা করে একটি মার্কিন প্রতিষ্ঠান। সেই টার্মিনালেই দুর্ঘটনা ঘটায় গ্যাস সরবরাহে বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে।
তিনি বলেন, এই সংকটের প্রভাব সর্বত্র পড়েছে, এমনকি তাঁর নিজের বাসাতেও গ্যাসের চাপ ঠিকমতো পাওয়া যাচ্ছে না। তিনি নিজেও এই সংকটের ভুক্তভোগী বলে জানান। তাঁর ভাষ্যমতে, আগে থেকেই কিছুটা সংকট ছিল, তবে একটি টার্মিনাল সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তা প্রকট আকার ধারণ করেছে, যার প্রভাব পড়েছে শিল্প কারখানা, বাসাবাড়ি এবং সিএনজি স্টেশনগুলোতেও। সিএনজিচালিত যানবাহনের দীর্ঘ সারি এখন নিয়মিত দৃশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তথ্য উপদেষ্টা জানান, সরকার লোডশেডিং এড়াতে চায় বলেই গ্যাসনির্ভর বিদ্যুৎকেন্দ্রের ঘাটতি পূরণে তুলনামূলক ব্যয়বহুল তরল জ্বালানি বা ডিজেলভিত্তিক কেন্দ্র থেকেও বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হচ্ছে। যদিও এই পদ্ধতিতে উৎপাদন ব্যয় অনেক বেশি এবং তা জনগণের করের অর্থ থেকেই ব্যয় হচ্ছে, তবু পরিস্থিতি সামাল দিতে এই পথই বেছে নিতে হচ্ছে। তা সত্ত্বেও পুরোপুরি লোডশেডিং এড়ানো যাচ্ছে না।
তিনি আরও ব্যাখ্যা করেন, গ্যাসের সরবরাহ কমে গেলে বাসাবাড়িতে অনেকে বৈদ্যুতিক চুলার ব্যবহার শুরু করেন। একই সঙ্গে যেসব শিল্পপ্রতিষ্ঠানে নিজস্ব ক্যাপটিভ বিদ্যুৎকেন্দ্র ছিল—যেগুলো সরকারের সরবরাহ করা গ্যাস দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করত—গ্যাস সংকটের কারণে সেসব প্রতিষ্ঠানও এখন জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। ফলে গ্যাস সংকটের কারণেই বিদ্যুতের চাহিদা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে, যা তরল জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র দিয়েও পুরোপুরি সামাল দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
তবে শিগগিরই এই পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে আশা প্রকাশ করে তিনি বলেন, গ্যাস সংকট কেটে গেলে বিদ্যুতের অতিরিক্ত চাহিদাও কমে আসবে এবং সার্বিক সংকট প্রশমিত হবে।
মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে জাহেদ উর রহমান বলেন, সেখানকার সংকট কখনো নিরসনের দিকে যাচ্ছে বলে মনে হলেও কখনো আবার তা আরও জটিল রূপ নিতে পারে বলেও আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। তিনি নাগরিকদের সতর্ক করে বলেন, সামনের দিনগুলো কিছুটা অস্থির হতে পারে। বিশ্বের মোট সার পরিবহনের একটি বড় অংশ যে জলপথ দিয়ে হয়ে থাকে, সেই পথেও সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সরকার নিজের সাধ্যমতো সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে, তবে যেহেতু এটি মূলত একটি বৈশ্বিক সংকট, তাই এর কিছুটা প্রভাব দেশের ওপরও পড়ার ঝুঁকি থেকে যাচ্ছে।
তিনি নাগরিকদের প্রস্তুত থাকার এবং জ্বালানি ব্যবহারে সাশ্রয়ী হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, পরিস্থিতি যতই ভালো হোক না কেন, কিছু সংকট আসতে পারে, যা সবাইকে মিলেমিশে সামাল দিতে হবে।
ভবিষ্যতে দেশের নিজস্ব উৎস থেকে গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রম আরও সম্প্রসারণ করার পাশাপাশি এলএনজি টার্মিনালের সংখ্যা বাড়ানোর পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি। এ ছাড়া নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাত নিয়েও সরকার কাজ করছে বলে তিনি জানান, তবে স্বীকার করেন যে এসব উদ্যোগ ফল দিতে কিছুটা সময় লাগবে এবং এই অন্তর্বর্তী সময়ে কিছুটা সংকট থেকেই যেতে পারে। সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও চলতি মেয়াদে তার সুফল পাওয়া কঠিন বলে জানান তিনি, তবে স্থলভাগে অনুসন্ধান চালিয়ে গেলে মেয়াদের শেষ দিকে কিছুটা সুফল মিলতে পারে বলে আশা প্রকাশ করেন। এ প্রসঙ্গে তিনি নাগরিকদের কাছে কিছুটা সময় ও ধৈর্যের আবেদন জানান এবং জানান, আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই লোডশেডিং ও গ্যাস সংকট ধাপে ধাপে কমে আসবে।
সবশেষে তিনি বলেন, সারা বিশ্বকেই এখন জ্বালানি প্রশ্নে নতুন করে ভাবতে হবে। কোনো দেশ যদি নিজস্ব উৎস থেকে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারে বা নিজের চাহিদার বড় অংশ নিজে মেটাতে না পারে, সেই দেশ বারবার সংকটের মুখে পড়তে বাধ্য। এ জন্য বাইরের ওপর নির্ভরতা কমানোর চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে বলে জানান তথ্য উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান।

