বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রায় দুই বছর পেরিয়ে গেলেও এতে কতজন মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন, তা নিয়ে বিতর্ক এখনো থামেনি। বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই প্রশ্ন ও সংশয় আরও ঘনীভূত হচ্ছে, আর কোনো কোনো মহল বিষয়টিকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যেও ব্যবহার করছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এই বিতর্কের মূলে রয়েছে সরকারি হিসাব ও জাতিসংঘের পরিসংখ্যানের মধ্যে বিশাল ব্যবধান। গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে জাতিসংঘের প্রতিবেদন প্রকাশের পর অনেকেই ভেবেছিলেন সময়ের সঙ্গে এই ফারাক কমে আসবে। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ প্রকাশিত তালিকায় জুলাই শহীদের সংখ্যা দেখানো হয়েছে আটশ তেতাল্লিশ জন, যেখানে জাতিসংঘের প্রতিবেদনে এই সংখ্যা প্রায় চৌদ্দশ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ দুই হিসাবের ব্যবধান এখনো পাঁচশর বেশি।
একজন মানবাধিকারকর্মী মন্তব্য করেছেন, এই বিতর্ক অনেক ক্ষেত্রে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক শাসকগোষ্ঠীর পক্ষে যাচ্ছে এবং তাদের সমর্থকরা এটিকে ব্যবহার করে গণঅভ্যুত্থান সম্পর্কে বিভ্রান্তিকর প্রচারণা চালানোর চেষ্টা করছে। বিশ্লেষকদের একাংশের ধারণা, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় তালিকা তৈরিতে যথেষ্ট গুরুত্ব না দেওয়ার কারণেই এই ফারাক এত বড় আকার নিয়েছে। একজন লেখক ও গবেষকের মতে, এখনো প্রতিটি গ্রামে গিয়ে অনুসন্ধান চালিয়ে প্রকৃত সংখ্যা বের করার সুযোগ রয়েছে, নইলে এই বিতর্ক অমীমাংসিতই থেকে যাবে—ঠিক যেভাবে একাত্তরের শহীদ সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক আজও রয়ে গেছে।
সরকারের পক্ষ থেকে অবশ্য দাবি করা হচ্ছে, প্রকৃত সংখ্যা নির্ণয়ে নির্ভুল তালিকা তৈরির চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। এ লক্ষ্যে জুলাই গণঅভ্যুত্থান নিয়ে পৃথক একটি অধিদপ্তরও গঠন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী।
জাতিসংঘের প্রতিবেদনে কী পাওয়া গেছে: ২০২৪ সালে কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে সহিংসতা ও প্রাণহানি শুরু হওয়ার পর থেকেই আন্দোলনকারী, ভুক্তভোগী পরিবার ও মানবাধিকারকর্মীরা জাতিসংঘের কাছে নিরপেক্ষ তদন্তের আহ্বান জানিয়ে আসছিলেন। ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার কিছুদিন আগে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী নিজেও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সহায়তা চেয়েছিলেন। পরবর্তীতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণে জাতিসংঘ মানবাধিকার হাইকমিশনারের কার্যালয়ের একটি প্রতিনিধিদল বাংলাদেশে এসে তদন্ত শুরু করে।
প্রায় পাঁচ মাসের তদন্ত শেষে জেনেভায় এক সংবাদ সম্মেলনে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়। এতে বলা হয়, নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে বিক্ষোভ ও তার পরবর্তী সহিংসতায় আনুমানিক চৌদ্দশ মানুষ নিহত হয়েছেন। প্রতিবেদন অনুযায়ী, নিহতদের বেশিরভাগই মারা গেছেন নিরাপত্তা বাহিনীর ব্যবহৃত প্রাণঘাতী অস্ত্র ও সামরিক রাইফেলের গুলিতে, এবং এই দমন-অভিযানের নেতৃত্বে ছিলেন তৎকালীন সরকারপ্রধান ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, নিহতদের প্রায় বারো থেকে তেরো শতাংশ ছিল শিশু, আর সাড়ে এগারো হাজারের বেশি মানুষকে নির্বিচারে আটক ও নির্যাতনের অভিযোগও উঠে এসেছে।
