জুলাই গণঅভ্যুত্থানে প্রাণ হারানো শহীদদের পরিবার এবং আহত যোদ্ধাদের কল্যাণে গত দুই বছরে সরকার মোট প্রায় এক হাজার ছয় কোটি টাকা ব্যয় করেছে। এই অর্থের মধ্যে রয়েছে এককালীন আর্থিক অনুদান, নিয়মিত মাসিক ভাতা এবং বিদেশে চিকিৎসার খরচ। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সূত্র থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।
মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, বর্তমানে যাচাই-বাছাই ও গেজেট সংশোধনের পর জুলাই শহীদের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে আটশ তেতাল্লিশ জনে। এ পর্যন্ত তেরো জনের শহীদ গেজেট বাতিল করা হয়েছে। অন্যদিকে তিনটি ক্যাটাগরি মিলিয়ে মোট জুলাইযোদ্ধার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে চৌদ্দ হাজার তিনশ আটষট্টি জনে। আরও দুইশ তিপ্পান্ন জন জুলাইযোদ্ধার গেজেট প্রকাশের অপেক্ষায় রয়েছে এবং আরও কিছু আবেদন বিবেচনাধীন অবস্থায় আছে।
সরকার এই সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনার জন্য নির্দিষ্ট আইন ও বিধিমালা প্রণয়ন করেছে, যার আওতায় শহীদ পরিবার ও যোদ্ধাদের কল্যাণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের জুলাইয়ে সরকারি চাকরিতে কোটা পুনর্বহালের একটি আদালতের রায়কে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীদের যে আন্দোলন শুরু হয়েছিল, তা অল্প সময়ের মধ্যেই দেশব্যাপী ব্যাপক গণআন্দোলনে রূপ নেয় এবং শেষ পর্যন্ত তা একটি বড় ধরনের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের দিকে গড়ায়। আন্দোলন চলাকালে বিভিন্ন স্থানে সহিংসতা ও সংঘর্ষে বহু মানুষ প্রাণ হারান এবং আহত হন। পরবর্তীতে তৎকালীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার নিহতদের ‘জুলাই শহীদ’ ও আহতদের ‘জুলাইযোদ্ধা’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়, এবং তাদের জন্য চিকিৎসা, আর্থিক সহায়তা ও পুনর্বাসনমূলক নানা কর্মসূচি চালু করা হয়।
বর্তমানে প্রতিটি শহীদ পরিবারকে এককালীন ত্রিশ লাখ টাকা এবং মাসিক বিশ হাজার টাকা হারে ভাতা দেওয়া হচ্ছে। আহতদের ক্ষেত্রে আঘাতের তীব্রতা অনুযায়ী তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করে সহায়তা দেওয়া হয়। সবচেয়ে গুরুতর আহতরা এককালীন পাঁচ লাখ টাকা এবং মাসিক বিশ হাজার টাকা পাচ্ছেন। অঙ্গহানি হয়েছে এমন গুরুতর আহতরা পাচ্ছেন এককালীন তিন লাখ টাকা এবং মাসিক পনেরো হাজার টাকা। আর সাধারণ আহতদের ক্ষেত্রে এককালীন এক লাখ টাকা এবং মাসিক দশ হাজার টাকা ভাতার ব্যবস্থা রয়েছে, পাশাপাশি তাদের চিকিৎসা ব্যয়ও বহন করা হচ্ছে।
মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, এ পর্যন্ত প্রায় চৌদ্দ হাজার চারশ ছত্রিশ জন জুলাইযোদ্ধাকে বিভিন্ন ধরনের আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে। শহীদ পরিবারগুলোর জন্য সঞ্চয়পত্র ও মাসিক ভাতার একটি সুনির্দিষ্ট কাঠামো রয়েছে, যেখানে পারিবারিক পরিস্থিতির ভিত্তিতে কেউ দশ লাখ, কেউ বিশ লাখ, আবার কেউ পূর্ণ ত্রিশ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র পেয়েছেন। এ পর্যন্ত আটশ চারটি পরিবারকে সঞ্চয়পত্র দেওয়া হয়েছে এবং সাতশ নব্বইটি পরিবার নিয়মিত ভাতা পাচ্ছে।
