বাংলাদেশে পাঁচ বছরের কম বয়সী প্রতি চারজন শিশুর মধ্যে প্রায় একজনই খর্বাকৃতির সমস্যায় ভুগছে। একটি সাম্প্রতিক জাতীয় জরিপ অনুযায়ী, দীর্ঘমেয়াদি অপুষ্টি এবং শৈশবের শুরুর দিকে দুর্বল স্বাস্থ্যের কারণে এসব শিশুর স্বাভাবিক শারীরিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয়েছে।
জরিপের তথ্য বলছে, চব্বিশ শতাংশ শিশু মাঝারি বা তীব্র মাত্রার খর্বাকৃতি সমস্যায় আক্রান্ত। খর্বাকৃতি বলতে বোঝানো হয়, একটি শিশুর উচ্চতা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত মানদণ্ডের তুলনায় বয়স অনুযায়ী উল্লেখযোগ্যভাবে কম হওয়া। এটি দীর্ঘস্থায়ী অপুষ্টির অন্যতম স্পষ্ট সংকেত এবং জীবনের প্রথম হাজার দিনে পুষ্টিঘাটতির প্রতিফলন, যে সময়টি শারীরিক ও মস্তিষ্কের বিকাশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধরা হয়।
দেশজুড়ে তেইশ হাজারের বেশি শিশুর শারীরিক পরিমাপের ভিত্তিতে পরিচালিত এই জরিপে সামাজিক-অর্থনৈতিক বৈষম্যের একটি স্পষ্ট চিত্রও উঠে এসেছে। সবচেয়ে দরিদ্র পরিবারের শিশুদের মধ্যে খর্বাকৃতির হার বত্রিশ দশমিক তিন শতাংশ, যেখানে সবচেয়ে সচ্ছল পরিবারের শিশুদের মধ্যে এই হার ষোলো দশমিক এক শতাংশ—অর্থাৎ দরিদ্র পরিবারের শিশুরা প্রায় দ্বিগুণ ঝুঁকিতে রয়েছে। গ্রামের শিশুরা শহরের তুলনায় বেশি ক্ষতিগ্রস্ত, আর মেয়েদের চেয়ে ছেলে শিশুদের মধ্যে সমস্যাটি তুলনামূলক বেশি দেখা যাচ্ছে।
গত তিন দশকে পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে ঠিকই, তবে বাংলাদেশ এখনো বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে “উচ্চ প্রকোপ” শ্রেণিতেই রয়ে গেছে। ১৯৯৭ সালে এই হার ছিল প্রায় ষাট শতাংশের কাছাকাছি, যা ২০২৫ সালে নেমে এসেছে চব্বিশ শতাংশে। সংস্থাটির মানদণ্ড অনুযায়ী, হার বিশ থেকে ত্রিশ শতাংশের মধ্যে থাকলে তা “উচ্চ” এবং ত্রিশ শতাংশের বেশি হলে তা “অত্যন্ত উচ্চ” হিসেবে বিবেচিত হয়। ২০১৯ সালে বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো “অত্যন্ত উচ্চ” শ্রেণি থেকে বেরিয়ে আসে, সে বছর হার ছিল আটাশ শতাংশ।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পাবলিক হেলথ অ্যান্ড ইনফরমেটিকস বিভাগের একজন অধ্যাপক বলেন, দীর্ঘস্থায়ী অপুষ্টি, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, পরিবেশদূষণ এবং শারীরিক কর্মকাণ্ডের সীমিত সুযোগ—এই সবকিছু একসঙ্গে মিলেই বাংলাদেশে শিশুদের খর্বাকৃতির সমস্যা তৈরি করছে। বিশেষ করে ঘনবসতিপূর্ণ শহরাঞ্চলে খেলার মাঠ কমে যাওয়াকে তিনি উদ্বেগজনক প্রবণতা হিসেবে চিহ্নিত করেন।
আন্তর্জাতিক তুলনায় বাংলাদেশের অবস্থান এখনো পিছিয়ে। একটি আন্তর্জাতিক সংস্থার একশ তেষট্টিটি দেশের সাম্প্রতিক তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, শিশুদের খর্বাকৃতির হারের বিচারে বাংলাদেশের অবস্থান ঊনপঞ্চাশতম— অর্থাৎ প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ দেশেই এই হার বাংলাদেশের চেয়ে কম। প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে আফগানিস্তান, পাকিস্তান ও ভারতের তুলনায় বাংলাদেশের পরিস্থিতি কিছুটা ভালো হলেও শ্রীলঙ্কার তুলনায় তা দ্বিগুণেরও বেশি, এবং ভুটান ও মালদ্বীপের চেয়েও বাংলাদেশ পিছিয়ে আছে।
