দেশজুড়ে তীব্র গরম, তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বিদ্যুৎ ঘাটতি ও লোডশেডিং। এমন সময়ে দেশের বড় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর নিরবচ্ছিন্ন উৎপাদন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। কিন্তু বাস্তবে বাগেরহাটের রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রই গত এক বছরে বারবার উৎপাদন বন্ধ হওয়ার ঘটনায় আলোচনায় এসেছে।
যান্ত্রিক ত্রুটি ও কয়লা সংকটের কারণে গত এক বছরে কেন্দ্রটির কোনো না কোনো ইউনিট মোট ৩০ বার বন্ধ হয়েছে। এর মধ্যে কয়লার অভাবে বন্ধ হয়েছে তিনবার, আর যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে বন্ধ হয়েছে ২৭ বার। ফলে লোডশেডিংয়ের সময় একটি বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রের এমন অনিয়মিত উৎপাদন নিয়ে বিদ্যুৎ খাতের ব্যবস্থাপনা ও সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
বড় বিনিয়োগ, বড় প্রত্যাশা
রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে ব্যয় হয়েছে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা। এর উৎপাদন ক্ষমতা ১৩২০ মেগাওয়াট, যেখানে ৬৬০ মেগাওয়াট করে দুটি ইউনিট রয়েছে।
কেন্দ্রটি নির্মাণে ভারতের এক্সিম ব্যাংক থেকে নেওয়া হয়েছে ১৬০ কোটি ডলার ঋণ। অর্থাৎ কেন্দ্রটির সঙ্গে শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিষয়টি নয়, বাংলাদেশের বড় ধরনের আর্থিক দায়ও যুক্ত রয়েছে। তাই এত বড় বিনিয়োগের পর কেন্দ্রটি যদি নিয়মিতভাবে উৎপাদন দিতে না পারে, তাহলে বিষয়টি কেবল কারিগরি ত্রুটি হিসেবে দেখার সুযোগ কমে যায়।
বরং প্রশ্ন ওঠে—কেন্দ্রটির রক্ষণাবেক্ষণ, যন্ত্রপাতির মান, কয়লা সরবরাহ, পরিচালনব্যবস্থা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় কোথাও কি বড় ধরনের দুর্বলতা রয়েছে?
একের পর এক বন্ধের ঘটনা
গত এক বছরের তথ্য দেখলে রামপালের সমস্যার ধারাবাহিকতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
২০২৫ সালের ১ জুলাই কয়লা সংকটে কেন্দ্রটির ২ নম্বর ইউনিট বন্ধ হয়। ৮ জুলাই সেটি আবার উৎপাদনে আসে। এর মাত্র চার দিন পর, ১২ জুলাই বন্ধ হয়ে যায় ১ নম্বর ইউনিট। ১৬ জুলাই সেটি চালু করা হয়।
১৯ জুলাই আবার প্রথমে ২ নম্বর এবং পরে ১ নম্বর ইউনিট বন্ধ হয়। ১ নম্বর ইউনিট সেদিনই এবং ২ নম্বর ইউনিট পরদিন চালু করা হয়। কিন্তু ২১ জুলাই আবার যান্ত্রিক ত্রুটিতে বন্ধ হয়ে যায় ১ নম্বর ইউনিট। একই দিনে সেটি চালু হলেও পরবর্তী সময়েও বন্ধ-চালুর ঘটনা থামেনি।
১৫ আগস্ট ১ নম্বর ইউনিট বন্ধ হয়ে একই দিনে আবার চালু হয়। পরদিন ২ নম্বর ইউনিট বন্ধ হয়ে সেদিনই চালু হয়। ২১ আগস্টও ২ নম্বর ইউনিট বন্ধ ও চালু হয়।
এরপর ৩ সেপ্টেম্বর ও ৫ অক্টোবর ২ নম্বর ইউনিট আবার বন্ধ হয়ে যায়। ১৭ অক্টোবর ১ নম্বর ইউনিট বন্ধ হওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই চালু করা হয়। ২০ অক্টোবর ২ নম্বর ইউনিট চালু হলেও ড্রেইন লাইনে লিকেজ দেখা দেওয়ায় ২৫ অক্টোবর সেটি আবার বন্ধ হয়। পরদিন আবার উৎপাদনে ফেরে।
দুই ইউনিট কিছু সময় তুলনামূলকভাবে স্বাভাবিকভাবে চলার পর ৫ ডিসেম্বর আবার বন্ধ হয় ১ নম্বর ইউনিট। ৭ ডিসেম্বর সেটি চালু হয়। ২১ ডিসেম্বর আবার ১ নম্বর ইউনিট বন্ধ হয়ে ২৩ ডিসেম্বর চালু করা হয়।
অর্থাৎ, সমস্যাগুলো বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা ছিল না। একই ধরনের বন্ধের ঘটনা বারবার ঘটেছে।
নতুন বছরেও কাটেনি সমস্যা
