স্বৈরাচারের কবল থেকে মুক্তির পর জুলাইয়ের কৃতিত্ব নিয়ে বিভাজনের রাজনীতি করলে জুলাই কারওই থাকবে না বলে মন্তব্য করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। রাজনৈতিক দলগুলোর উদ্দেশে তিনি বলেছেন, জুলাই কোনো একক ব্যক্তি বা দলের নয়, এটি সবার।
আজ বুধবার (৫ আগস্ট) সকালে রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে অবস্থিত ঐতিহাসিক জুলাই অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন।
নিজের বেঁচে থাকার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, পৃথিবীর জঘন্যতম ও ঘৃণ্যতম হত্যাকাণ্ড এবং ভয়াবহ স্বৈরাচারের অভিজ্ঞতা তারা দেখেছেন। তিনি বলেন, “যদি আমরা আয়না ঘরে যাই, যেখানে আমার ৬১ দিনের অভিজ্ঞতা আছে, সেখানে একটা জানোয়ার ২৪ ঘণ্টা থাকতে পারে না, আমরা সেখানে থেকেছি।”
তিনি বলেন, তার ভাই মীর কাসেম এবং তার ছেলে ব্যারিস্টার আরমান এখনো সেই ঘটনার কারণে ট্রমাটাইজড। মীর কাসেমের সঙ্গে নিজের সম্পর্কের কথা উল্লেখ করে সালাহউদ্দিন বলেন, তারা একসঙ্গে কারাভোগ করেছেন। তিনি বলেন, “আমি বললাম, ভাই কেন ফেরত আসলেন? তিনি বললেন, আমি যদি না আসি আমার ছেলেটাকে ধরে নিয়ে যাবে। ফাঁসি তো তার হলো, কিন্তু ছেলেকেও তো ধরে নিয়ে গেল। আমি একটা জীবন্ত ইতিহাস।”
তিনি আরও বলেন, “বাবা এ জন্য ফিরে এসেছিলেন তার সন্তানকে রক্ষা করবেন, কিন্তু সন্তানকে রক্ষা করতে পারেননি।”
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, “সে রকম একটা স্বৈরাচারের কবল থেকে মুক্তির পরে আমরা যদি বলি জুলাই কার? জুলাই কার? তাহলে জুলাই আমাদের কারোই থাকবে না। এই অবস্থা থেকে আমাদের মুক্তি পেতে হবে।”
তিনি বিশ্বের বিভিন্ন জাতির দীর্ঘ স্বাধীনতা সংগ্রামের উদাহরণ তুলে ধরে রুশ বিপ্লবী নেতা ভ্লাদিমির লেনিনের বক্তব্য উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, “পৃথিবীতে অনেক জাতি আছে, স্বাধীনতার জন্য শতবর্ষ সংগ্রাম করে। কোনোদিন স্বাধীনতা পায় না। শতাব্দীর পর শতাব্দী চলে যায়। মহামতি লেলিন বলেছিলেন, ‘দেয়ার আর ডিকেডস, নাথিং হ্যাপেনস দেয়ার। বাট দেয়ার আর ডেইস অ্যান্ড উইকস ডিকেডস হ্যাপেনস দেয়ার’। আমরা সেই শতাব্দীকে নিয়ে এসেছি।”
তিনি বলেন, এটি নিউটনের কোনো আপেল পড়ে যাওয়ার মতো ঘটনা নয়, বরং আন্দোলন, বিপ্লব ও গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে সেই পরিবর্তন অর্জন করতে হয়েছে। তিনি বলেন, “সেই আপেলকে পেড়ে নিতে হয়েছে। পাকাতে হয়েছে। আমরা সেই আপেলকে নিয়ে এসেছি।” একই সঙ্গে তিনি কোথাও দলীয়করণ না করার আহ্বান জানান।
গণভোটের গণরায় বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়ে জামায়াত নেতা মিয়া গোলাম পরওয়ারের বক্তব্যের প্রসঙ্গে সালাহউদ্দিন বলেন, “আসুন, একসঙ্গে বসি। সংবিধান সংশোধন কমিটিতে আপনাদের আহ্বান জানিয়েছি, আপনারা এখনো নাম দেন নাই। গতকালকে প্রথম বৈঠক করেছি। জুলাই জাতীয় সনদের প্রত্যেকটা অক্ষর বাস্তবায়ন করা হবে, আমরা প্রতিশ্রুতি দিয়েছি।”
তিনি বলেন, “গণরায় বাস্তবায়ন কি সংস্কার পরিষদে গেলে হবে, সংবিধান সংশোধন কমিটিতে গেলে হবে না? আমি একবার বলেছিলাম, তাল ধপ করিয়া পড়িল, না পড়িয়া ধপ করিল—এক কথাই। কিন্তু সাংবিধানিক প্রক্রিয়া হচ্ছে সংস্কার করা।”
সালাহউদ্দিন বলেন, “মাঠের রাজনীতি করতে পারবেন, সংস্কার কমিশন করবেন বা জাতীয় সংস্কার পরিষদ করবেন, সাংবিধানিক সংস্কার পরিষদ করবেন, এগুলো সবই ওয়ার্ডিং। বাস্তবতায় যেটা আসতে হবে, সংস্কার। সেটা গ্রহণ করতে হবে সংসদে।”
তিনি আরও বলেন, যখন কোনো আন্দোলনকে নিয়মতান্ত্রিক ও গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে পরিচালিত হতে দেওয়া হয় না, তখনই সহিংস ও রক্তাক্ত আন্দোলন অনিবার্য হয়ে ওঠে। বাংলাদেশেও সেটিই হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সালাহউদ্দিন বলেন, “২০০৯ থেকে ২০২৪-এর সেই সোপানগুলো বাদ দিলে জুলাইয়ের ৩৬ দিনে কি নিউটনের আপেল টপকিয়ে পড়েছে? না। বন্ধুদের বুঝতে বলব, যারা জুলাই চেতনার ওপর নির্ভর করে রাজনীতি করছে, সেই রাজনীতি করা যাবে না।”
তিনি আরও বলেন, “একাত্তরের চেতনাকে বিক্রি করতে করতে শেখ হাসিনা দিল্লিতে গিয়ে বসে আছে। আমি অনেকবার বক্তব্য দিয়েছি, শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক মৃত্যু হয়েছে ঢাকায়, দাফন হয়েছে দিল্লিতে।”
বিএনপির এই নেতা বলেন, চেতনার নামে রাজনীতি করতে করতে দেশকে এমন জায়গায় নেওয়া হয়েছিল যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বললেও মানুষ ঘৃণা করত। তাই জুলাইয়ের চেতনাকে যেন কখনো অসম্মান করতে না হয়, সে ধরনের রাজনীতি করার আহ্বান জানান তিনি।
তিনি বলেন, “জুলাই আমাদের সবার, বাংলাদেশের ২০ কোটি মানুষের সবার। আমরা কেউ কেউ হয়তো নেতৃত্ব দিয়েছি, যারা শহীদ হয়েছেন, তারাই আসল জুলাই যোদ্ধা, আসল নেতা।”
সালাহউদ্দিন আহমদ আরও বলেন, শহীদদের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন করাই সবার দায়িত্ব। তিনি বলেন, “তাদের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন করাই হবে আমাদের জন্য ফরজ। অথচ জুলাইয়ের কৃতিত্ব নেওয়ার জন্য, জুলাই নিয়ে রাজনীতি করার জন্য সবাই প্রতিযোগিতায় নেমেছে। আমরা প্রতিযোগিতা করছি জুলাই বাস্তবায়নের জন্য।”