এই সমস্যার প্রভাব কেবল শিশুর শারীরিক উচ্চতাতেই সীমাবদ্ধ থাকে না। খর্বাকৃতির শিশুরা শ্বাসতন্ত্রের তীব্র সংক্রমণ ও ডায়রিয়ার মতো রোগে বেশি আক্রান্ত হয়, ফলে শৈশবের প্রথমদিকে তাদের মৃত্যুঝুঁকিও তুলনামূলক বেশি থাকে। পাশাপাশি মস্তিষ্কের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় জ্ঞানীয় সক্ষমতা কমে যায়, শেখার গতি হয় ধীর, আর শিক্ষাজীবনে সার্বিক অর্জনও সীমিত হয়ে পড়ে। একটি আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, খর্বাকৃতির শিশুরা দেরিতে স্কুলে ভর্তি হওয়া, একই শ্রেণিতে বারবার আটকে থাকা এবং কম বয়সেই লেখাপড়া থেকে ঝরে পড়ার ঝুঁকিতে বেশি থাকে।
জরিপে আরও উঠে এসেছে, সাত থেকে চৌদ্দ বছর বয়সী প্রতি দশ শিশুর মধ্যে ছয়জন বয়স-উপযোগী একটি সহজ গল্পের নব্বই শতাংশ শব্দ সঠিকভাবে পড়তে সক্ষম, অথচ মাত্র চল্লিশ শতাংশ শিশু প্রাথমিক গাণিতিক দক্ষতা প্রদর্শন করতে পেরেছে।
এই প্রভাব প্রাপ্তবয়স্ক জীবনেও দীর্ঘস্থায়ী হয়ে থাকে। গবেষণা বলছে, শৈশবে খর্বাকৃতিতে ভোগা ব্যক্তিরা বড় হয়ে গড়ে প্রায় বিশ শতাংশ কম আয় করেন, দারিদ্র্যের মধ্যে বসবাসের সম্ভাবনা তাদের ত্রিশ শতাংশ বেশি থাকে, আর দক্ষ কর্মসংস্থান পাওয়ার সুযোগও তুলনামূলক অনেক কম থাকে।
গবেষকদের পর্যবেক্ষণ বলছে, এই সমস্যার সূত্রপাত ঘটে শিশুর জন্মেরও আগে থেকে। বাংলাদেশে প্রায় অর্ধেক নারীর বিয়ে হয় আঠারো বছর বয়সের আগেই, আর প্রতি চারজনের একজন কিশোরী বয়সেই মা হন—এতে মা ও সন্তান উভয়ের পুষ্টিগত ঝুঁকি বহুগুণে বেড়ে যায়। জরিপ অনুযায়ী, এক-তৃতীয়াংশ অন্তঃসত্ত্বা নারী প্রথম তিন মাস পার হওয়ার পরই প্রসবপূর্ব স্বাস্থ্যসেবা নেওয়া শুরু করেন, আর অর্ধেকের বেশি নারী সুপারিশকৃত ন্যূনতম চারটি স্বাস্থ্য পরীক্ষাও সম্পন্ন করেন না।
জন্মের পরবর্তী সময়েও অপর্যাপ্ত ও অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকে। ছয় থেকে তেইশ মাস বয়সী প্রায় তিনজনের মধ্যে দুইজন শিশুই পুষ্টি চাহিদা পূরণে প্রয়োজনীয় বৈচিত্র্যপূর্ণ খাবার পায় না। অর্ধেকের বেশি শিশুকে প্রক্রিয়াজাত খাবার খাওয়ানো হয়, প্রতি পাঁচজনে একজন চিনিযুক্ত পানীয় পান করে, আর এক-তৃতীয়াংশ শিশু একেবারেই কোনো ফল বা সবজি পায় না।
এই সংকট মোকাবিলায় ওই অধ্যাপক খর্বাকৃতির কারণ নিয়ে আরও গভীর গবেষণায় বিনিয়োগ, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস নিয়ে দেশব্যাপী সচেতনতামূলক প্রচারণা এবং স্কুলে খেলার মাঠ পুনরুদ্ধারের আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর ভাষায়, শিশুর সুস্থ বেড়ে ওঠা কেবল পুষ্টির ওপরই নির্ভর করে না, শারীরিক কর্মকাণ্ডের পর্যাপ্ত সুযোগও এই প্রক্রিয়ায় সমান গুরুত্বপূর্ণ।