২০২৬ সালেও পরিস্থিতির বড় পরিবর্তন দেখা যায়নি।
৪ জানুয়ারি ২ নম্বর ইউনিট বন্ধ হয়ে পরদিন চালু হয়। ২২ জানুয়ারি ১ নম্বর ইউনিট বন্ধ হয়ে সেদিনই আবার উৎপাদনে আসে।
১০ ফেব্রুয়ারি ২ নম্বর ইউনিট বন্ধ হয়ে একই দিনে চালু হয়। ১৬ ফেব্রুয়ারি ১ নম্বর ইউনিট চালু করা হয়। ২৭ ফেব্রুয়ারি আবার ১ নম্বর ইউনিট বন্ধ হয়।
১৪ মার্চ ২ নম্বর ইউনিট বন্ধ হওয়ার পর কিছু সময়ের জন্য পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলেও এপ্রিল থেকে আবার দেখা দেয় নতুন সমস্যা।
৭ এপ্রিল জেনারেটর সমস্যায় ২ নম্বর ইউনিট বন্ধ হয়ে যায়। ১২ এপ্রিল সেটি চালু হয়। এর পরদিন, ১৩ এপ্রিল বয়লার লিকেজের কারণে ১ নম্বর ইউনিট বন্ধ হয়। ১৬ এপ্রিল চালুর পর সেটি আবার বন্ধ হয়ে একই দিন পুনরায় চালু করা হয়।
১৪ মে বয়লার সমস্যায় ২ নম্বর ইউনিট বন্ধ হয়। ১৮ মে চালু হওয়ার পর আবার সেটি বন্ধ হয়ে যায় এবং ২৩ মে ফের উৎপাদনে আসে।
এর মাত্র দুই দিন পর, ২৫ মে বয়লার সমস্যায় ১ নম্বর ইউনিট বন্ধ হয়। ২৯ মে সেটি চালু হলেও ১৬ জুন আবার বন্ধ করতে হয়। ২০ জুন চালু হওয়ার পর ২২ জুন বয়লার সমস্যায় আবার বন্ধ হয়। ২৪ জুন সেটি চালু করা হয়।
এর তিন দিন পর, ২৭ জুন একই ধরনের সমস্যায় ২ নম্বর ইউনিট বন্ধ হয়ে যায়। ৩০ জুন সেটি চালু করা হয়। এরপর জুলাইয়েও ২ নম্বর ইউনিট আবার বন্ধ হয়েছে।
এই ধারাবাহিকতা থেকে একটি বিষয় পরিষ্কার—রামপালের সমস্যা শুধু কয়লা সরবরাহে সীমাবদ্ধ নয়। জেনারেটর, বয়লার, ড্রেইন লাইনসহ বিভিন্ন যান্ত্রিক সমস্যাও উৎপাদন ব্যাহত করছে।
লোডশেডিংয়ের সময়ে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল রামপালকে
গত কয়েক মাস ধরে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক লোডশেডিং চলছে। প্রচণ্ড গরমে যখন বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ে, তখন বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর নিরবচ্ছিন্ন উৎপাদন জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
এই বাস্তবতায় রামপালের মতো ১৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি কেন্দ্র বারবার বন্ধ হয়ে যাওয়া স্বাভাবিকভাবেই উদ্বেগের কারণ।
একটি ইউনিট বন্ধ হলে পুরো কেন্দ্রের উৎপাদন কমে যায়। একই সময়ে যদি অন্য ইউনিটও সমস্যায় পড়ে, তাহলে জাতীয় বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থায় তার প্রভাব পড়তে পারে। ফলে বড় ক্ষমতার কেন্দ্র থাকা সত্ত্বেও যদি নির্ভরযোগ্য উৎপাদন নিশ্চিত করা না যায়, তাহলে বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় এর প্রত্যাশিত সুবিধা পুরোপুরি পাওয়া কঠিন।
বিদ্যুৎ বিভাগের উদ্বেগ
কেন্দ্রটির বারবার বন্ধ হয়ে যাওয়ার বিষয়টি নিয়ে বিদ্যুৎ বিভাগের শীর্ষ পর্যায়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
সম্প্রতি বিদ্যুৎ সচিব মিরানা মাহরুখ এক বৈঠকে রামপাল কেন্দ্রের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রামানাথ পূজারীর কাছে বারবার বন্ধ হওয়ার কারণ জানতে চান। এ ধরনের পরিস্থিতি চলতে থাকলে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
গত জুনে বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিতও রামপাল পরিদর্শনে যান। কেন্দ্রটি কেন বারবার বন্ধ হচ্ছে, তা জানতে গিয়ে তিনি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
এতে বোঝা যায়, বিষয়টি এখন আর কেবল কেন্দ্র পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ সমস্যা হিসেবে সীমাবদ্ধ নেই। বিদ্যুৎ সরবরাহের সামগ্রিক ব্যবস্থাপনার সঙ্গে এটি সরাসরি যুক্ত হয়ে পড়েছে।