তিনি আরও জানান, শহীদ পরিবারের জন্য সঞ্চয়পত্র ও ভাতা বাবদ এ পর্যন্ত প্রায় দুইশ পঞ্চাশ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। এর বাইরে জুলাইযোদ্ধাদের এককালীন সহায়তা হিসেবে প্রায় দুইশ চৌদ্দ কোটি এবং মাসিক ভাতা হিসেবে প্রায় একশ ঊনসত্তর কোটি টাকা বিতরণ করা হয়েছে। এ ছাড়া চিকিৎসার জন্য একশ চুয়ান্ন জনকে বিদেশে পাঠানো হয়েছে, যাতে খরচ হয়েছে প্রায় তিনশ তেষট্টি কোটি টাকা।
শহীদ পরিবারের ভাতা ও সঞ্চয়পত্র বণ্টনের ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট নীতিমালা অনুসরণ করা হচ্ছে, যেখানে বাবা-মা, স্ত্রী এবং সন্তানদের মধ্যে সুবিধা ভাগ করে দেওয়া হয়। পরিবারে কেউ না থাকলে অন্য সদস্যরা পূর্ণ সুবিধা পান, আবার একাধিক সদস্য থাকলে তা সমানভাবে ভাগ হয়। তবে শহীদের স্বামী বা স্ত্রী পুনরায় বিবাহ করলে তার প্রাপ্য সুবিধা স্থগিত করা হয়। এই জটিল বণ্টন প্রক্রিয়ার কারণে অনেক ক্ষেত্রে একটি ভাতার অঙ্ক একাধিক ভাগে বিভক্ত হয়ে যাওয়ায় কোনো কোনো সুবিধাভোগী নামমাত্র অর্থ পাচ্ছেন বলেও জানা গেছে। তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্যমতে, এ ধরনের অধিকাংশ জটিলতা ইতিমধ্যে সমাধান করা হয়েছে এবং বাকিগুলো ধাপে ধাপে নিষ্পত্তি করা হচ্ছে।
সরকারি সহায়তার পাশাপাশি একটি বেসরকারি ফাউন্ডেশনও শুরুতে শহীদ পরিবার ও আহতদের আর্থিক সহায়তা দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছিল। প্রাথমিকভাবে যথেষ্ট তহবিল নিয়ে যাত্রা শুরু করলেও পরবর্তীতে আর্থিক সংকটে প্রতিশ্রুত সহায়তা পুরোপুরি দিতে পারেনি সংগঠনটি, ফলে বর্তমানে তাদের কার্যক্রম কিছুটা স্থবির হয়ে পড়েছে। এ ছাড়া শহীদ পরিবারগুলোকে বিনামূল্যে আবাসন সুবিধা দিতে একটি পৃথক আবাসন প্রকল্পও হাতে নিয়েছে সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থা।
মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, নতুন করে বড় আকারের শহীদ তালিকা প্রক্রিয়াধীন নেই, তবে বিচ্ছিন্নভাবে কিছু নতুন আবেদন যাচাই-বাছাইয়ের পর্যায়ে রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে আরও প্রায় চব্বিশশ জনের আবেদন তদন্ত করা হয়েছে, যার একটি অংশ ইতিমধ্যে গেজেটের জন্য সুপারিশ করা হয়েছে এবং বাকিদের যাচাই প্রক্রিয়া চলমান।
পুনর্বাসন কার্যক্রমের অংশ হিসেবে প্রায় তিন হাজার জুলাইযোদ্ধাকে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আত্মকর্মসংস্থানের উপযোগী করে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যার প্রশিক্ষণ কার্যক্রম ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে। এ ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসনের লক্ষ্যে একটি নতুন প্রকল্প প্রণয়নের প্রক্রিয়াও চলছে, যেখানে উপকারভোগীদের স্থায়ী জীবিকা নির্বাহে সহায়ক বিভিন্ন উদ্যোগ অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, চলতি মাসের মধ্যেই একটি প্রাথমিক প্রস্তাবনা জমা দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে, যা অনুমোদনের পর প্রকল্পের বিস্তারিত কাঠামো ও ব্যয় নির্ধারণ করা হবে।
সব মিলিয়ে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদ পরিবার ও যোদ্ধাদের কল্যাণে সরকারের এই বিশাল আর্থিক সহায়তা কার্যক্রম একদিকে যেমন তাদের আত্মত্যাগের স্বীকৃতির প্রতিফলন, তেমনি দীর্ঘমেয়াদে তাদের স্বাবলম্বী জীবনযাপনের পথ তৈরি করাও এই উদ্যোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