তথ্যের উৎস কোথায়: জাতিসংঘের তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, তাদের তথ্যের একটি বড় অংশ এসেছে বাংলাদেশের সরকারি সংস্থাগুলোর কাছ থেকেই। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে তারা প্রাথমিকভাবে আটশ একচল্লিশ জন নিহতের একটি তালিকা পেয়েছিলেন, আর একটি গোয়েন্দা সংস্থার কাছ থেকে আরও তিনশ চৌদ্দ জনের পৃথক একটি তালিকা সংগ্রহ করেন, যা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত ছিল না। এ ছাড়া বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকেও একাধিক তালিকা সংগ্রহ করা হয়, এবং একই নাম একাধিকবার এলে তা একবারই গণনা করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। হাসপাতালের চিকিৎসক, কর্মকর্তা, ভুক্তভোগী পরিবার এবং মর্গ থেকেও তথ্য সংগ্রহ করেছেন তদন্তকারীরা। তবে নিহতদের পূর্ণাঙ্গ নামের তালিকা জাতিসংঘের পক্ষ থেকে প্রকাশ করা হয়নি।
আন্দোলনকারীদের নিজস্ব উদ্যোগ: আন্দোলন শুরুর পর থেকেই নেতৃত্বদানকারী ছাত্র সংগঠনগুলো নিজস্বভাবে হতাহতের হিসাব রাখার চেষ্টা করেছিল এবং একটি প্রাথমিক তালিকা তৈরি করেছিল। সরকার পতনের পর তারা আরও বিস্তারিতভাবে তথ্য সংগ্রহ শুরু করে। প্রায় এক মাসের বেশি সময় কাজ করার পর তারা জানায়, সারা দেশ থেকে প্রায় এক হাজার পাঁচশ একাশি জন নিহতের তথ্য পাওয়া গেছে। এই তথ্য সংগ্রহে গণমাধ্যম, হাসপাতাল ও তৃণমূল পর্যায়ের মানুষের সহযোগিতা নেওয়া হয়েছিল বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট একজন সংগঠক। তবে স্বল্প সময়ে কাজ করার কারণে সব নামের বিস্তারিত তথ্য যাচাই করা সম্ভব হয়নি, ফলে পরবর্তীতে খসড়া তালিকাটি অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে যাচাইয়ের জন্য হস্তান্তর করা হয়।
সরকারি তালিকা প্রণয়ন প্রক্রিয়া: আন্দোলনকারীদের তথ্য পাওয়ার আগেই সরকার নিজস্বভাবে একটি খসড়া তালিকা তৈরির চেষ্টা করছিল। বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালের কাছে থাকা তথ্যের ভিত্তিতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় একটি প্রাথমিক তালিকা প্রকাশ করে এবং পরিবারের সদস্যরা যেন তথ্য সংশোধন ও সংযোজন করতে পারেন, সে জন্য একটি পৃথক ওয়েবসাইটও চালু করা হয়। যাদের নাম তালিকায় না থাকত, তাদের স্বজনদের স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল।
জুলাই গণঅভ্যুত্থান অধিদপ্তরের মহাপরিচালক জানিয়েছেন, প্রতিটি জেলা-উপজেলায় পৃথক যাচাই কমিটি গঠন করা হয়েছিল, যেখানে প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের পাশাপাশি জুলাইযোদ্ধাদের প্রতিনিধিরাও ছিলেন। যাচাইকৃত নামগুলো পরবর্তীতে সরকারিভাবে প্রজ্ঞাপন আকারে প্রকাশ করা হয়, যদিও প্রকাশের পরও এই তালিকায় একাধিকবার পরিবর্তন এসেছে। চলতি বছরের মার্চে প্রকাশিত এক গেজেটে আটশ ছাপ্পান্ন জনের নাম থাকলেও, পরবর্তীতে ভুল তথ্যের অভিযোগে তদন্তে প্রমাণিত হওয়ায় তেরো জনের নাম বাদ দিয়ে তা আটশ তেতাল্লিশে নামিয়ে আনা হয়। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই তালিকায় সংযোজন-বিয়োজনের প্রক্রিয়া এখনো চলমান রয়েছে।