উৎপাদন কিন্তু বেড়েছে
তবে রামপাল কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্যের দিকে তাকালে একটি ভিন্ন চিত্রও পাওয়া যায়।
কেন্দ্রটির মুখপাত্র আনোয়ারুল আজিম জানিয়েছেন, রামপাল গত অর্থবছরে রেকর্ড ৮ হাজার ১২৬ মিলিয়ন ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন করেছে। আগের অর্থবছরে উৎপাদনের পরিমাণ ছিল ৫ হাজার ৪২৪ মিলিয়ন ইউনিট।
অর্থাৎ, বারবার বন্ধ হওয়ার ঘটনা থাকলেও মোট উৎপাদনের হিসাবে কেন্দ্রটি আগের বছরের তুলনায় বেশি বিদ্যুৎ দিয়েছে।
এই তথ্যটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একটি কেন্দ্রের মূল্যায়ন শুধু কতবার বন্ধ হয়েছে, তা দিয়ে করা যায় না; একই সঙ্গে তার মোট উৎপাদন, সক্ষমতার ব্যবহার, রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় এবং উৎপাদন খরচও বিবেচনায় নিতে হয়।
তবে উৎপাদন বেড়েছে বলেই ঘন ঘন বন্ধ হওয়ার সমস্যাকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। কারণ অনিয়মিত উৎপাদন দীর্ঘমেয়াদে যন্ত্রপাতির ওপর চাপ বাড়াতে পারে এবং বিদ্যুৎ সরবরাহের পূর্বানুমানযোগ্যতাও কমিয়ে দিতে পারে।
উৎপাদন খরচ নিয়েও প্রশ্ন
রামপাল কেন্দ্রের উৎপাদিত বিদ্যুতের প্রতি ইউনিটের দাম পড়ে ১৪ টাকার বেশি। অথচ সরকার সেই বিদ্যুৎ বিক্রি করে প্রতি ইউনিট ১১ টাকা দরে। ফলে পার্থক্যের অর্থ ভর্তুকির মাধ্যমে সমন্বয় করা হয়।
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, চুক্তি অনুযায়ী রামপাল কেন্দ্রকে অন্যান্য বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো উৎপাদন না করলেও প্রতি মাসে সক্ষমতা বাবদ নির্ধারিত অর্থ দিতে হয়।
অর্থাৎ কেন্দ্রটি যখন উৎপাদন করছে না, তখনও এর কিছু নির্দিষ্ট আর্থিক দায় থেকে যায়। তাই একটি বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রের ক্ষেত্রে শুধু উৎপাদন ক্ষমতা থাকা যথেষ্ট নয়; সেই ক্ষমতার সর্বোচ্চ কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করাও অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষ করে যখন বিদ্যুতের ঘাটতি রয়েছে এবং সরকারকে ভর্তুকি দিতে হচ্ছে, তখন ব্যয়বহুল বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর কার্যকারিতা নিয়ে নিয়মিত মূল্যায়ন জরুরি।
ব্যবস্থাপনায়ও প্রশ্ন
রামপাল কেন্দ্রটি বাংলাদেশ-ভারত যৌথ মালিকানার প্রতিষ্ঠান। কেন্দ্রটির ৫০ শতাংশ মালিকানা ভারতের জাতীয় তাপবিদ্যুৎ করপোরেশনের এবং বাকি ৫০ শতাংশ বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের।
বর্তমানে ব্যবস্থাপনা পরিচালক, প্রধান অর্থ কর্মকর্তা, কারখানা প্রধানসহ ১২ জন ভারতীয় কর্মকর্তা এখানে কর্মরত রয়েছেন।
চলতি বছরের ২৪ জানুয়ারি প্রধান অর্থ কর্মকর্তা ও মহাব্যবস্থাপকসহ ৯ জন ভারতীয় কর্মকর্তা কোনো অনুমতি না নিয়ে ভারত চলে যান। এতে কেন্দ্রটির পরিচালনায় জটিলতা তৈরি হয়। পরবর্তী সময়ে সরকার তাদের আর গ্রহণ করেনি। পরে ভারতের জাতীয় তাপবিদ্যুৎ করপোরেশন অন্য কর্মকর্তাদের পাঠায়।
এই ঘটনাও কেন্দ্রটির ব্যবস্থাপনা কাঠামো ও জনবল ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে। একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় অবকাঠামো প্রকল্পে দক্ষ জনবল, দায়িত্বের স্পষ্টতা এবং বিকল্প ব্যবস্থাপনা কাঠামো কতটা প্রস্তুত রয়েছে, সেটিও এখন গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।
আসল সমস্যা কোথায়?
