দেশের সংবিধানে ব্যাপক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছে সদ্য গঠিত একটি বিশেষ সংসদীয় কমিটি। জুলাই জাতীয় সনদকে মূল কাঠামো হিসেবে ধরে, তার সঙ্গে ক্ষমতাসীন দলের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি এবং সনদে যুক্ত ভিন্নমতগুলো সমন্বয় করেই চূড়ান্ত সংশোধনী প্রস্তাব তৈরির পরিকল্পনা করছে কমিটি।
গতকাল মঙ্গলবার জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত কমিটির প্রথম বৈঠক শেষে সদস্যরা সাংবাদিকদের এই তথ্য জানান। তারা বলেন, সংবিধানের বিভিন্ন অনুচ্ছেদের মধ্যে ধারাবাহিকতা ও সামঞ্জস্য বজায় রাখতে হলে পুরো সংবিধানই খতিয়ে দেখতে হবে। চূড়ান্ত সুপারিশ প্রণয়নের আগে সংবিধান বিশেষজ্ঞ, আইনজীবী, রাজনৈতিক দল এবং বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনের মতামত নেওয়া হবে বলেও জানানো হয়।
গত ১৩ জুলাই সংসদে বারো সদস্যবিশিষ্ট এই বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়, যার নেতৃত্বে রয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তবে কমিটি গঠনের সময় প্রধান বিরোধী দল এতে অংশ নেয়নি। সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনে বিরোধী দলের অসম্মতির প্রেক্ষিতে জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি এ ধরনের সংসদীয় কমিটি গঠনের বিরোধিতা করেছিল।
প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচনের পাশাপাশি অনুষ্ঠিত গণভোটে অনুমোদিত জুলাই জাতীয় সনদে একটি পৃথক সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের প্রস্তাব ছিল, যেখানে সদস্যদের সংসদ সদস্য এবং পরিষদ সদস্য—উভয় পরিচয়ে আলাদাভাবে শপথ নেওয়ার বিধান রাখা হয়েছিল। জামায়াত, এনসিপি ও তাদের মিত্র দলগুলো এই দ্বিতীয় শপথ গ্রহণ করলেও প্রধান বিরোধী দল তা করেনি, কারণ তাদের যুক্তি ছিল সংবিধানে এমন পরিষদ গঠনের কোনো সুস্পষ্ট বিধান নেই। এরপরই সরকার বিকল্প হিসেবে এই বিশেষ সংসদীয় কমিটি গঠন করে, এই যুক্তিতে যে সংবিধান সংশোধনের ক্ষমতা কেবল সংসদেরই রয়েছে। বিরোধী দলকে এই কমিটিতে পাঁচজন প্রতিনিধি মনোনয়নের আহ্বানও জানানো হয়েছিল।
বৈঠক-সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, প্রায় এক ঘণ্টার এই বৈঠকে মূলত কমিটির কার্যপ্রণালি নিয়ে আলোচনা হয়। সদস্যদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যেন তারা জুলাই জাতীয় সনদের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ সংশোধনী প্রস্তাব প্রস্তুত করেন। উল্লেখযোগ্য বিষয়, বিরোধী দল বা তাদের মিত্র নন এমন একমাত্র সদস্য বৈঠকে অনুপস্থিত ছিলেন।
অন্য একটি সরকারি অনুষ্ঠানে যোগ দিতে বৈঠক শেষ হওয়ার আগেই বেরিয়ে যান কমিটির প্রধান। পরে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, সব পক্ষের মতামত শোনা হবে এবং প্রয়োজনীয় সুপারিশ অন্তর্ভুক্ত করেই চূড়ান্ত প্রতিবেদন তৈরি করা হবে। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র সংস্কারের প্রতিশ্রুত বিষয়গুলোও সুপারিশে রাখার চেষ্টা করবে কমিটি বলে তিনি জানান।
সুপারিশ জমাদানের কোনো সুনির্দিষ্ট সময়সীমা এখনো ঠিক হয়নি বলে জানান কমিটির প্রধান। তিনি বলেন, আগ্রহী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকেও মতামত দেওয়ার আহ্বান জানানো হবে। বিরোধী দল শেষ পর্যন্ত কমিটিতে যোগ দেবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন, তবে তারা না এলেও তাদের প্রস্তাব ও মতামত বিবেচনায় নেওয়া হবে বলে নিশ্চিত করেন। তার ভাষায়, সংবিধান সংশোধনের প্রস্তাব যেন জনগণের প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটায় এবং সর্বজনগ্রাহ্য হয়, সেটিই তাদের লক্ষ্য।