ব্যবধানের পেছনের কারণ: বিশ্লেষকদের মতে, এই বিশাল ফারাকের একটি প্রধান কারণ হলো, সহিংসতায় নিহত সবাইকে সরকারি তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। সরকার মূলত নির্দিষ্ট সংজ্ঞা অনুযায়ী ‘জুলাই শহীদ’দের তালিকা তৈরি করছে। সংশ্লিষ্ট আইন অনুযায়ী, তৎকালীন সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা তখনকার ক্ষমতাসীন দলের সদস্যদের হামলায় নিহত ব্যক্তিরাই এই তালিকায় স্থান পাচ্ছেন। ফলে আন্দোলনের সময় নিহত পুলিশ সদস্য বা তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের এই তালিকায় অন্তর্ভুক্তির সুযোগ নেই। উল্লেখ্য, পুলিশ সদর দপ্তর ২০২৪ সালের অক্টোবরে আন্দোলনকালে নিহত চুয়াল্লিশ জন পুলিশ সদস্যের একটি পৃথক তালিকা প্রকাশ করেছিল।
অন্যদিকে জাতিসংঘের তদন্তকারীরা বিক্ষোভকারী, পুলিশ সদস্য কিংবা তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের সমর্থক—পক্ষ নির্বিশেষে সব নিহতের তথ্য নিয়েই তাদের হিসাব তৈরি করেছেন। একজন মানবাধিকারকর্মীর পরামর্শ, সরকারের উচিত জুলাই শহীদদের তালিকার পাশাপাশি অন্যান্য পক্ষে নিহতদেরও পৃথক তালিকা তৈরি করে সামগ্রিক একটি সংখ্যা প্রকাশ করা।
দালিলিক প্রমাণের সংকট: সরকারি ও বেসরকারি হিসাবের মধ্যে ফারাকের আরেকটি বড় কারণ হলো, অনেক মৃত্যুর দালিলিক প্রমাণ না থাকা। জাতিসংঘের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, আন্দোলনের সময় চিকিৎসাকর্মীরা প্রচণ্ড চাপে থাকায় অনেক তথ্য যথাযথভাবে নথিভুক্ত হয়নি। গ্রেপ্তার এড়াতে অনেক পরিবার ময়নাতদন্ত ছাড়াই স্বজনের মরদেহ দাফন করেছে, আর কিছু ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষকে বিক্ষোভ-সম্পর্কিত মৃত্যুর তথ্য নিবন্ধন থেকে বিরত রাখতে ভয় দেখানো হয়েছিল বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। বর্তমানে সরকারি তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে হাসপাতালের নথি, মৃত্যু সনদ বা ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনের মতো দালিলিক প্রমাণকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে, যার ফলে অনেক প্রকৃত ভুক্তভোগীর নামও তালিকা থেকে বাদ পড়ছে বলে অভিযোগ করেছেন আন্দোলনের এক সাবেক নেতা। তবে অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, যথাযথ প্রমাণ ছাড়া তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে শিথিলতা দেখানোর সুযোগ নেই, কারণ তাতে ভুয়া নাম ঢুকে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।
অন্যান্য কারণ: আন্দোলনের সময় নিহত অনেকের পরিচয় শনাক্ত করা যায়নি বলে তাদের বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা হয়েছিল। শুধু ঢাকার একটি কবরস্থানেই এমন একশ চৌদ্দটি মরদেহ দাফন করা হয়, যার মধ্যে ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে মাত্র আটজনের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। বাকিদের কোনো দাবিদার এখনো পাওয়া যায়নি। এ ছাড়া ইন্টারনেট সুবিধার অভাব বা প্রশাসনিক জটিলতার আশঙ্কায় অনেক পরিবার সরকারি তালিকায় নাম তোলার ব্যাপারে আগ্রহ দেখায়নি বলেও দাবি করেছেন আন্দোলনের নেতারা।
বিশ্লেষকদের অভিমত, এসব সমস্যার সমাধান না হলে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে প্রকৃত প্রাণহানির সংখ্যা নিয়ে অনিশ্চয়তা দীর্ঘমেয়াদে থেকেই যাবে, যা ভবিষ্যতে ইতিহাস রচনা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিতকরণ—উভয় ক্ষেত্রেই জটিলতা তৈরি করতে পারে।

