দীর্ঘদিন ধরে চলা তীব্র গ্যাস–সংকটের কারণে গাজীপুরের শিল্পাঞ্চলে নতুন মাত্রার সংকট দেখা দিয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে জেলার প্রায় বিশ শতাংশ কারখানা কর্তৃপক্ষ সরকারি ছুটির সঙ্গে যুক্ত করে টানা চার দিনের ছুটি ঘোষণা করেছে, যার ফলে আজ বুধবার থেকেই শত শত পোশাকশ্রমিক গ্রামের বাড়ির উদ্দেশে রওনা হয়েছেন।
শ্রমিকদের একটি অংশ এই অপ্রত্যাশিত ছুটিকে পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ হিসেবে দেখলেও, শিল্পমালিকদের জন্য এটি নতুন করে উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের আশঙ্কা, উৎপাদন এভাবে ব্যাহত হতে থাকলে নির্ধারিত সময়ে বিদেশি ক্রেতাদের রপ্তানি আদেশ সরবরাহ করা কঠিন হয়ে পড়বে।
দীর্ঘদিন ধরে চলা এই গ্যাস–সংকট মোকাবিলায় কারখানা মালিকেরা ইতিমধ্যে নানা কৌশল অবলম্বন করেছিলেন—কোথাও কিছু উৎপাদন লাইন সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে, কোথাও চালু মেশিনের সংখ্যা কমিয়ে আনা হয়েছে, আবার কোথাও রাতের শিফটে উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা চলছিল। তবে এবার নতুন সংযোজন হিসেবে যুক্ত হয়েছে সরকারি ছুটির সঙ্গে মিলিয়ে দীর্ঘ ছুটি ঘোষণার সিদ্ধান্ত।
চার দিনের এই ছুটি ঘোষণার পর গতকাল মঙ্গলবার রাত থেকেই ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের কালিয়াকৈর উপজেলার চন্দ্রা ত্রিমোড়, কোনাবাড়ী এলাকা এবং ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের চান্দনা চৌরাস্তা, ভোগড়াসহ বিভিন্ন বাসস্ট্যান্ড ও পরিবহন কাউন্টারে শ্রমিকদের ভিড় লক্ষণীয়ভাবে বাড়তে দেখা গেছে। অনেকেই এই সুযোগে দেশের উত্তরাঞ্চলীয় বিভিন্ন জেলার উদ্দেশে রওনা হচ্ছেন, ফলে সেসব রুটের বাসগুলোতে যাত্রীর চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
আজ সকাল নয়টার দিকে চন্দ্রা এলাকায় কথা হয় একটি টেক্সটাইল কারখানার এক শ্রমিকের সঙ্গে। তিনি বলেন, কাজ না থাকলে কারখানায় বসে থাকার চেয়ে কয়েক দিনের জন্য বাড়ি যেতে পারাটাই ভালো, তবে তিনি চান দ্রুত গ্যাস–সংকটের সমাধান হয়ে কারখানাগুলো আবার পুরোপুরি সচল হোক।
গাজীপুর শিল্পাঞ্চলের একজন পুলিশ কর্মকর্তা জানান, একদিনের সরকারি ছুটির সঙ্গে যুক্ত করে জেলার অনেক কারখানায় চার দিনের ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে, এবং তাদের হিসাব অনুযায়ী জেলার প্রায় বিশ শতাংশ কারখানা এই ছুটির আওতায় পড়েছে। ছুটি পেয়ে শ্রমিকদের একটি বড় অংশ পরিবারের সঙ্গে সময় কাটাতে গ্রামের বাড়িতে যাচ্ছেন।
কোনাবাড়ী হাইওয়ে পুলিশের একজন কর্মকর্তা জানান, ছুটি পাওয়া শ্রমিকদের ব্যাপক চাপে গতরাত থেকেই চন্দ্রা ত্রিমোড় এলাকায় যানবাহনের জট তৈরি হয়েছে, এবং আজ সকালেও শত শত মানুষ ও যানবাহনের ভিড়ে সড়কে যান চলাচল থেমে থেমে চলছে।
শিল্প পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গ্যাস–সংকটের কারণে যেসব কারখানা চার দিনের জন্য বন্ধ রাখা হয়েছে, তার সিংহভাগই তৈরি পোশাক, টেক্সটাইল, নিটিং, ডাইং ও ওয়াশিং খাতের প্রতিষ্ঠান। গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত অনেক কারখানাই উৎপাদন সীমিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
উল্লেখ্য, গাজীপুর দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পাঞ্চল হিসেবে পরিচিত, যেখানে কয়েক হাজার তৈরি পোশাক, টেক্সটাইল, স্পিনিং, ডাইং, ওয়াশিং, সিরামিক, ওষুধ, প্লাস্টিক ও অন্যান্য উৎপাদনমুখী কারখানা রয়েছে।
স্থানীয় একজন তরুণ শিল্প উদ্যোক্তা, যিনি একটি পোশাক কারখানার চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন, তিনি বলেন, অব্যাহত গ্যাস–সংকটের কারণে দিন দিন রপ্তানি আদেশ কমে যাচ্ছে। বিদেশি ক্রেতারা মনে করছেন এই সমস্যা দীর্ঘায়িত হলে পুরো শিল্প খাতই ঝুঁকির মুখে পড়বে। তার প্রতিষ্ঠানেও গ্যাসের সমস্যার কারণে সরকারি ছুটির সঙ্গে মিল রেখে কর্মীদের চার দিনের ছুটি দিতে হয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, সরকার শিগগির এই সংকটের সমাধান করবে।
স্থানীয় গ্যাস সরবরাহকারী কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, গাজীপুরে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় সাড়ে পাঁচশ মিলিয়ন ঘনফুট হলেও বর্তমানে সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে মাত্র তিনশ মিলিয়ন ঘনফুটের কাছাকাছি। অর্থাৎ প্রতিদিন প্রায় দুইশ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি থেকে যাচ্ছে। এই ঘাটতির কারণেই শিল্পাঞ্চলের অধিকাংশ এলাকায় প্রয়োজনীয় গ্যাসের চাপ বজায় রাখা সম্ভব হচ্ছে না, বিশেষত সকাল ও দিনের বেলায় উৎপাদন সবচেয়ে বেশি ব্যাহত হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের একজন ব্যবস্থাপক জানান, জেলায় বর্তমানে প্রায় পঁয়তাল্লিশ শতাংশ গ্যাসের ঘাটতি বিরাজ করছে। কম চাপের কারণে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েছে কালিয়াকৈর, শ্রীপুর ও টঙ্গী শিল্প এলাকার কারখানাগুলো। তিনি জানান, সংকট নিরসনে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
কোনাবাড়ী এলাকার একটি কারখানার ব্যবস্থাপক মন্তব্য করেন, গ্যাস–সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে দেশের সামগ্রিক রপ্তানি খাত বড় ধরনের চাপে পড়বে। আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে পণ্য সরবরাহ করতে ব্যর্থ হলে ভবিষ্যতে নতুন ক্রয়াদেশ কমে যাওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে বলে তিনি সতর্ক করেন।