জুলাই জাতীয় সনদের সংস্কার প্রস্তাব নিয়ে তিনি ব্যাখ্যা করেন, এটি মূলত রাজনৈতিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে প্রণীত একটি দলিল। বিভিন্ন দল যেসব বিষয়ে ভিন্নমত পোষণ করেছে, সেগুলোও বিবেচনায় নেওয়া হবে। এ ছাড়া দলের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির বিষয়গুলোও এবং সনদ প্রণয়নকালে আলোচিত হলেও চূড়ান্ত সনদে জায়গা না পাওয়া প্রস্তাবগুলোও পর্যালোচনায় আনা হবে বলে তিনি জানান।
কমিটির অপর একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য তথা আইনমন্ত্রী বলেন, জুলাই জাতীয় সনদ ও জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মূল চেতনাকে সামনে রেখেই সংবিধান সংশোধনের কাজ পরিচালিত হবে। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, সনদকে উপেক্ষা করে কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মতাদর্শ চাপিয়ে দেওয়ার সুযোগ তাদের নেই। পুরো সংবিধান পর্যালোচনার বিষয়ে তিনি বলেন, ধারাগুলোর মধ্যে সামঞ্জস্য রক্ষা করতে হলে সামগ্রিক পর্যালোচনা আবশ্যক।
জুলাই জাতীয় সনদের কিছু প্রস্তাবের সঙ্গে বিরোধী দলের অবস্থানগত পার্থক্য প্রসঙ্গে আইনমন্ত্রী জানান, সনদে বিরোধী দলের ভিন্নমতের নোট ইতিমধ্যেই অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তার মতে, কোনো বিষয়ে বিরোধী দলের ভিন্নমত যদি তাদের নির্বাচনী ইশতেহারেও প্রতিফলিত হয়, তাহলে সেটিও যথাযথ গুরুত্ব পাবে, কারণ তা-ও জুলাই জাতীয় সনদেরই একটি অংশ বলে বিবেচিত হবে। তিনি সনদকে একটি ‘পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন।
আইনমন্ত্রী আরও বলেন, বিরোধী দল কমিটিতে অংশ না নিলেও তারা কমিটির কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করতে পারবে এবং কমিটি নির্ধারিত কাঠামোর মধ্যে থেকে কাজ করছে কি না, তা যাচাই করতে পারবে। তার ভাষায়, বিরোধী দল যদি মনে করে কমিটি সনদ থেকে বিচ্যুত হয়েছে, তাহলে সমালোচনার পূর্ণ অধিকার তাদের রয়েছে এবং যুক্তিসংগত সমালোচনা গ্রহণের চেষ্টা করবে কমিটি।
তিনি জানান, কমিটি জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ পরিবার, আহত যোদ্ধা, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের কর্মী, সাংবাদিক, আইনজীবী সমিতি, অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি, বিভিন্ন পেশাজীবী এবং সনদ প্রণয়নে যুক্ত ব্যক্তিদের সঙ্গেও মতবিনিময় করবে।
কমিটির অন্যতম সদস্য প্রধান হুইপ বলেন, এই কমিটির লক্ষ্য কেবল বর্তমান সময়ের জন্য নয়, বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের উপযোগী একটি টেকসই সংবিধান তৈরি করা। বিরোধী দল শেষ পর্যন্ত এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত হবে বলেও তিনি প্রত্যাশা প্রকাশ করেন।
কমিটির অন্যান্য সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী, একজন সংসদ সদস্য, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী, ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী, সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী এবং সংরক্ষিত নারী আসনসহ বিভিন্ন নির্বাচনী এলাকার একাধিক সংসদ সদস্য।
বিশ্লেষকদের মতে, বিরোধী দলবিহীন এই প্রক্রিয়া শেষ পর্যন্ত কতটা সর্বজনগ্রাহ্য একটি সংবিধান সংশোধনী তৈরি করতে পারবে, তা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে যথেষ্ট আগ্রহ ও সংশয়—উভয়ই বিদ্যমান। আগামী দিনে বিরোধী দলের অংশগ্রহণ এবং বিভিন্ন অংশীজনের মতামত গ্রহণ প্রক্রিয়া কীভাবে এগোয়, তার ওপরই নির্ভর করছে এই সংস্কার উদ্যোগের গ্রহণযোগ্যতা।