রামপালের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—কেন্দ্রটি কেন এত ঘন ঘন বন্ধ হচ্ছে?
তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে তিনবার কয়লার সংকট এবং ২৭ বার যান্ত্রিক ত্রুটি উৎপাদন ব্যাহত করেছে। ফলে সমস্যার অন্তত দুটি বড় দিক সামনে আসে।
প্রথমত, জ্বালানি সরবরাহের নির্ভরযোগ্যতা। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য নিয়মিত ও পর্যাপ্ত কয়লা সরবরাহ নিশ্চিত করা মৌলিক শর্ত। কয়লার অভাবে বড় কেন্দ্র বন্ধ হয়ে গেলে বিপুল অবকাঠামো থাকা সত্ত্বেও তা বিদ্যুৎ দিতে পারে না।
দ্বিতীয়ত, যন্ত্রপাতির নির্ভরযোগ্যতা। বয়লার, জেনারেটর, ড্রেইন লাইনসহ বিভিন্ন যন্ত্রাংশে বারবার ত্রুটি দেখা দিলে রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থাকে নতুন করে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
এখানে শুধু ত্রুটি মেরামত করলেই হবে না। কেন একই ধরনের সমস্যা বারবার হচ্ছে, সেটির মূল কারণ চিহ্নিত করা জরুরি।
বড় কেন্দ্র মানেই নির্ভরযোগ্য কেন্দ্র নয়
রামপালের ঘটনা বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের একটি বড় বাস্তবতা সামনে আনে—বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ এক বিষয় নয়।
কোনো কেন্দ্রের নামমাত্র উৎপাদন ক্ষমতা ১৩২০ মেগাওয়াট হলেও সেটি যদি নিয়মিত নানা কারণে বন্ধ থাকে, তাহলে বাস্তবে জাতীয় গ্রিডে তার অবদান কমে যায়।
তাই ভবিষ্যতে বিদ্যুৎ খাতে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে শুধু কত মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতা যোগ হচ্ছে, তা বিবেচনা করলে হবে না। দেখতে হবে কেন্দ্রটি কতটা নির্ভরযোগ্য, জ্বালানি সরবরাহ কতটা স্থিতিশীল, রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থা কতটা কার্যকর এবং প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রকৃত ব্যয় কত।
এখন প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি সমাধান
রামপালের বারবার বন্ধ হওয়ার ঘটনা থেকে সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো, বিদ্যুৎ খাতে শুধু নতুন কেন্দ্র নির্মাণ নয়, বিদ্যমান কেন্দ্রগুলোর কার্যকারিতা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
কয়লা সরবরাহের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, যন্ত্রপাতির নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, ত্রুটির মূল কারণ অনুসন্ধান এবং দক্ষ জনবল নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে প্রতিটি বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন, ব্যয়, বন্ধ থাকার সময় এবং রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়ের বিষয়ে নিয়মিত স্বচ্ছ মূল্যায়ন প্রয়োজন।
কারণ দেশের মানুষ যখন লোডশেডিংয়ে দুর্ভোগ পোহাচ্ছে, তখন বিপুল অর্থে নির্মিত একটি বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র বারবার বন্ধ হয়ে যাওয়ার বিষয়টি কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের সমস্যা নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ, বিদ্যুৎ সরবরাহের নিরাপত্তা এবং শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের অর্থের প্রশ্ন।
রামপাল গত অর্থবছরে ৮ হাজার ১২৬ মিলিয়ন ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন করে আগের বছরের ৫ হাজার ৪২৪ মিলিয়ন ইউনিটের রেকর্ড ছাড়িয়েছে—এটি ইতিবাচক দিক। কিন্তু একই সময়ে এক বছরে ৩০ বার বন্ধ হওয়ার ঘটনা দেখিয়ে দিচ্ছে, উৎপাদনের পরিমাণ বাড়ানোর পাশাপাশি নির্ভরযোগ্যতাও নিশ্চিত করা জরুরি।
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের সামনে এখন তাই শুধু বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নয়; কম খরচে, নিরবচ্ছিন্ন ও স্থিতিশীল বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করাই বড় চ্যালেঞ্জ। রামপালের মতো বড় কেন্দ্রগুলোর কার্যকারিতা সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।

